ক্যাটেগরিঃ আর্ত মানবতা

Lipi-Rojiya

রোজিয়া বেগম যখন মাত্র তিন মাসের নবজাতক, তখন তাকে একা ফেলে চলে যান মা। ১ বছর বয়সে হারায় বাবাকেও! এতিম হয়ে যায় মেয়েটি। বড় ভাইও নেই। নানা-নানুর কোলে-পিঠে মানুষ হয় তিনি।

একটু বুদ্ধি হতেই গৃহকর্মী হয়ে যায় রোজিয়া। এভাবেই কাটে শৈশব-কৈশর। তারুণ্য পেরোনোর পর একদিন বিয়ে হয় এতিম মেয়েটির। জন্মের ৩ মাস পর থেকে আজন্ম যাতনায় বড় হওয়া রোজিয়া সুখের স্বপ্নে ঘর বাঁধলেন। বউ হয়ে যান মিরসরাইয়ের তারাকাটিয়া গ্রামের কবির আহমেদের ঘরে।

প্রথমে কোল আলো করে আসে এক ফুটফুটে ছেলে সন্তান। রোজিয়া আনন্দে মাতোয়ারা। ছেলের নাম রাখেন আবুল হোসেন। কয়েক বছর পরে আরো এক সন্তান পেটে আসে। এরপর একদিন দুঃসংবাদের কালোমেঘে ঢেকে যায় রোজিয়ার আলোকিত জীবন। তাদের একা ফেলে ওপারে পাড়ি জমান কবির।

ছোট্ট ছেলে আর পেটের সন্তান নিয়ে রোজিয়া কী করবেন ভেবে কূল পান না। সে অবস্থা থেকেই তিনি গ্রামের মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ নেন। তাতেই চলে যায় তাদের।

এর মধ্যে দ্বিতীয় সন্তানও পৃথিবীর মুখ দেখলো। এবার হলো মেয়ে। নাম রাখলেন লিপি আক্তার।

আবুল হোসেনকে বেশিদূর পড়াতে পারলেন না। নিজের আর মা-বোনের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে কৈশরেই হাতে তুলে নেন অটোরিক্শার স্টিয়ারিং। তবু খারাপ চলছিলো না।

এর মধ্যে আবুল হোসেনের বড় রোগ হয়। ডাক্তার জানায়, ছেলেটির লিভার ক্যান্সার। টাকার অভাবে চিকিৎসা-ওষুধ কিছুই হয়নি। কষ্টে-যাতনায় একদিন নিভে যায় রোজিয়ার আদরের ছেলেটি।

তিন মাস বয়সে মা, এক বছর বয়সে বাবা হারানোর পর অসময়ে স্বামী এবং দুঃসময়ে ছেলেকে হারানোর শোকে নুয়ে পড়েন রোজিয়া। নানা রকমের রোগ পেয়ে বসে তাঁর শরীরেও।

লিপি তখন ১৭ বছরের কিশোরী। মায়ের ‘অন্ধের যষ্ঠি’ হয়ে যান তিনিই। মিরসরাই ছেড়ে মাকে নিয়ে চলে যান শহরে। মাত্র ৮০০ টাকা বেতনে চাকরিতে ঢোকেন। সেখান থেকেই স্বপ্ন দেখেন, আমৃত্যু মাকে নিয়েই কাটাবেন তিনি। মায়ের মুখে হাসি ফোটাবেনই।

স্বপ্নটা বাস্তব করতে গিয়ে দিনরাত খাটতে হয় কিশোরী মেয়েটিকে। এগোতেও থাকেন। অথচ মাকে নিয়ে দেখা স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে কবেই যে নিজের স্বপ্নের সমাধি ঘটিয়েছেন বুঝতেই পারেননি।

লিপির বয়স এখন ৩১ বছর ৭ মাস। একটি মেয়ের জীবনের সবচেয়ে পরম সাধনা- স্বামী, সংসার; এ সবের কোনটিই তার মাথায় আসে না!

লিপি সত্যিই মায়ের ‘অন্ধের যষ্ঠি’ হয়ে যান। কিন্তু এই সুখ বোধহয় বিধাতার সয় না! সেটিও আজ খোয়া যাচ্ছে। লিপি একজনই। অথচ তার ভেতরে বাস করে দুজনের প্রাণ! দুটোই এখন নিভুনিভু!

রোজিয়ার বয়স এখন ৬০। বৃদ্ধা মায়ের জন্য লিপির অন্তপ্রাণ প্রচেষ্টার সমাধিক্ষেত্র নির্মিত হয়ে গেলো আরেকটি করুণ ট্র্যাজেডিতে। এই ট্র্যাজেডির নাম- কোলন ক্যান্সার। এটি লিপির শরীরে বাসা বাঁধলেও আক্রান্ত হলেন দুজনই। কারণ, লিপি নেই তো রোজিয়াও নেই!

সিনেমা-নাটকে আজকাল ট্র্যাজেডির কত রকম চিত্রায়ণ দেখি। রোজিয়ার জীবনের পরতে পরতে নেমে আসা দুঃখের স্রোত যেন সেইসব কল্পকাহিনিকেও হার মানায়। জগতের সবরকম ট্র্যাজেডি যেন এই নারীকে ঘিরেই নির্মিত!

আমি যদি গল্প লিখি, শেষ প্যারায় লিপি আর রোজিয়ার মুখে হাসিটাই ফোটাবো। কিন্তু বিধাতার গল্প কিভাবে সাজানো, জানার সাধ্য নেই কারো। তিনি চাইলেই পারেন, একসঙ্গে দুটো প্রাণে আশা জাগাতে। জানি না, তিনি কী লিখেছেন ওদের দুঃখের দরিয়ায়।

তবু আমাদের প্রাণপন চেষ্টা- রোজিয়ার জীবনের শেষ প্রান্তটা আলোকিত করে তুলতে। আমরা লিপিকে বাঁচাতে চাই। তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে যে যুদ্ধে নেমেছি, সেখানে চাই আপনাকেও। মানবতার সবগুলো দীর্ঘ হাত পাশাপাশি থাকলে জয় আসন্ন।

রোজিয়ার জীবনের অসমাপ্ত গল্পটি শেষ করতে চাই। সেটা করবো এভাবে-

পৃথিবীর মুখ দেখেই যে মেয়ের জীবনটা বিষময় হতে শুরু করে, সেই রোজিয়া আজ সবচেয়ে সুখী নারী। জীবনের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা জমাটবাধা দুঃখগুলো জীবনসায়াহ্নে এসে যখন আঘাত হানবে, একজন লিপি আক্তারই তাকে এনে দেয় প্রশান্তি। শুধু লিপি নন, রোজিয়াও সত্যিকারের বিজয়িনী।

গল্প নয়, বাস্তবেই এদেরকে বিজয়িনী রূপে দেখতে চাই। সে জন্য দরকার আপনাদের মানসিক এবং আর্থিক সমর্থন। লিপির চিকিৎসা তহবিলে সাধ্যমতো অনুদান পাঠান।

বিকাশ অ্যাকাউন্ট নাম্বার- 01913421739 অথবা 01682762044

চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য জানতে লেখকের ফেসবুক ইনবক্সে যোগাযোগ করুন।

লেখক : সাংবাদিক, news.joynal@gmail.com 01814318532

এই নিষ্ঠুর জীবনালেখ্য এক মধ্যবয়সী নারীর