ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

স্কুল-কলেজে প্রকাশ্যে প্রেম নিবেদনের ঘটনাগুলো ফেইসবুক হয়ে ক্রমেই সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে। বিকল্প গণমাধ্যম হয়ে উঠা ফেইসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে গাইছেন সাফাই। কেউ আবার ধর্মীয় লেবাসে নানা যুক্তিতে নিজের মতামত তুলে ধরছেন।

রাজধানীর কমার্স কলেজের দুই তরুণ-তরুণীর প্রেম নিবেদনের বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হল। স্কুলড্রেস পড়ে প্রেম নিবেদন করা যাবে না, এমন কোনো আইন আমি কখনো শুনিনি। হ্যাঁ, ছেলেমেয়ে দুটি অপ্রাপ্তবয়স্ক বটে। তাদের পড়াশোনা করার কথা। কিন্তু তারা পড়াশোনা না করে প্রেম নিবেদন করেছে-এমন অভিযোগে হায় হায় রব পড়েছে সারা দেশে।

অপ্রাপ্তবয়স্কে নিষিদ্ধ বস্তু বা ব্যাপারের প্রতি আকর্ষণ থাকবেই। সেই আকর্ষণকে ক্রমেই ফ্যান্টাসিতে পরিণত করছি আমরা।

আমরা বলেছি, স্কুল বা কলেজের পোশাকে প্রেম নিবেদন করা যাবে না। কিন্তু দেশের পুলিশ যখন তাদের পবিত্রতম পোশাকটি গায়ে চড়িয়ে ধর্ষণ করে, ঠুস করে গুলি ছুঁড়ে কিংবা মোড়ে দাঁড়িয়ে রিক্সাওয়ালার কাছ থেকে পাঁচ টাকা ঘুষ খায়, তখন কই থাকে বিশেষ ব্যক্তিবর্গের বিশেষ নীতিকথা? বুলি কপচানোর আগে একবার চারপাশ ভালো করে দেখুন।

বয়োঃসন্ধির সমস্যা সম্পর্কে আমরা নিজেরা কখনো সচেতন হতে পারেনি। হস্তমৈথুন, চুম্বন, যৌনক্রিয়া ইত্যাদি সম্পর্কে আমরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছি। ধর্মীয় বিধিনিষেধের দোহাই দিয়ে আমরা লুকিয়ে রাখছি স্বাভাবিক জীবনযাপনের নানা প্রক্রিয়াগুলো।youth

এখন ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়ে গেছে। নীলক্ষেতের মোড়ে গিয়ে পর্ণোগ্রাফির জন্য অপেক্ষা করতে হয় না, পত্রিকার দোকানে গিয়ে রসময় গুপ্তও খুঁজতে হয় না। ইন্টারনেটে অ্যাভাইলেবল এসব কনটেন্ট। ছেলেমেয়েদের হাতে মোবাইল ফোনও আছে। তারা দেখছে। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও।

আমরা রুখতে পারিনি, রুখতে পারবো না।

আজ থেকে চার বছর আগে কালের কণ্ঠে কাজ করতে গিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের পর্ণোগ্রাফি নিয়ে কাজ করছিলাম আমি। রাজধানীর শীর্ষস্থানীয় স্কুল-কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা তখন নীলক্ষেতে আসে। নীলক্ষেতের নীল ব্যবসা তখন রমরমা। ওদের সঙ্গে কথা বলে মনে হল, ওরা প্রেম আর যৌনতা ব্যাপারটিকে গুলিয়ে ফেলেছে। ওদের মাথায় পোকা ঢুকেছে। সে পোকাটি বড় অশ্লীল সব ধারণার জন্ম দিচ্ছে।

প্রেম ব্যাপারটিকে ট্যাবু বানিয়ে যৌনতার সঙ্গে মিশ্রণ ঘটিয়ে বড় বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে আমাদের সমাজব্যবস্থা। ‘যে বয়সে অঙ্ক করবে সে বয়সে প্রেম’– মুরুব্বিয়ানা মার্কা কথাগুলো বড় অযৌক্তিক। আকাশসংস্কৃতি কিংবা ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে দোষারোপ না করে ভাবুন তো, প্রেম ব্যাপারটিকে সত্যিই আমরা ফ্যান্টাসি বানিয়ে ফেলেছি কি না? চারপাশে যৌনতাবিষয়ক কুৎসিত আলোচনায় ‘নিষিদ্ধ মধু’ নিয়ে ক্রমেই উৎসাহী হয়ে উঠছে তরুণরা। মোবাইল কিংবা ট্যাব সবকিছুতেই তারা সানি লিওনি, মিয়া খালিফার পর্ণভিডিও খুঁজে। এখন আর নীলক্ষেতের দোকানে গিয়ে পর্ণোগ্রাফি কিনতে হয় না।

প্রেম সবসময়ই পবিত্র, সে যেকোনো বয়সেই হতে পারে। কামাসক্তি আর প্রেম বিষয়টি যে এক নয়, তা আমরা কখনো বলতে পারিনি আমাদের সন্তানকে, আমার ভাইকে কিংবা বোনকে।
ধর্মীয় লেবাসে ঢাকা পড়ে থাকা সেই আলোচনা জোরেশোরেই হোক। নচেৎ বিশাল এক প্রজন্ম ফ্যান্টাসির কবলে পড়ে নিজের ভবিষ্যৎই হারিয়ে ফেলবে।

বায়োলজিক্যাল ইস্যুগুলো নিয়ে ফিসফিস না করে তরুণদের একত্রিত করে বোঝানো উচিত, ওরা কিভাবে নিজেদের ক্ষতি করছে। ভয়াবহতার কথা তারা জানে না।

মোল্লা-পুরুতের ভয়ে ঘরে দোর এঁটে বসে থাকবেন, তো আপনার ছেলেমেয়েটি একদিন ফ্যান্টাসি চক্রে হারাতে বাধ্য।

স্কুলকলেজের নীতিমালা প্রসঙ্গেও আমাদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে। ছেলেদের শিফট মেয়েদের শিফট আলাদা করা কোনো সমাধান নয়। ছেলেমেয়ে উভয় পক্ষকে ছোটবেলা থেকেই লিঙ্গ বৈষম্য শেখায় আলাদা শিফট ব্যবস্থা। তারা পরস্পরকে কেন প্রতিপক্ষ ভাববে?

শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর, কিন্তু সেই শিক্ষকরাই যে বৈষম্যরেখা টেনে দিচ্ছেন প্রকাশ্যে। এই চর্চা বন্ধ করতে হবে।

স্কু্লের নীতিমালা জারি করলেই হবে না, তা যেন তারা মানে , সেটিও তাদের বলতে হবে। মোহান্ধ হয়ে প্রেমের সম্পর্কে না জড়িয়ে ছেলেমেয়েদের মধ্যে মিষ্টিমধুর বন্ধুত্ব হতে পারে,  এ কথাও তাদের বোঝাতে পারি আমরা।

ধর্মীয় নীতিকথাও শোনাতে হবে তাদের। প্রতিটি ধর্মই জীবনের নানা পথ বাতলে দিয়েছে। পবিত্র সব ধর্মগ্রন্থের কথাও তাদের বলতে হবে। তারা ধর্মগ্রন্থ পড়ে না, তাদের পড়তে উৎসাহী করতে হবে।

ইন্টারনেটের ব্যবহার সম্পর্কেও তাদের বলতে হবে। তাদের নিয়ে ভালো মুভি, ভালো ডকুমেন্টারি দেখুন। তাদের আনন্দ বিনোদনের উপকরণ বাড়ান। তাতেই মঙ্গল হবে।

নজর রাখুন, আপনার সন্তানের তারুণ্যে, উচ্ছ্বলতায়। ওদের বন্ধু হয়ে উঠুন। শাসন ভালো, কিন্তু কড়া অনুশাসন নয়। ওদের সঠিক ফেরাতে এটাই সর্বোৎকৃষ্ট সময়।