ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

12
নিজেরেই একবার নিন্দা করি। বনশ্রীর সেই মা’ তো এখনো দোষী প্রমাণিত হননি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। সুপ্রিম কোর্ট এখনো বলেননি যে জেসমিনই প্রকৃত খুনি।আমরা গণমাধ্যম তার আগেই জেসমিনকে ‘খুনি’, ‘খুনি বলে চিৎকার করছি।

কোর্ট কাছারি হোক কিংবা র‌্যাব কার্যালয়ে, আমরা যারা ফটো সাংবাদিক আর ভিডিও সাংবাদিকরা, সেই জেসমিনের ছবি তুলতে মরিয়া হয়ে উঠি। কার ফ্রেমে জেসমিনের সবচেয়ে ভালো ছবি পাওয়া যাবে, তা নিয়ে চলছে প্রতিযোগিতা। আর সেই ছবি কতক্ষণে অফিসে আসবে, আমরা বসে থাকি প্রতীক্ষায়।

দেশসেরা পত্রিকাগুলোর সবাই ছেপেছে জেসমিনের ছবি। এই ছবি ছাপা না হলে হয়তো কাটতি বাড়ে না। কিন্তু এই ছবি ছাপা না হলে কি এমন ক্ষতি হতো? সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রেও জেসমিনকে খুনি বানানোর একটা অপপ্রচেষ্টা দেখলাম সবার মধ্যে। এর মধ্যে পরকীয়া ইস্যুতেও দেখলাম মাঠ গরম করছে বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম আর যুগান্তর। র‌্যাবের সেই সংবাদ সম্মেলনের আগে বাংলানিউজ ব্রেকিং নিউজ দিয়েছে— পরকীয়ার জেরে খুন। র‌্যাবের এসএমএসে- পরকীয়ার কথা কিভাবে লেখা ছিল? তারা শিশু হত্যার কারণ সম্পর্কে বলেছিল , যেসব কারণে খুন হতে পারে পরকীয়া তার একটি। কিন্তু তারা তো বলেনি যে জেসমিন বা তার স্বামীর পরকীয়ার কারণে শিশুদ্বয় খুন হয়েছিল। সময় টিভি তখন কি করল? তারা বাংলানিউজের নিউজ কপি করে মেরে দিল ব্রেকিং। এমন অপসাংবাদিকতার নমুনা দেখলাম, যুগান্তরেও। কোনো সূত্র উল্লেখ না করে তাদের শিরোনাম “মাঝ রাতে তার মোবাইলে কার ফোন আসে?” আমরা কতটা নোংরা আর অসভ্য হয়ে উঠছি, তার প্রমাণ মিলছে আরও পত্রিকাতে।

আমরা প্রতিদিন সাংবাদিকতার নানা নীতিমালা নিয়ে বুলি কপচাই দিনভর। কিন্তু সত্যি কি মানি নীতিমালা? সাংবাদিকতা হল গণমানুষের বিবেক। আমরা কি বিবেকের কথা শুনতে পাই? পাই না। দ্রুত সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে বাজে কাজটি করে বসি। আদর্শিক অবস্থান থেকে সাংবাদিকতা অনেকদিন আগে বিচ্যুত হয়েছে। মূল্যবোধের ছিঁটেফোটাও নেই আমাদের মধ্যে। কোন খবর কিভাবে পরিবেশন করা হবে, সেটা সত্যি আমরা জানি না। মিথ্যে কাল্পনিক গল্প সাজিয়ে আমরা পত্রিকার কাটতি বাড়াই। অনলাইন হলে হিট বাড়াই, অ্যালেক্সা নিয়ে মাতামাতি করি।
ফিরে আসি পুরনো প্রসঙ্গে….।

আচ্ছা, সেই মা যদি দোষী সাব্যস্ত না হন, মাকে যদি সত্যি ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়, মা যদি বেকসুর খালাস পান, তবে সেই মা কি কখনো সুস্থ জীবনে ফিরে আসবেন? গণমাধ্যম তো তাকে নিশ্চিতভাবে খুনি বলে দিয়েছে। আর পাঠক সেই খবর আর ছবি লুফে নিয়ে জেসমিনকে নিয়ে মুখরোচক গল্প রটাতে ব্যস্ত। সেই মা সত্যি তো পারবেন না সুস্থ হতে।.জেসমিন যদি অসুস্থ হয়ে থাকেন মানসিকভাবে, আমরা কি তাকে আরও অসুস্থ করে দিচ্ছি না?

জেসমিন নির্দোষ প্রমাণিত হলে তিনি বা তার পরিবার যদি মানহানি মামলা দায়ের করেন, আমি মনে করি তা শতভাগ সঠিক কাজ হবে। তিনি সেই কাজটি করতেই পারেন। আমি সাংবাদিকতার ছাত্র নই, স্রেফ সংবাদকর্মী মাত্র। কদিনের কাজ করার অভিজ্ঞতা মাত্র। কিন্তু মানবিক দিক থেকে কোথায় যেন বাধছে আমার। স্যরি !

অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণের আগে অভিযুক্তের ছবি ছাপানো সত্যি কি অপরাধ নয়? শুধু জেসমিন নয়, অন্য কেসের অভিযুক্তের ক্ষেত্রেও কি তা নয় ? সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণের সাপেক্ষে যদি অভিযুক্তকে আসামি বলা হয়, তখনই কি আমরা ছবি ছাপতে পারি না? সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে খুব বড় বড় থিওরি নয়, স্রেফ সামান্য কিছু বিষয় নজরে থাকলেই সাংবাদিকতা খুব সোজা কাজ ।