ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

A-Z-M-NASIR

আমলাদের চরিত্র নতুন করে পড়তে হবে না। জাতি সরল বিশ্বাসেই তাদের মুখস্ত করে রেখেছে। প্রকল্পে অর্থ ছাড় বা বরাদ্দের ক্ষেত্রে ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়ে আমরা প্রায় সবসময়ই অন্ধকারে থাকি। আসলে অন্ধকারে আমাদের রাখা হয়। বহুদিন পরে জাতিকে আলোর মধ্যে এনে দিলেন চট্টগ্রামের সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন।

তাঁকে সাধুবাদ জানাই। অভিনন্দন জানাই। তিনিই সাহসী।

আসলে তিনি সাহসী নন, দুঃসাহসী। ক্ষমতাসীন দল থেকে নির্বাচিত কোনো জনপ্রতিনিধি এমন অপ্রিয় সত্যটা বলে দিতে পারেন? কোনো সরকারের শাসনামলে এমনটি ঘটেছে? ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন।

পাঁচ শতাংশ ঘুষ আর পাজেরো জিপের কাহিনি কদিন ধরে আলোচনায়। মেয়রের দাবি, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন আমলাকে বরাদ্দের পাঁচ শতাংশ না দেওয়ায় চাহিদানুযায়ী বরাদ্দ মেলেনি। একজন নাকি পাজেরো জিপও চেয়েছিলেন!

মেয়র নাছির এও বলেছেন যে, যদি ওই আমলার চাওয়াতে সম্মতি প্রদান করা হতো, তাহলে মিলতো ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা।

ধরে নিলাম প্রত্যাশানুযায়ী কমিশন পেয়ে ওই আমলা ৩০০ কোটিই বরাদ্দ দিলেন। সে ক্ষেত্রে কমিশনটা দাঁড়ায় ১৫ কোটি! অবাক হচ্ছেন? টাকার অংকটা কিন্তু পনেরো কোটিই। সহজেই বুঝে নিন, আমলাদের পকেটভর্তি, বাড়িভর্তি, ব্যাংকভর্তি, গাড়িভর্তি কত টাকা। অবশ্য এরা টাকা দেশে রাখছেন বলেও তো মনে হয় না।

ঢাকার বাইরের কিংবা ভেতরের দায়িত্বশীল রাজনীতিবিদেরা আমলাতন্ত্রের কাছে কতটা জিম্মি, এই একটি ছোট্ট ঘটনা দিয়েই প্রমাণিত। আ জ ম নাছির প্রকাশ না করলে হয়তো জাতি যুগ যুগ ধরে অন্ধকারেই থেকে যেত। এখন প্রশ্ন হলো, নাছিরের মতো আরো যারা দায়িত্বশীল আছেন দেশজুড়ে, তাঁরা কী আমলাদের ভয় পান? নাকি তাঁরাও এই ধরনের কমিশনের পক্ষে। নইলে অন্য সবার মুখ থেকে কেন অপ্রিয় সত্যিগুলি বেরোয় না?


গত ১০ আগস্ট চট্টগ্রামে একটি নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠানে সিটি মেয়র বলেন, “নগরের উন্নয়নের জন্য আমার চেষ্টা ও আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু এখানে অনেকের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাকে বলা হলো, করপোরেশনের জন্য যত টাকা চাই দেওয়া হবে থোক বরাদ্দ হিসেবে, তবে তার জন্য ৫ শতাংশ করে দিতে হবে। আমি বললাম, এই টাকা কোথায় পাব? বললেন, ঠিকাদারের কাছ থেকে ম্যানেজ করেন। তখন আমি বললাম, এটা পত্রিকায় নিউজ হবে না? ঠিকাদারও তো আমাকে চোর ভাববে? আমি কীভাবে নেব? কেন নেব? আমি কি এটা লিখে দিতে পারব যে মন্ত্রণালয়ে দিতে হবে এই জন্য ৫ শতাংশ করে টাকা কাটব? তখন বলে যে, না এটা বলা যাবে না। আপনি ম্যানেজ করেন। আমি বললাম, না এটা পারব না। বলল, তাহলে হবে না। এ কারণে আমি শুধু ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেলাম। যদি ৫ শতাংশ করে দিতে পারতাম, তাহলে ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা আনতে পারতাম।” তিনি বলেন, “কয়েক দিন আগে একজন যুগ্ম সচিব মেয়রের সব কাজে সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন। তবে বিনিময়ে তিনি একটি পাজেরো গাড়ি চেয়েছেন তাঁর কাছে।”


মেয়রের এই কথাগুলিতে গাত্রদাহ ‍শুরু হয়েছে অনেকের। অনেকের বলতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জনাকয়েক কর্মকর্তারই। একজন বলেছেন, ‘মেয়র আওয়ামী লীগেরই নেতা। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তিনি মন্ত্রীকে জানাতে পারতেন।’

‘ভেতরের’ চিত্রটা চোখের আয়নায় তুলে ধরায় তারা ‘লজ্জা’ পেয়েছেন। তাদের নাকি ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন হয়ে গেছে। এই কথা শুনে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে- আমলাদের ভাবমূর্তি মানেই কমিশন? আমার তো মনে হয়, এতে বরং সরকারের ভাবমূর্তিই উজ্জ্বল হয়েছে। আ জ ম নাছিরের মতো এক এক করে সব জনপ্রতিনিধিরা যদি এসব ব্যাপারে সরব হতেন, দুর্নীতির আসল ছবিটা ভেসে উঠতো।

আ জ ম নাছির দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন। তাঁর কাছে যদি পাঁচ শতাংশ কমিশন চাইতে পারেন কোনো আমলা, আগের মেয়রের সঙ্গে জল কতটা গড়িয়েছে সহজেই অনুমেয়। সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম ছিলেন বিএনপি সমর্থিত। রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষ জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রে ‘পান থেকে চুন খসতেই’ পদ হারাবার ভয় যে দেশে, সে দেশের মনজুর আলম নিশ্চয়ই সব হজম করে গেছেন অতি নীরবে!

সেই ব্যাপারগুলো হয়তো আর সামনে আসবে না। আপাতত চলমান ‘বিস্ফোরক তথ্যের’ শেষ দেখতে চায় জাতি। মন্ত্রণালয় সিটি মেয়রকে চিঠি দিয়েছে। সাতদিনের মধ্যে অভিযোগের পক্ষে যুক্তিযুক্ত প্রমাণসাপেক্ষে জবাব চাওয়া হয়েছে। চিঠি প্রসঙ্গে নাছির বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তিনি জবাব দেবেন।

মেয়র খুব ফুরফুরে মেজাজে বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর ভর করেই বলেছেন, ‘আমি রাস্তার লোক নই। আমি দায়িত্বশীল। সবকিছু জেনেবুঝেই আমি কথা বলেছি। উত্তর অবশ্যই দিব। প্রমাণও দিব।’

আপাতত পরিস্কার যে, মেয়র নাছির ফ্রুটো জাতীয় কিছু খেয়ে আবোল-তাবোল বলেননি। দুর্নীতি ছাপিয়ে যাওয়ার অপসংস্কৃতির মুখে থুতু ছিটিয়ে তিনি সত্যিটাই বলেছেন। এই সত্যিটা মানুষের জানার অধিকার আছে। এ ক্ষেত্রে আ জ ম নাছির স্যালুট পেতেই পারেন।

আরেকটি কথা- যে মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর, সেই একই মন্ত্রণালয় চিঠি পাঠিয়ে জবাব চেয়েছে। আবার এই মন্ত্রণালয়ই যদি ঘটনাটি তদন্তের উদ্যোগ নেয়, আদতে মেয়র নাছিরের বক্তব্যটি প্রতিষ্ঠা পাবে বলে মনে হয় না। এটি ধামাচাপা তো পড়বেই, উল্টো চট্টগ্রামের মেয়রই কিছু কমিশনপুষ্ট নেতা-মন্ত্রীর তীক্ষ্ণ আঘাতে জর্জরিত হতে পারেন।

জবাব চেয়ে পাঠানো চিঠিতেই অতিরিক্ত সচিব বলে ফেলেছেন যে, মেয়রের এই বক্তব্যে মন্ত্রণালয় তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। ঘটনার তদন্ত ছাড়া এই ধরনের মন্তব্য তাদের মৌলিক অবস্থানকেই পরিস্কার করেছে। তদন্তপর্যায়ে তাদের ভূমিকাও এই একটি বাক্যে প্রণীত।

সামনের ঘটনা যাই হোক, এ রকম একটি জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য চোখের আলোয় এনে আ জ ম নাছির উদ্দিন নিশ্চয়ই আমজনতার কাছে প্রিয়ভাজন এবং বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবেন। যে যাই বলুক, আপনি সত্যিটাই বলে যান মাননীয় মেয়র।

লেখক : সাংবাদিক, news.joynal@gmail.com