ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

জীবন খুবই নিষ্ঠুর একটা আর্শির মত। তার ভেতরে সব জিনিসই বাস্তবিক রুপে দৃশ্য হয়। কিছুই আড়াল করবার জো থাকে না, না তো প্রেম আর না ঘৃণা। সেই কারণেই মানুষ অবশেষে চিনতে সক্ষম হয় তার প্রকৃত হিতকামি ও কপট বন্ধুত্বের ভান করা ভন্ডদের। সঠিক মানুষদেরকে আরো প্রগাঢ় ভাবে জীবনের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বিপরীত সম্পর্কগুলো থেকে একটু সচেতনতায় আড়াল হওয়া তখনি সম্ভব হয়ে উঠে।

মা সম্পর্কিত অজস্র চিরন্তন বাণী আমরা শুনতে পাই, যা বহু কালের প্রাচীন। অন্যান্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এমন বাণী ও প্রবাদ-প্রবচন সমূহ বর্তমান। কালের কঠোর রেঁধার ঘর্ষণে যা আরো পরিপক্ব, মজবুত ও চিরকালিন নব্য হয়ে আছে। আমরা স্পষ্টত অবলোকন করে উঠি আমাদের দৈনন্দিন জীবন-জাপনের দেহে এই বাণীগুলোর সত্যিকার রেখাপাত। অতিতের পানে যারা দৃষ্টি প্রসারিত করতে পারে, মূলত তা অনর্থক অনুতাপ হেতু নয়, তারা কখনো ভুলের মধ্যে চিরস্থায়ী নিমজ্জিত হয় না। প্রতিটা মানুষের সার্বিক ও পরিপূর্ণ মুল্যায়ন করতে সক্ষম হয়।

ব্যাপারটাকে ডায়বেটিক রোগীকে চিনি খাওয়া থেকে বারণ করার সাথে তুলনা করা গেলে সহজে বোধগম্য হবে। রোগি সেই বারণকারী-মানুষটাকে তাৎক্ষণিক ভাবে হিংসুটে ভাবলেও পরবর্তিতে বস্তবতা বুঝে উঠে। এমন কিছু কখনো মাকে ঘিরেও ঘটা সম্ভব। হা অন্য মানুষদের মত কখনো কখনো আমরা মাকেও ভুল বুঝি। আমাদের দৃষ্টিতে সেই খাটি হৃদয়বান মানুষগুলো যদি কখনো বিপরিদ হয়ে উঠে তবে ভয়ের কিছু নেই। খুব শীঘ্র সে সত্যিকার স্বরুপে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে।

সব মানুষের কিছু না কিছু দুর্বল দিক থাকে। তাই বলে কারো প্রতি তার স্নেহ ও মমতাকে সেই দুর্বলতা দিয়ে পরিমাপ করা কখনোই বুদ্ধমানের কাজ নয়।

এতক্ষণে সবার কাছে আশাকরি এটা স্পষ্ট হয়েছে যে আমি মায়ের সম্পর্কে কিছু বলার অভিপ্রায়েই এই লেখায় হাত দিয়েছি। দৃশ্যত তেমন কোন দুর্বলতা কোন মায়েরও থাকতেও পারে। ক্ষেত্র-বিশেষ ঘটা সম্ভব কোন মা-সন্তানের ভালোর বিপরিদ কাজটা করছে বা সন্তানকে মূহুর্তের জন্য সস্তি দিচ্ছে না। এমত স্থিতিতে গভীর বিবেচনা আবশ্যক। কারণ যেভাবে এটা সম্ভব যে মা নিজের অজান্তে ভুল করছে, তেমনি এই ব্যবহারের পেছনে গুরুতর কোন উপলক্ষ থাকা অস্বাভাবিক নয়। সঠিক মানুষদের ঘিরেও তাৎক্ষণিক ভুল সন্দেহ দানা বাঁধতে পারে একথা আগেই বলেছি এবং সেটা অযৌক্তিকও নয়।

একটা ঘটনার উল্লেখ করা যায় এ সম্পর্কে। একবার অসুস্থ আমি আম্মুর সাথে ডাক্তারের কাছে আসার পর দেখলাম তার চেম্বার বন্ধ আছে। তার অবস্থিতি সম্পর্কে কয়ের জনকে জিজ্ঞেস করায় একজন বলল সেইভ করতে গেছে, আরেকজন বলল নামাজে আছে ও রোগি দেখতে গেছে এমন কথাও বলল একজন। অগত্যা আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম। একটু পর দাঁড়িয়ে থাকতে অসুবিধা হওয়ায় একটা পরিচিত চায়ের দোকানে এসে বেঞ্চিতে বসলাম, আম্মু একটা আন্টির সাথে কথা বলতে গেল একটা বাসার গেটে। দোকানদার কিছুদিন আগে আমাদের বাসার পাশেই থাকতো মাসিক ভাড়া চুক্তিতে, এখন অন্যত্র থাকে। আমাকে জিজ্ঞেস করল কিছু খাবো কিনা আমি না করলাম। জ্বর বশত আমার মুখ অসাড় ছিল। তখন পরিচিত একটা মেয়ে তার মা সমেত ঐ দোকানে এলো। আমি আমার জায়গায় অনড় বসে রইলাম। দোকানদারের সাথে তাদের টুকটাক কথা শুনে জানলাম মেয়েটাও জ্বরের শিকার এবং ঐ একই ডাক্তারের জন্য অপেক্ষমান। মেয়েটার জন্যেই নাকি কার জন্য ফ্রিজে রাখা ফান্ডা কিনল ওর মা তখন আমিও আঙ্কেলকে বললাম আমাকে চা দিতে। অনেকক্ষণ ভর চা ফুকলাম আর লক্ষ করলাম মেয়েটার অনেক রকম অস্বস্তিকর নাড়াচাড়া। ভাল লাগছিল। মাঝে মাঝে মায়ের কাঁধে মাথা রাখা আমাকে প্রীত করছিলও। বলা যায় এই জিনিশটসই মায়ের স্নেহের ব্যাপারে ভাবনায় একধরণের বিশেষত্ব জাগিয়ে তুলল। আমিও অনুভব করে উঠলাম আমার মায়ের অগাধ স্নেহ ও ভালবাসা মাখা স্পর্শ।

আমার মা একটু রাগি। কারো সাথে চলতে গিয়ে ঐ রাগবশতই অনেক ভুল-ভ্রান্তি করে থাকে ব্যবহারগত, যে কারণে আমি মাকে কিছুটা অপছন্দও করতাম। এবং সেটা করতে গিয়ে কখনো কখনো তার স্নেহ মততার ব্যাপারেও অবহেলা জেগে উঠতো। কিন্তু ওই মেয়েটার মায়ের কাঁধে মাথা রাখার ব্যাপারটা মতৃস্নেহের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তুলল আমাকে। আমি ভাবনায় এ পরিবর্তন দেখে অবাক হব না, একে দৈনন্দিন ঘটনা থেকে আলাদাও বলবো না। যে আমার জন্য অজস্র স্নেহ, ভালবাসা হৃদয়ে রাখে তাকে প্রকৃত ভাবে চিনে উঠাই তো সচরাচর স্বাভাবিক।
মায়ের স্নেহ মায়ের স্নেহই। একে অন্য কোন কিছুর সাথেই উপমিত করা যায় না। সন্তানের জন্যে পৃথিবীর মধ্যে সবচে শীতল ও স্নিগ্ধ পরিসর হলো এই স্নেহের জায়গাটুকু।