ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

তখনও সকাল হয়নি …. ভোরের পাখিরা হয়ত ডেকে উঠেনি……প্রতিদিনকার অভ্যাসমতো ঘুম থেকে উঠে নিউজ পোর্টালে ঢুঁ মারি … বিডিনিউজের পেজে ঢুঁ মাত্রই নীল কালির মোটা হরফে লিখা ….দিল্লির ধর্ষিত তরুণীটি বাঁচল না … আঁতকে উঠলাম .. .কাল রাত অবধি মেয়েটা টিকে ছিল.. সে টিকে ছিল একটা বিষাক্ত পৃথিবীতে …. সে টিকে ছিল আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে ……. আজ সকালেই কিনা নিউজ পড়ছি

’’ লড়াই না করে কোনোভাবেই হারব না’—গত শনিবার পুলিশকে দেওয়া জবানবন্দিতে এমন কথা বলেছিলেন ভারতে গণধর্ষণের শিকার মেডিকেলের ছাত্রী। কিন্তু মৃত্যু তাঁর এ লড়াইয়ে বাদ সাধল। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে আজ শনিবার স্থানীয় সময় ভোর চারটা ৪৫ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।’’

কেলভিন জানান, মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে আট সদস্যের বিশেষজ্ঞ চিকিত্কদের একটি দল ওই তরুণীর চিকিত্সা করছিল। তবে শরীরে ও মস্তিষ্কে মারাত্মক আঘাতের কারণে তাঁর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে পড়ছিল। এ কারণেই তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হলো না। তাঁর মস্তিষ্ক, ফুসফুস ও তলপেটে গুরুতর জখম ছিল। ‘’

কাল রাতে যথন তার নিউজটা দেখছিলাম আর ভাবছিলাম আমাদের ইয়াসমীন, তৃষা আর সিমিদের কথা … তাদেরকে আমরা বাঁচতে দিই নি … লাঞ্চনা-গঞ্জনা সয়ে বেঁচে থাকতে চায়নি ……তারা চলে গিয়েছিল না ফেরার দেশে …….. আমাদের কোন সুযোগ দেয়নি তারা.. আমাদের বড় অপরাধী করে তারা চলে গিয়েছিল ……মনের কোণে একটা প্রশ্ন জাগে .. বাঁচবে তো আমানত ??
আমানতের নিউজগুলো পড়ছিলাম…. একটা কালো রাত …. ১৬ ডিসেম্বরের কাল রাত .. দক্ষিণ দিল্লির মুনিরকা ….যে রাতে ছয়টা নরকের কীট হামলে পড়েছিল তার উপর …. ক্ষত বিক্ষত করেছিল তাকে .. রক্তাক্ত করে ফেলে দিয়েছিল মহিপালপুর ওভারব্রিজের ওপর ..তার সঙ্গী বন্ধুটিও আহত …….

জখমের পর জখম .. তবু্ও ২৩ বছর বয়সী ডেন্টালের ছাত্রী বাঁচতে চেয়েছিল …সফদরজঙ্গ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছাত্রীটি যখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে , তখন ছাত্রী ছোট্ট এক টুকরো কাগজে মায়ের কাছে লিখেছে ,“মা আমি বাঁচতে চাই।”

অসুস্থতা সত্ত্বেও সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিজের জবানবন্দি দিয়েছেন ওই তরুণী। সম্পূর্ণ নির্ভীক ভাবেই বয়ান দিয়েছে। একই সঙ্গে দাবি করেছে, অপরাধীদের যত দ্রুত সম্ভব শাস্তি দিক সরকার ।
এ ঘটনায় বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে সারা ভারত ….ভারতের সংসদ সদস্যরা ধর্ষণকারীদের কঠোর শাস্তি দাবি করে বক্তব্য দিয়েছেন। দিল্লি পুলিশ সদর দফতরের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ।

গণধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে কয়েক দিন ধরেই রাজধানী নয়াদিল্লিসহ কলকাতা, গুয়াহাটি, লক্ষ্ণৌ, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু ও কানপুরের মতো বড় শহরে বিক্ষোভ চলছে। চলমান বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। তাঁদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষও হচ্ছে। ইন্ডিয়া গেটে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় আহত এক পুলিশ কনেস্টবল মারা যান ..

ক্ষোভে উত্তাল ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে তরুণীর বাবা বাবা গণমাধ্যমে এক বিবৃতিতে সবার উদ্দেশ্যে শান্তি বজায় রেখে তাঁর মেয়ের জন্য প্রার্থনা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘‘আমার মেয়ের জন্য আপনারা প্রার্থনা করুন৷ দয়া করে কোনো রকমের হিংসাত্মক কাজে জড়াবেন না৷ মেয়েটির এখন আপনাদের সমর্থন ও প্রার্থনার খুব দরকার৷ মেয়ে আমার বাঁচার জন্য লড়ছে৷ ও মনের দিক থেকে খুব শক্ত, বাঁচার ইচ্ছেটাও প্রবল৷ ওর সাহসিকতা বলে বোঝানোর ভাষা আমার জানা নেই৷”

বিক্ষুব্ধদের প্রতি শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেন, ‘‘আমি নিজেও তিনটি মেয়ের বাবা৷ তাই এ ঘটনায় আমিও আপনাদের মতোই ব্যথিত৷ কথা দিচ্ছি, আমরা সুবিচার নিশ্চিত করবো৷”

পরিস্থিতি দেখে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী নাখোশ হন। তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল সিন্ধে ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী শিলা দীক্ষিতকে কড়া ভাষায় চিঠি লিখেছেন। তাতে এ ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। বলেছেন, এ বিষয়ে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে। ওদিকে অল ইন্ডিয়া ডেমক্রেটিক ওমেন্স এসোসিয়েশন নয়া দিল্লিতে বিক্ষোভ করেছে। প্রতিবাদ হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরে ও বহুল আলোচিত যন্তরমন্তরে। গতকাল বার্তা সংস্থা পিটিআই যখন এ খবর জানায় তখনও ধর্ষিতা রয়েছেন সঙ্কটাপন্ন অবস্থায়। এ ঘটনায় জড়িত চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। তার মধ্যে গতকাল দিল্লি পুলিশ মুকেশ সিং, পবন গুপ্ত ও বিনয় শর্মাকে আদালতে তোলে। সেখানে এর মধ্যে দু’জন নিজেদের দোষ স্বীকার করেছে। বিনয় আদালতে দোষ স্বীকার করে নিজেই বলেছে- এ জন্য আমার ফাঁসি হওয়া উচিত। ঘটনার মূল নায়ক বাসচালক রাম সিংকে ৫ দিনের জন্য পুলিশি হেফাজতে দেয়া হয়েছে। সোনিয়া গান্ধীর চিঠি পেয়ে গতকালই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল সিন্ধে ও দিল্লির পুলিশ কমিশনার নীরাজ কুমার বৈঠক করেছেন। তারা বৈঠকে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছে- সব বাস থেকে রঙিন গ্লাস সরিয়ে ফেলা হবে। পর্দাও সরিয়ে ফেলা হবে। সব বাসে এখন থেকে চালকদের মোবাইল ফোন নম্বর ও লাইসেন্স নম্বর মোটা হরফে লেখা থাকবে।

প্রধান বিচারপতি ডি. মুরুগেস্বানের সভাপতিত্বে পরিচালিত হাইকোর্টের বেঞ্চ গতকাল শহরের পুলিশ কমিশনারকে দুই দিনের মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট দেয়ারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর আগেই সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণ রঙিন গ্লাস ওয়ালা যানবাহন বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। কেন হয়নি সে বিষয়েও আদালত দিল্লি পুলিশের কাছে জানতে চেয়েছেন। আটক চারজনের মধ্যে তিনজন- মুকেশ সিং, পবন গুপ্তা ও বিনয়কে গতকাল সাকেটের এক আদালতে হাজির করা হয়। আদালত পবন ও বিনয়কে চারদিন করে পুলিশি রিমান্ডে দিয়েছেন। মুকেশকে পাঠানো হয়েছে ১৪ দিনের নিরাপত্তা হেফাজতে। বিনয় শর্মার বিরুদ্ধে অভিযোগ সে ধর্ষিতার পুরুষ বন্ধুকে প্রহার করেছে। এ কথা স্বীকার করে বিনয় নিজেকে ফাঁসি দেয়ার আবেদন জানায় আদালতে। পবনও জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। কিন্তু ঘটনার মূল আসামি রাম সিংয়ের ভাই মুকেশ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

দেশজুড়ে যখন বিক্ষোভ, হাসপাতালের বেডে শুয়ে মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করছে মেয়েটা …মেয়েটার অবস্থা তখন নাজুক..

২৬ডিসেম্বর রাত থেকে নির্যাতিতা তরুণীর অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। পালস রেট নেমে যায় ৫০-এর নিচে। ব্র্যাডিকার্ডিয়ায় ভুগতে শুরু করেন তরুণী ….অবস্থা সঙ্কটজনক হওয়ার পর বিদেশে চিকিত্‍সার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে সফদরজং হাসপাতালের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় কেন্দ্রের সঙ্গে……উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়ার পর ২৭ ডিসেম্বর ভোরে তাকে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়…সঙ্কটজনক অবস্থায় রোগীকে হাসপাতালের ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়…

ওই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার ভোর পৌনে ৫টায় (স্থানীয় সময়) চিকিৎসকরা ওই তরুণীকে মৃত ঘোষণা করেন….হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেলভিন লোহ এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে রোগীটি মারা গেছেন। মৃত্যুর সময় তার পাশে পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও ছিলেন ভারতের হাইকমিশনার”…..মাউন্ট অফ এলিজাবেথের চিকিৎসকরা ওই তরুণীকে বাঁচানোর জন্য সর্বোত চেষ্টা চালিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের সব চেষ্টা বিফল হয়েছে।” হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কেলভিন লোহ বলেছেন, ‘শান্তিতেই মারা গেছেন তিনি। মৃত্যুর সময় স্বজন ও ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তা তাঁর পাশেই ছিলেন।’

সিঙ্গাপুরে ভারতের হাইকমিশনার টি সি এ রাঘবন সাংবাদিকদের বলেন, মৃত্যুর পর ওই তরুণীর পরিবার ভেঙে পড়েছে।

ডয়েচে ভেল জানিয়েছে এক ভয়াবহ তথ্য…..তারা বলেছে ‘’ ভারতে নারীদের নিরাপত্তা সঙ্কট দিন দিন বাড়ছে৷ সারাদেশে যত হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে তার বেশিরভাগেরই শিকার নারী৷ সরকারি হিসেব বলছে, গত বছর সারা দেশে যে ২ লক্ষ ৫৬ হাজার ৩২৯টি অপরাধকর্ম পুলিশ নথিবদ্ধ করেছে তার মধ্যে ২ লক্ষ ২৮ হাজার ৬৫০টিরই শিকার নারী৷ রাজধানী দিল্লিও নারীর জন্য খুব বিপদজনক হয়ে উঠেছে৷ এ বছর সেখানে এ পর্যন্ত ৬৬১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে৷ গত বছরের তুলনায় ধর্ষণের হার বেড়েছে প্রায় ১৭ ভাগ ‘’

টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায় ‘’ রাজনৈতিক কারণে মনমোহনের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট সরকার এখন এমনিতেই নাজুক অবস্থায় রয়েছে, এর মধ্যে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনের কারণে সরকার এখন বেশ বেকায়দায় পড়েছে। দিল্লিসহ সারা দেশে ধর্ষণসহ বিভিন্ন নিপীড়নের ঘটনা অব্যাহত থাকায় সরকার তার জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। নারীদের জন্য অত্যন্ত অনিরাপদ দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম ভারত।

দিল্লিকে বলা হয় ‘ধর্ষণের রাজধানী’। গত বছর পুলিশ ৫৫০টি ধর্ষণের মামলা নথিবদ্ধ করেছে। বলা হয়, নারীদের জন্য দিল্লি খুবই বিপজ্জনক জায়গা। যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ সেখানে খুবই নিয়মিত ঘটনা। অপহরণও কম নয়। দেশের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় দিল্লিতে ধর্ষণের হার বেশি। ’’

….. ঘটনাটি আমাদের দেশের নয় … কিন্তু দেখুন, প্রতিবাদে উত্তাল আমরাও … আমাদের মধ্যেও মানবিকতাবোধ আছে .. এ মৃত্যু আমাদের ক্ষত বিক্ষত করে …. এ মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে .. এ মৃত্যু মনে করিয়ে দেয়, আমরা কতটা পাষাণ….. ধর্ষনের বিরুদ্ধে কোন বড় সামাজিক পদক্ষেপ চোখে পড়ে না … এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যতটা আমরা সোচ্চার … ধর্ষণ ব্যাধির বিরুদ্ধে আমরা ততটা সোচ্চার নই .. কামলোলুপ পুরুষ শাসিত সমাজে নারীদের অবমাননা দিনে দিনে বাড়ছেই …. এতে আমাদের কারও ভ্রুক্ষেপ নেই .. কারণ সাপে না কামড়ালে আমাদের হুশ হয় না কখনো ……. আমরা ভেতো বাঙালি নাকে সরষে তেল দিয়ে ঘুমাতে ভালোবাসি … ঘরে ঘরে ধর্ষনের খবর আমরা ক’জনায় জানি .. লোক নিন্দার ভয়ে আমরা প্রতিবাদ করতে পারি না ….. আমরা পারি না আমাদের মা-বোনদের নিরাপত্তা দিতে …. আমাদের চোখ চক চক করে …. আমরা হয়তো বলবো … আমানত ছোট্ট কাপড় পড়ে ঘুরছিল, তাতেই ধর্ষকদের পুরুষাঙ্গ উত্থিত হয়েছিল … তারা শিক্ষা দিয়েছে তাকে.?? ছি::: ছি:: .. আমাদের মানসিকতার উন্নতি আর কবে হবে ?? আমাদের সর্বান্তকরণে ধিক !!

আমরা নিরব থাকলে একদিন থাবা পড়বে আমাদের ছোট্ট বোনটির দিকে ..

আমরা কি এখনো নিরব থাকবো ?? এখনো বুড়ে আঙ্গুল চুষবো ??