ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, সেলুলয়েড

 

নকল, জাল –জালিয়াতি আর বাস্তবতা বিবর্জিত কিছু অফট্র্যাক সিনেমার ঘরানা থেকে বেরিয়ে এসে চলচ্চিত্রাঙ্গনে একটা ভালো মুভির আকাঙ্ক্ষা ছিলো অনেকদিনের।  ঢাকাই সিনেমা নিয়ে নাক সিঁটকানো দর্শক এখন দলে দলে চলেছেন হলে। সিনেমা ভালো কি মন্দ সেটার চুলচেরা বিশ্লেষণ করার আগে অন্তত একটিবার তারা সিনেমা হলে যাচ্ছেন ‘ঢাকা অ্যাটাক’ দেখতে।

প্রেক্ষাগৃহের বাজে অবস্থা, তার প্রেক্ষিতে সংখ্যায় কমে যাওয়া, সিনেমার মন্দা বাজার – এসব কিছুর পরও ‘ঢাকা অ্যাটাক’ টেবিল মানি তুলে আনতে পারছে, ‘নিট কালেকশন ভালো’ – গণমাধ্যমের এমন সব খবর কিন্তু আমাদের আশা জাগায়। মাত্র ২২৮টি চালু থাকা প্রেক্ষাগৃহকে নিয়ে বাংলাদেশি সিনেমা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে সেটা কিন্তু ভাবার অবকাশ দিয়েছে ‘ঢাকা অ্যাটাক’।

প্রপার ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল আর কাকরাইল পাড়ার ফড়িয়াদের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া গেলে ‘ভালো’ মানের ঢাকাই সিনেমা দিয়ে আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি করে প্রদর্শক সমিতি যখন প্রেক্ষাগৃহগুলো বাঁচাতে ব্যর্থ, তখন হয়তো ‘ঢাকা অ্যাটাক’ এর মতো সিনেমাগুলো আমাদের প্রেক্ষাগৃহগুলো বাঁচাবে। কিংবা এ দেশের সিনেমা হলে ভারতীয় দাদাদের রিমেক করা ছবি এনে টাকা পাচারও রোধ করতে পারে।

বাদ দিলাম, এসব হিসাবনিকেষ। শেষ কবে কোনদিন কমার্শিয়াল সিনেমা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছিলাম মনে পড়ে না।  যা কিছু নিয়ে আলোচনা করবো তাও তো আবার তামিল, মারাঠির নকল! চলচ্চিত্র আন্দোলনের আসল কথা হল, ‘ভালো ছবি নির্মাণ, ভালো ছবির ভালো দর্শক’ তৈরি করা।  ‘ঢাকা অ্যাটাক’ পুরোপুরিভাবে তা না পারলেও এ প্রক্রিয়ার সূত্রপাত তো নিশ্চয়ই করেছে। এটাই ‘ঢাকা অ্যাটাক’ এর কৃতিত্ব।  ত্রুটি তো অবশ্যই ছিলো, ছিল কত গরমিল। তবে নির্দ্বিধায় বলতে হয় ‘ঢাকা অ্যাটাক’ এই ক’বছরের মধ্যে হওয়া ‘স্মার্ট’ মুভিগুলোর একটা।

নিজ দেশিয় প্রযুক্তি, গল্প আর একেবারেই সাদামাটা ফরম্যাটে বাংলাদেশের দর্শক দেখতে চেয়েছিলো নিজের চিরচেনা গল্পকে। ‘ঢাকা অ্যাটাক’ সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পেরেছে কি না জানি না, তবে দর্শকের তৃষ্ণা কিন্তু সত্যিই বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন একটা ভালো মুভির জন্য হা-পিত্যেষ করবে এখন দর্শক। নির্মাতা ‘ঢাকা অ্যাটাক—এক্সট্রিম’ শিরোনামে ছবিটার সিকুয়্যাল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। সেটা কবে আসবে, কী হবে, নায়ক কি আরেফিন শুভ থাকবে নাকি সুমন হবে, মাহিয়া মাহিকে কি বাদ দেওয়া হবে নাকি—এমন সব প্রশ্নের জাল কিন্তু অন্তর্জালে ছড়িয়েছে। কেউ ‘ঢাকা অ্যাটাক’- এর স্তুতি করছে, কেউবা এর খুঁটিনাটি ভুলত্রুটি নিয়ে সিনেমাটিকে মার্কিং করতে শুরু করেছে।  আইএমডিবি রেটিং তো বাংলা মুভি নিয়ে হয় না। এবার বাঙালি দর্শক যদি নিজস্ব একটা রেটিং সিস্টেম দাঁড় করিয়ে ফেলে, সেটা কিন্তু ভীষণ ভালো আর দারুণ ব্যাপার হবে।

লিপস্টিক মাখা নায়ক আর ভুঁড়িসমৃদ্ধ নায়িকার প্রেম, রোমান্স আর কুৎসিত যৌনতায় ভরা সুরসুরি মার্কা সিনেমা দর্শক বর্জন করছে, তারা এখন সত্যিই একটা সাদামাটা সিনেমা চায়, যা বলবে তাদের সমাজের কথা। তাদের সমস্যা সমাধানের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি তাদের নির্মল বিনোদন দেবে। আমাদের এফডিসিতে যেসব পরিচালক আর চিত্রনাট্যকাররা আছেন, তাদের গালে একটা সশব্দ থাপ্পড় মারতে পেরেছে ‘ঢাকা অ্যাটাক’। বাস্তবতাবিবর্জিত ছবি নিয়ে চলচ্চিত্র বাঁচাও আন্দোলন যে কেবল একটা বুজরুকি, তা বুঝতে আর  বাকি নেই কারও।

ঢাকা অ্যাটাক

শুভ-সুমনের এই সিনেমাটি একইসঙ্গে অফট্র্যাক ঘরানার ভাবনাকেও একটু নাড়িয়ে দিলো। টিভি নাটক থেকে এসে  দর্শক সেন্টিমেন্ট, ট্রেন্ড, চাহিদা বুঝে যে একটা সিনেমার গাঁথুনি দিতে হয়, তা শিখিয়ে দিলেন নতুন নির্মাতা দীপঙ্কর দীপন। চিত্রনাট্য কিন্তু খুব আহামরি গোছের কিছু না। আমাদের খুব চেনা গল্প।  আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক’টা অপারেশনের গল্প। গণমাধ্যমের কল্যাণে যা আমরা অনেক আগেই জেনে গেছি। সেই গল্পর গাঁথুনি হয়তো পারফেক্ট বা শতভাগ মজবুত করতে পারেননি চিত্রনাট্যকার সানি সানোয়ার, কিন্তু পরিচালক পর্দায় যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা কিন্তু দর্শক টানছে হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালার মতো। কোনো জাদুকরি ক্ষমতা, দৈব ক্ষমতা লাগে না, দর্শককে হলে টানতে হলে প্রথমেই তাদের চিরচেনা গল্পটা একটু রঙচঙ মিশিয়ে বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করতে পারলেই কিন্তু কেল্লাফতে!  পরিচালক এখানেই  সফল।

নির্মাতা দীপঙ্কর দীপন কিন্তু আরেকটা কাজেও সফল। সেটা হলো আরেফিন শুভকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কমার্শিয়াল সিনেমাতে শাকিব খানের পরে আরেকটা নায়ক প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এফডিসির ডিরেক্টররা যখন মাথা কুঁটে মরছেন, কিংবা ভুলভাল পথে হাঁটছেন, তখন তাদের পথ দেখালেন মি. দীপন। ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারি পুলিশ কমিশনার এবং বোমা নিষ্ক্রিয় বিশেষজ্ঞ ‘আবিদ রহমান’ এর যে চরিত্রটি শুভ রূপায়ন করেছেন, তা তার ক্যারিয়ারের সত্যি প্লাস পয়েন্ট।

নায়কের পাশাপাশি  প্রধান পার্শ্ব চরিত্রটি রূপায়ন কিন্তু সব পরিচালক পারেন না কিংবা করতেই চান না। সোয়াট বাহিনীর কমান্ডার আশফাক চরিত্রটিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে।  এবিএম সুমন প্রমাণ করে চলেছেন নিজেকে। নির্মাতারা এবার তাকে নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে পারেন। ‘ঢাকা অ্যাটাক’ সিনেমাকে তাই তো শুভ—সুমনের সিনেমা বলতেই হয়।

কন্টিনিউয়েশনের বড় অভাব ছিল, মাহিয়া মাহি অভিনীত ‘চৈতী’ চরিত্রটিতে। চৈতী চরিত্রটি যতবার সামনে এসেছে, মনে হয়েছে, এ আবার এখানে কেন? এখন কেন?  ‘চৈতী’র উপস্থিতি সময়ানুযায়ী দাবি করেছে কি না এ প্রশ্ন উঠতে পারে বারবার।  কোন চরিত্রের ব্যাপ্তি আরও একটু বেশি সময় ধরে দাবি করলেও পরিচালক তা করেননি। আবার কোনো চরিত্রকে অযথা পর্দায় উপস্থাপন না করে ভয়েস ওভার দিয়ে চালিয়ে দিলে কিন্তু হত।

সাংবাদিক চরিত্রটিকে চিত্রনাট্যকার (গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার) সানী সানোয়ার সাহেব ইচ্ছাকৃতভাবে এত কুৎসিতভাবে উপস্থাপন করেছেন, এতে ক্রাইম রিপোর্টারদের মনে দর্শকদের একটা বাজে ধারণা তৈরি হতে বাধ্য। পুলিশের কীর্তিকে ক্রাইম রিপোর্টাররা যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তাতে তিনি রেগে গিয়ে সানী সাহেব ‘চৈতী’ চরিত্রটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপস্থাপন করেছেন। ‘চৈতী’ চরিত্রটি উপস্থাপন করতে গিয়ে পরিচালক হোমওয়ার্ক করেছেন বলেও মনে হল না।

একটি টিভি চ্যানেলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার পরও তিনি কেন ক্রাইম রিপোর্টারদের চিনবেন না তা বোধগম্য হল না। মাহিয়া মাহি চিত্রনাট্য অনুযায়ী ন্যাকামো, ভাঁড়ামো করে গেলেন পুরো সিনেমা জুড়ে। সিনেমাতে আরো একটি নায়িকা চরিত্র আছে, ‘আশফাক’ এর স্ত্রী ‘সিনথিয়া’। ছোট চরিত্রটিকে কাজী নওশাবা আহমেদ এত মমতা আর এক্সপ্রেশনে ভরপুর করে তুললেন – দর্শক কিন্তু মাহিয়া মাহিকে বাদ দিয়ে তার কথাই বলেছে। সংক্ষিপ্ত সময়ে প্রেগন্যান্ট ওয়াইফের ক্যারাক্টার পোর্ট্রে করায় নওশাবাকে এ+ মার্কস অবশ্য দেওয়া যায়।

সিনেমার মূল ভিলেন ‘জিসান’ চরিত্রে তাসকিন যথাযথ অভিনয় করেছেন। তবে চিত্রনাট্যকার আর পরিচালকের উচিৎ ছিল, এই চরিত্রটিকে নিয়ে আরো বেশি গবেষণা করা। একজন সাইকো কিলারের আরো বেশি উপস্থিতি কিন্তু চিত্রনাট্য দাবি করেছিল, কিন্তু তা হয়নি। কন্টিনিউয়েশনের অভাব ছিল এই চরিত্রটিকে ঘিরে। বোম্বিং সিকোয়েন্স, তার ইনভলভমেন্ট, তার চাচা হাসনাত করিমের কানেকশান, সবকিছুর একটা কন্টিনিউটি বড় দরকার ছিল। কিন্তু সেটা ছিলে না। ক্লাস সিক্স পড়ুয়া একটা বাচ্চার মাথায় কখনো বোমা বানানোর প্ল্যান আসে কি না, তা বোধগম্য হয়নি।

সিনেমাতে অন্যান্য চরিত্র বলতে হবে ‘সাজেদুল করিম’ এর কথা। পুলিশ বিভাগের সিনিয়র অফিসারের চরিত্রটি রূপায়ন করতে শতাব্দী ওয়াদুদ তার সেরাটি দিয়েছেন। এই চরিত্রটি যথাযথ স্পেস পেয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চরিত্রে সৈয়দ হাসান ইমাম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে আলমগীর, আফজাল শরীফ।

তবে শিপন মিত্র মালয়েশিয়ায় পুলিশের ভূমিকায় কি করলো না করলো তা বোধগম্য হল না। জিসানের সঙ্গে আন্ডার গ্রাউন্ড কানেকশনই কিন্তু হতে পারত, সিনেমার মূল উপজীব্য। কিন্তু সেটা স্রেফ ভয়েসওভারে চালিয়ে দিয়ে, পরিচালক একটা  দুর্বলতার প্রমাণ দিলেন। নাকি আন্ডারগ্রাউন্ডের আধিপত্য দেখালে সেটা প্রকারান্তরে পুলিশের সাফল্যে আঘাত হানবে।

বারবার মনে হয়েছে, সিনেমাটিতে শুধুমাত্র পুলিশকে ‘শ্রেষ্ঠ’ প্রমাণের একটা জোর প্রচেষ্টা চলছে। অপরাধের আরো গহীনে ঢুকে পুলিশকে আরেকটু খেলিয়ে নিলে সেটা দারুণ ব্যাপার হত। অপরাধীকে কালেভদ্রে জিতিয়ে দেওয়া সিনেমার ক্যানভাসে দোষের কিছু হত না। সানী সানোয়ার সাহেবের গল্প, চিত্রনাট্য একমুখী, একপেশে হয় সিনেমার অনেক মজাই নষ্ট করে দেয়।

শট ডিভিশনে ভুলগুলো বড় চোখে ধরা পড়েছে। সিকোয়েন্স মিলাতে গিয়ে প্রায়ই  গড়বড় করেছেন পরিচালক।

film-iner-2_4

মাহিয়া মাহির রিপোর্টিংয়ের সিকোয়েন্সগুলো কেমন খাপছাড়া মনে হলো প্রায়। বোম্ব ডিস্পোজাল সিক্যুয়েন্সে মাহিকে কোনোভাবেই প্রয়োজন ছিল না। বিরক্তির উদ্রেক করেছে এটা। একটা দম বন্ধ করা অপারেশনের সময়ে আবেগী গান না হলেও কিন্তু বেশ হতো। বোম্বিংয়ের ঘটনার পর টিভি স্ক্রলে দেখা যাচ্ছিল, সবগুলো স্কুল বন্ধ, তখন শেষ সিকোয়েন্সে দেখানো হল, সেই স্কুলগুলোর একটিতে জাতীয় পতাকা উৎসব নিয়ে রিহার্সেল চলছে।

সিনেমাটোগ্রাফির কথা আলাদাভাবে বলতেই হবে। টপ শট, মিড লং শট বা ক্লোজ শটগুলো বেশ ছিল। ক্যামেরার কাজে অগাধ পাণ্ডিত্য দেখিয়ে গন্ডগোল বাধিয়ে দেননি পরিচালক।  অ্যাকশন সিনেমাতে ক্যামেরার কাজে মাত্রাতিরিক্ত নিরীক্ষা না করার জন্য তিনি একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন।

গান যে দুটো আছে, তাও প্রশংসা পাবে। কিন্তু পরিচালক-প্রযোজকরা  ‘টুপ টাপ’ গানটি গাওয়ার মতো দেশের কোনো  আর্টিস্টের উপর আস্থা রাখতে পারলেন না কেন, তা একটা প্রশ্ন থেকেই যাবে। দুটো গানের পাশে একটা আইটেম গান। লামিয়া মিমো ভালো নাচিয়ে বটে। কিন্তু  লিরিক্সটা ভালো ছিল না ‘টিকাটুলী’ গানটার।

অনেক ভুলেভরা সিনেমা ‘ঢাকা অ্যাটাক’। কিন্তু এই সিনেমাটি ই যে আমাদের সিনেমার বাঁকবদলের পথে একটা অস্ত্র হয়ে গেল। একটা বার্তা দিলো সিনেমাটি – ভালো সিনেমা হলে দর্শক প্রেক্ষাগৃহে আসে। সেই ভালো সিনেমার প্রতীক্ষা বাড়িয়ে দিলো ‘ঢাকা অ্যাটাক’।

দীপঙ্কর দীপন মস্ত বড় রেভ্যুলেশন হয়তো ঘটাতে পারেননি, কিন্তু রেভ্যুলেশনের পথটা হয়তো তিনি দেখালেন। নাটকের নির্মাতারা সফল হয় না,  অপবাদ মুছে ফেলে তিনি হাটবেন তার মতো করে । ভুল ত্রুটি শুধরে নিয়ে তিনি আগামি সিনেমাটি বানাবেন।  আমরা সেটাও নিয়ে তার প্রশংসা স্তুতি করবো, আবার কটু কথাও শোনাব।  তিনি সমালোচনা নিতে পারলেই হয়।

‘ঢাকা অ্যাটাক’ টিমের জন্য শুভ কামনা।