ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

রবিবার, ৩ এপ্রিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দিবস। চলচ্চিত্র দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি, নানা আয়োজন হবে হয়তো। রঙবেরঙের সেসব আয়োজনের ডামোডালে হারিয়ে যাবে সিনেমা হল শ্রমিকদের কথা। তাদের কথা কেউ বলবে না। কেউ বলবে না, এফডিসির ফ্লোরম্যানদের কথা। পারিশ্রমিক তারা ঠিকমতো পান কি না, তাও কেউ বলতে চাইবেন না।

মন্ত্রী আসবেন, তিনি শোনাবেন বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে নানা আশার কথা। বলবেন, পাইরেসির কথা। তার সঙ্গে সুর মেলাবেন শাকিব খান, দেলওয়ার জাহান ঝণ্টু, অপু বিশ্বাস থেকে শুরু করে প্রযোজক দিপু সাহেব, আজিজ সাহেবরা। কিন্তু তারা কখনোই বলবেন না, নকল প্রবণতা নিয়ে। কোটি টাকা বাজেটের আড়ালে প্রতিদিন নকলকে উৎসাহ দেওয়ার মহোৎসব নিয়ে কেউ কিছু বলবেন না। নকল করে পাস করার প্রবণতা চলতেই থাকবে।

ইমন-আঁচলের ব্যর্থ জুটি...

আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অভিযোগ, সেন্সর বোর্ড আর নীতিমালা নিয়ে। আমারও তাই। সেই পাকিস্তান আমলে (১৯৬৬) কি এক নীতিমালা করা হয়েছিল, তা সংশোধন করা হয় ২০১২ সালে। কিন্তু সেই নীতিমালা কজন পরিচালক পড়েন, তা আমি সন্দিহান। নীতিমালা পড়ার অত সময় কোথায়? সেন্সর বোর্ড রিভিউ কমিটিকে ম্যানেজ করা গেলে তো সমস্যা নেই। যে ছবিতে ৪০টির বেশি দৃশ্য কর্তন করে আটকে দেওয়া হয়, সেই ছবিকেই দেখি মহাসমারোহে সেন্সর সনদ দেওয়া হয়। …. যৌথ প্রযোজনার নীতিমালা নিয়ে আর কথা না হোক। ভারতপ্রীতি জিন্দাবাদ…

সেন্সর বোর্ডের রিভিউ কমিটিতে যারা বসে আছেন, তাদের অনেকেই নকলদোষে দুষ্ট! সিনিয়র মানুষ তারা, কিংবদন্তী পর্যায়ের। তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলি, সেন্সরে জমা হওয়া সিনেমাগুলোর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকার পরও কেন সেসব সিনেমাকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে? কি স্বার্থে? ‘রানাপ্লাজা’ ইস্যুতে অনেক জলঘোলা হয়েছে। সে সিনেমাকে কেন আদালতে যেতে হয়? সেন্সর বোর্ডই তো সমস্যার সমাধান করতে পারত। তাদের ভূমিকা স্পষ্ট নয় বলেই তো নির্মাতারা সেন্সর নীতিমালাকে তোয়াক্কা করেন না। বারবার প্রশ্ন তুলেন বোর্ডের বিরুদ্ধে। সেন্সর বোর্ড মেরুদন্ড শক্ত করে দাঁড়ালে এমনিতেই অনেক নকলবাজ, ভুঁইফোড় নির্মাতারা ঝরে পড়বেন।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরি বোর্ডের সদস্যদের নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। নকল দোষে দুষ্ট ‘বৃহন্নলা’ সিনেমাটিকে কি করে জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল? তাতে কি জুরি বোর্ডের কোনো দায় নেই?

নকলের জয়জয়কার..

আমাদের দেশের নায়ক নায়িকাদের ব্যাপারে আমি যথেষ্ট আশাবাদী। শাকিব খানকে যতই লিপস্টিক নায়ক কিংবা হিজরা বলুক নিন্দুকরা, আমি কিন্তু তার অভিনয়ের প্রশংসা করব। তাকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে না পারা পরিচালকের ব্যর্থতা। শাকিবের খামখেয়ালিপনার কথা আমরা জানি। একজন সুপারস্টার খামখেয়ালি হবেন। তবে তাকে নিয়ন্ত্রন করার মতো পরিচালক থাকতে হবে। তাকে পাখা নিয়ে বাতাস করতে হবে না, সিগারেট কিনে দিতে হবে না। একটা ভালো গল্প দিন। সিনেমার মতো করে সিনেমা বানান। শাকিব খান একদিন ঠিক জিৎ-দেবকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়বে। আরেফিন শুভকে ন্যাকামি চরিত্র থেকে বের করে এনে পুরোদস্তুর অ্যাকশন হিরো বানানো যেতে পারে। অনন্ত জলিল সাহেব তার মতো এগোবেন, তা জানাই আছে। শুধু নকল ছবি করাই তার সমস্যা। বাপ্পী, সাইমন, শাহরিয়াজ, সুমিত, আরজু সবাই প্রতিভাবান। এদের জন্য আলাদাভাবে গল্প ভাবতে হবে। সবাইকে সব চরিত্রে মানায় না। নতুনরা পারবেন আমি আশা রাখি।

‘জালালের গল্প’ সিনেমাটি আন্তর্জাতিক পরিসরে আমাদের আশা দেখায়

অপু বিশ্বাসকে নারীপ্রধান সিনেমাতে কেউ নেবেন, এটা কল্পনা করুন। শাকিবের ছায়া থেকে তিনি বের হতে চান না বলেছেন। কিন্তু বের করুন নির্মাতারা। পপিকে পেরেছেন, শাবনূরকে পেরেছেন, সবশেষ মৌসুমীকেও পেরেছেন ক্ল্যাসিক্যাল সব সিনেমায় অভিনয় করাতে। তবে অপুকে কেন নয়? পারতেই হবে। মাহিয়া মাহি জাজ থেকে বের হয়ে স্বকীয় অবস্থান তৈরি করতে চাইছেন। আমি তাকে সাধুবাদ জানাই। পরী মনির আর্বিভাব ধুমকেতুর মতো! রূপের পাশাপাশি গুণও চাই তার। তার গ্ল্যামারকে পুঁজি করে ছবি বানানো যেতে পারে। নুসরাত ফারিয়া, ববি, আইরিন, শিরিন শিলাদের সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতা মিম আর শর্মী মালাও ক্ল্যাসিক সিনেমাতে দুর্দান্ত অভিনয় করতে পারেন। তারা একাই সিনেমার গল্প টেনে নিয়ে যেতে পারেন। তারা সবাই মিলে বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য কিছু করবেন, এই প্রার্থনা করতেই পারি।

আমাদের দেশে প্রকৃত হল মালিকের সংখ্যা কত? কেউ বলতে পারবে না । খোদ সরকারও জানে না। আদা, রসুনের বেপারিরা হল চালাচ্ছে। সেই হল আবার গোডাউন হচ্ছে। পুরান ঢাকার আজাদ ম্যানসন হলে গেলে রীতিমতো বমি আসে। পূরবী, এশিয়া মরছে। ঢাকার বাইরের হলের অবস্থা আরো খারাপ। সেখানে মদ, জুয়া, পতিতা…. আর বাকিটা সবাই জানে।

 

’মাটির ময়না’ যা আমাদের দেশকে খুব সহজভাবে তুলে ধরে বিশ্বে...পাইরেসি ইস্যুতে পাইরেটাররা কারা এটা কিন্তু প্রযোজক, পরিচালক জানেন। তবে মুখ খুলতে চান না। কেন? তার উত্তর পাইনি। মধ্যস্বত্ত্বভোগী ফড়িয়ারা যে প্রকারান্তরে কাদের পক্ষে কাজ করে, তা কিন্তু বলতে নারাজ তারা। সিনেমা ব্যবসা খারাপ । তারপরও কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হচ্ছে না। টাকা কোথা থেকে আসছে? কেন আসছে? কারা দিচ্ছে? লোকসানি প্রকল্পে কেন টাকা ঢালতে হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়ে পাইনি আমি। জল ঘোলা হবে। গর্ত খুঁড়লে কেউটে সাঁপ ফুসফুস করে উঠে। ‘সিনেমার প্রতি ভালোবাসা’ এসব বাকওয়াস। বাদ দেন।

প্যারালাল নির্মাতাদের একটা বড় অভিযোগ, তাদের অফট্র্যাক নির্মাতা বলে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। কিন্তু তারা কতদিন এফডিসিতে যান? তারা তো বাণিজ্যিক নির্মাতাদের কথা শুনলে নাক সিঁটকান। অন্যদিকে বাণিজ্যিক নির্মাতারা তাদের বলছেন, মহা পণ্ডিত। এ দুরত্ব ঘুছবে কবে?

আমরা অবশ্যই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলা সিনেমাকে পৌঁছে দিতে চাই। কিন্তু আগে তো নিজের বাজারকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে হবে। বাজারকে শক্ত করার কোনো পদক্ষেপ তো দেখি না। নানা থিওরি বলা হয় নানা সেমিনারে। কিন্তু কেউ সেটা প্রয়োগ করতে পারেন না। কোথায় যেন ভয়!

প্রযোজক সমিতির নির্বাচন হয় না কতদিন। সে নির্বাচন না হলেই কি ভালো? প্রযোজক সমিতিতে নানা দ্বন্দ্ব। এপক্ষ ওপক্ষ করে নির্বাচন আটকে রেখে আসলে ফায়দা লুটতে চাইছে কারা, তা জানতে হবে। চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানটির বেহাল দশা কিন্তু অনেকাংশেই ভোগাচ্ছে বাংলা সিনেমাতে। তাদের শক্ত অবস্থানই পারে, এ দেশে ভারতীয় চলচ্চিত্রের আগ্রাসন ঠেকাতে। মমতা বন্দোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ, দেব সাহেবরা তো চাইবেন, এ দেশে তাদের সিনেমা বিক্রি করতে। নানারকম টোপ ফেলবেন। আমাদের সরকারকে সেটা গেলানোর চেষ্টা করবেন। তবে সেই প্রচেষ্টাকে রুখে দাঁড়াতে হলে শক্তপোক্ত প্রযোজক ও প্রদর্শক সমিতির দরকার।

2

বাংলা সিনেমা লোকে দেখে না, কথাটি ভুল। লোকে অবশ্যই দেখে। হলেও উপচেপড়া ভিড় হয়। রিক্সাচালক, গার্মেন্টসকর্মীরা নন , এ দেশের তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে সিনেমা বানাতে হবে। সে সিনেমার গল্প হতে হবে সত্যিকারের জীবন নিয়ে। গল্পের কাহিনির অভাব নেই। চারপাশে অনেক ঘটনা ঘটে। সামাজিক-রাজনৈতিক-কিংবা ব্যক্তিজীবনের এমন অনেক ঘটনা আছে, যা দিয়ে খুব সহজে দুর্দান্ত চিত্রনাট্য লেখা যায়। নকলবাজ কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকারদের ধরিয়ে দিতে হবে। তাদের বিরুদ্ধেও আন্দোলন হতে পারে। এরা চলচ্চিত্রটাকে নষ্ট করে দিচ্ছে।…

পরিশেষে আমি আশার আলো দেখি। নতুন নির্মাতারা আসছেন। তারা সিনেমাকে নতুন সংজ্ঞা দেবেন। সিনেমার নতুন ভাষা তৈরি হবে। নতুনভাবে নতুন উদ্যোগে সিনেমা নির্মিত হবে। অ্যানালগ সিস্টেমের নির্মাতারা সরে গিয়ে নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের সুযোগ করে দেবেন, এটা প্রত্যাশা করি।…

জয় হোক বাংলা চলচ্চিত্রের।