ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

এই লেখাটি সবার আগে পড়া উচিত মুশফিকুর রহিমের। তারপর মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের। পড়া উচিত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের দায়িত্বরত কারো। উচিত-অনুচিতের ধার তাঁরা ধারেন কি না জানি না। সম্ভবত তাদের চোখে লেখাটি পড়বেও না। তবু লিখি। যদি তাঁদের দায়িত্বটি অন্য কেউ কাঁধে নেন, সে আশায়।

ক্রিকেট খেলা এমন খেলা, যেটা দেখতে বয়স লাগে না। মাত্র দুই বছরের শিশুটিও কাঠের ব্যাট হাতে তোলার প্রাণপন লড়াইয়ে মাতে। বৃদ্ধ মানুষটিরও সময় কাটে টেলিভিশনে খেলা দেখে। জয়ে হাসেন, পরাজয়ে কাঁদেন- এমন মানুষের শুমারি করলে তালিকাটি নিছক কম হবে না।

আমার এই লেখা মধ্যবয়সী এক দিনমজুরের জীবনের করুণ পরিণতি নিয়ে। যে পরিণতির বাঁকে বাঁকে লেগে আছে ক্রিকেটের গল্প! ক্রিকেটের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা যাকে নিয়ে গেছে জীবনের ওপারে।

আবুল হোসেনের বয়স ৪৫ ছুঁই ছুঁই। এলাকার মানুষ তাঁকে চেনে আবু নামে। এই আবু অন্য সবার চাইতে আলাদা। কারণ, যেখানেই ক্রিকেট সেখানেই ছুটে যান এই ক্রিকেট-পাগল।

২৩ মার্চ রাতের গল্পটা মায়াবীও হতে পারত। হতে হতেও হলো না। তাই ‘মায়াবী’ শব্দটির বদলে ‘দুঃস্বপ্ন’ লিখতেই বাধ্য হয়েছি। মাত্র এক রানের দুঃখবোধ শেষ রাতে দেখা কোনো দুঃস্বপ্ন নয় যে এক ঝাপটায় মন থেকে মুছে ফেলব। মোছা যায়ও না।

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ থেকে ‘মহারণ’ শব্দটিও এখন আমাদের হয়ে গেছে। এখন বলা যায় এভাবে- ‘ভারত-বাংলাদেশ মহারণ’। ঠিকই তো। গেল কয়েকটি ম্যাচের পরিণতি কী তেমন কিছুরই ইঙ্গিত দেয় না?

আবুর বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ওসমানপুরের পশ্চিম বাঁশখালী গ্রামে। বাড়ির পাশের গাঁয়ের দোকানে অনেকে মিলে খেলা দেখেছেন সেই রাতে। আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলতে থাকা ম্যাচটি নিয়ে বেশ খোশমেজাজেই ছিলেন লোকটি। শেষটা জানলে জানা হয়ে যাবে পুরো ম্যাচে অভিব্যক্তি কেমন ছিলো তাঁর।

শেষ ওভারে যখন ১১ রান দরকার তখন খানিকটা চিন্তিত হয়ে পড়েন। যেই-ই দ্বিতীয় ও তৃতীয় বলে পরপর দুটি চার মেরে দিলেন মুশফিক, অমনি লাফিয়ে ওঠেন আবু। তাঁর চোখেমুখে আনন্দের বান। মেতে ওঠেন আগাম জয়োল্লাসে। শেষ তিন বলেই তার মধ্যে ভর করে হতাশা। প্রথমে মুশফিক, এরপর  মাহমুদউল্যাহর আউট তাঁর ভেতরে এতটা ধাক্কা মেরেছে, যেন সবকিছু দুমড়ে-মুছড়ে দিয়ে গেলো!

তবুও হাল ছাড়েননি। সবাই তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন- আবু তুমি এত চিন্তা করছো কেন? শেষ বলে দৌঁড়ে একটা রান নিলেই তো ম্যাচ ড্র হয়। আমাদের আশা জিইয়ে থাকে।

না, মিথ্যে সান্ত্বনা শেষনাগাদ মিথ্যেই থেকেছে। শেষবলের রানআউট হয়তো শেষটাও শেষ করে দেয়! বুক থাপড়াতে থাপড়াতে বাড়ির পথ ধরেন। ঘরে গিয়েই ধপাস করে শুয়ে পড়েন খাটের ওপর। তীব্র বুক-ব্যাথায় কোঁকড়াতে থাকেন। হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন সেটাই তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত। নইলে বুকের মাঝখানে চেপে ধরে কেন বলবেন- ‘আমার তিনটা ছেলে-মেয়ের কী হবে? আমার সংসারের কী হবে? ওদের মানুষ করবে কে?’ ক্রিকেট-পাগল মানুষটি আফসোস করতে করতেই নিভে গেলেন চিরতরে।

আহ! একটি মৃত্যু। কত আফসোস!

তিন ভাই-বোনের অন্ধকার পৃথিবীতে আলো ফিরিয়ে দেবার কেউ নেই?

শরীফ-সুইটি-সায়েম; ওরা দুই ভাই এক বোন। কথা হলো তিন শিশুর মা রাশেদা আক্তারের সঙ্গে। ১১ বছর আগে তিনি বিয়ে করেছিলেন আবুল হোসেনকে। সেই থেকে অভাবের ঘরেও সুখে ছিলেন। কখনো দুঃখ আসেনি। একপর্যায়ে বললেন- ‘আমি ভিক্ষা করে হলেও আমার তিন সন্তানকে লেখাপড়া শেখাবো। ওদের মানুষ করবো।’

রাশেদা আক্তারের কথা শুনে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে গেলো। আমি যখন এইটে পড়ি, মা বলেছিলেন- ‘আমি ভিক্ষা করে হলেও ছেলেকে ডাক্তার বানাবো’।

আমার আর ডাক্তার হওয়া হয়ে ওঠেনি। তবে পড়াশোনা যেটুকু করেছি তার জন্য মাকে ভিক্ষাও করতে হয়নি। কারণ, আমাদের দুই ভাইকে মানুষ করতে বাবাকেই মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়েছিলো।

ভাবতেই অবাক লাগে, শরীফ-সুইটি-সায়েম পড়াশোনা করে মানুষ হতে হলে বাবাকে পাশে পাবে না। সায়েমের বয়স মাত্র নয় মাস। শরীফের নয় বছর, সুইটির সাত বছর। দুই ভাই-বোন পড়ে তৃতীয় ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্থানীয় মুহুরী প্রজেক্ট হোসাইনিয়া মাদ্রাসায়।

নয় মাসের বাচ্চাটি এখনো জানেই না তার বাবা আর নেই এই পৃথিবীতে। জাগতিক নিয়মে বড় হতে হতে একটা সময় হয়তো জানবে, বুঝ হওয়ার আগেই সে বাবাহারা। বড় দুই ভাই-বোন কেবল বাবাকেই খোঁজে ফেরে।

আবু একসময় প্রবাসে ছিলেন। কিন্তু সংসারের চাকা ঘোরাতে পারেননি। ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন দেশে। চারবছর ধরে দিনমজুরি দিয়েই কোনমতে সংসার চালাতেন। তাঁর মজুরির টাকায় দুই সন্তানের লেখাপড়া এবং সংসারের ব্যয় টেনেটুনে হলেও চলে যেতো। কিন্তু আবুর আকস্মিক বিদায়ে পুরো সংসারে যেন অন্ধকার নেমে এলো।


আবুর স্ত্রী রাশেদা কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। বারবার বলছিলেন- ‘সেদিন খেলাটা না দেখলে এই সর্বনাশটা হতো না। কেন তিনি খেলা দেখতে গেলেন? কেন আমাদের একা ফেলে তিনি চলে গেলেন? এখন আমাদের কী হবে?’ 


সত্যিই তো। তিনটি সন্তানকে নিয়ে এই মায়ের যুদ্ধটা কেমন হবে একবার ভাবুন তো। তাঁর পুরো সংসারটি এখন অকুল পাথারে। রাশেদার বাবা নেই, মা নেই। শ্বশুর-শাশুড়িও নেই। পাশে দাঁড়ানোর জন্য ভাইও নেই। তাহলে কী হবে তাঁর? কী ভবিষ্যৎ ফুটফুটে এই তিনটি শিশুর?

ওদের জীবনটা কী অন্ধকার হয়ে গেলো?

এ দেশের ক্রিকেটকে ভালোবেসে কোনো মানুষ প্রাণ হারাবেন- ভাবা যায়? তাও অজপাড়াগাঁয়ের কোনো দিনমজুর! ক্রিকেটের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা সে দিনমজুরকে নিয়ে গেছে ওপারে, তাঁর রেখে যাওয়া অন্ধকার ঘরে আলো ফোটানোর দায়িত্বটা নেবেন কে?

অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে পারেন আপনিও। আপনার অনন্য সহানুভূতিতে ওদের অন্ধকার পৃথিবী আলোকিত হয়ে যেতে পারে।

বিকাশ করুন :  ০১৯১৩ ৪২১ ৭৩৯  এবং ০১৮২৭ ৩৮০ ৪৮৩  (রাশেদা)

লেখক : সাংবাদিক, 01814318532, news.joynal@gmail.com

https://www.facebook.com/muhammed.abedin

 

প্রিয় মুশফিক, এই চিঠি সেই দিনমজুরের