ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

‘নিরপরাধ জেনেও আরিফকে ফাঁসিয়ে দিল পুলিশ!’

শিরোনামটা এমনই ছিল। ঘটনাটি ২০১১ সালের অক্টোবরের। আমি তখন কালের কণ্ঠের মিরসরাই প্রতিনিধি।

উত্তর আমবাড়িয়া গ্রামের তরুণ আরিফকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। সে পড়ত মিরসরাই কলেজে। অযথা মনগড়া কিছু অভিযোগ এনে তাকে কোর্টে হস্তান্তর করা হয়।

সরেজমিনে অনুসন্ধান করে আমি নিশ্চিত হই, আরিফ খুবই সাধারণ ঘরের ছেলে। আটকের পর নির্দোষ দাবি করলে আরিফের বাবার কাছে মোটা অংকের টাকা দাবি করে পুলিশ। তাদের দাবি মেটাতে না পারায় শেষমেষ আরিফকে কারাগারেই যেতে হয়!

সবকিছু মিলিয়ে ওই নিউজ করেছিলাম। তবে একদম একা ছিলাম সেই পথে। কালের কণ্ঠের প্রথম পৃষ্ঠায় বেশ বড় শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। এরপর পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে ঘটনাটি তদন্ত হয়। শেষপর্যন্ত জামিনে মুক্ত হয় আরিফ।

পুলিশের হয়রানি বিষয়ে এর আগে-পরে অনেকগুলি নিউজ করেছি। এসব কারণে হতে হয়েছে পুলিশের চক্ষুশূল। বিভিন্ন সময়ে করা রিপোর্টে পুলিশকে হাইকোর্ট পর্যন্ত যেতে হয়েছে।

আমার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার লোক খুঁজতে থাকেন ওসি। কিন্তু কেউই তখন রাজি হয়নি। ফলে আমাকে গ্রেপ্তার করতে ওসি সাহেবের অনেক ফন্দি-ফিকির শেষনাগাদ পণ্ডশ্রমই হলো।

ওই ঘটনার বছরখানেক পর ঢাকায় চলে আসি। যোগ দিই কালের কণ্ঠের প্রধান কার্যালয়ে। নীরিহ-নিরপরাধ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকতা করার মধ্যে অন্যরকমের আনন্দ পেয়েছি। এখনো সততা এবং নিষ্ঠাবান থেকে নির্ভয়ে সত্যটা তুলে ধরাকে মনে করি পরম ধর্ম।

আমার এখন গর্ব হয় এই কারণে যে, নিজের এলাকায় সাংবাদিকতার ‘বিপ্লব’ ঘটছে! তবে অপ্রিয় সত্য হলো, এই বিপ্লবের জোয়ারে নীরিহ মানুষের স্বপ্ন আর ভরসার জায়গাটা ভেসে যাচ্ছে।

এখনো বহু নিরপরাধ লোক পুলিশের মিথ্যা মামলায় ফাঁসছে। কিন্তু কই? খবরের কাগজে সেই ধরনের খবর তো আর দেখি না!

মনছুর ছদ্মনামে কাল যে লেখাটি পোস্ট করেছি, ওই দরিদ্র লোকটির নাম মাহবুব। বাড়ি নাহেরপুর গ্রামে। দিনমজুরি করেই চলে তাঁর সংসার। অথচ পুলিশ তাকে মাদকের মিথ্যা মামলায় আসামি করে দিলো!

এই ঘটনা প্রায় আট মাস আগের। খবর পেয়ে আমি জোরারগঞ্জ থানায় গিয়েছিলাম। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে অনুরোধ করেছিলাম বিষয়টি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে।

সত্যিই যদি মাহবুব মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন। আর তিনি যদি নিরপরাধ প্রমাণ হন, তাহলে যেন চার্জশীটে তার নামটি না থাকে।

পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, মামলায় তার নামটি দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। চার্জশীটে মাহবুবের নাম থাকবে না।

কিছুদিন পর এক সাংবাদিক মাহবুবের বাড়িতে যান। চার্জশীটে নাম বাদ দেওয়ার বিনিময় হিসেবে পুলিশ নাকি হাজার দশেক টাকা চেয়েছেন। পুলিশের হয়ে যিনি বিনিময়ের বার্তা নিয়ে যান, সেই সাংবাদিক মাহবুরের প্রতিবেশী শুধু নন, নিকটাত্মীয়ও!

তিনদিন আগে জানা গেল, ওই মামলায় মাহবুবের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত! একই সাথে মাহবুবের বসতঘরের মালামাল জব্দ করার নির্দেশও দিয়েছেন! পুলিশ এখন মাহবুবকে খুঁজছে।

মাহবুব ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ওদিকে তার ঘরের চুলা বন্ধ! দিন এনে দিন খাওয়া সংসার এভাবে কতদিন চলতে পারে জানি না। তবে পুলিশধারী ওই অমানুষ এবং সাংবাদিকধারী ওই দালালেরা বেশ আয়েশেই দিন কাটান।

এই সাংবাদিক নিজেও জানেন, মাহবুব নিরপরাধ। তিনি মাদকের সঙ্গে যুক্ত নন। কোনমতে মজুরি দিয়ে সংসার চালান।

এতকিছু জানার পরেও তার কলম সচল হলো না! তিনি লিখতে পারলেন না- ‘নিরপরাধ দিনমজুর মাহবুবকে ফাঁসিয়ে দিলো পুলিশ!’

তিনি সেটি লিখবেন কী করে? লিখলে কী আর পুলিশের সঙ্গে তার সখ্যতা থাকে? লিখলে কী আর দালালি টেকে?

টেকে না। দুর্ভাগ্য, এই দালালেরাই এখন সাংবাদিক। এখন এদেরই বিপ্লব! গুটিকয়েক ধান্দাবাজের কারণে আমজনতার ভাষায় আমরা এখন সাংঘাতিক!

 


 

> লেখক : সাংবাদিক, news.joynal@gmail.com