ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

ফুটবল বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে গেল এশিয়ার দেশ জাপান। দেশটির উত্তরাঞ্চলের পার্বত্য এলাকা কাজুনোর এক  নাগরিক মিতিশো আন্টির সুবাদে দেশটির প্রতি আমার অন্যরকম ভালোবাসা কাজ করে।

মিতিশো আন্টি আমার সিলেটের স্বজন জামান কাকার স্ত্রী। জামান কাকা কাজের সুবাদে জাপানে গিয়েছিলেন আশির দশকের। তারপর থিতু হয়ে যান সেখানেই। মিতিশো আন্টিও টোকিওতে এসেছিলেন পড়াশোনা করতে।

জামান কাকার সাথে মিতিশো আন্টির সখ্যতা সম্ভবত কোনো এক মদের আড্ডায়। সেখান থেকে তারা  একে অন্যের দেশ নিয়ে জানলেন। একে অপরের সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হলেন। তারপর একদিন দুজনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন জীবনের বাকিটা পথ একসঙ্গে হাঁটবেন।

ধর্ম আর ঘুণে ধরা সমাজ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বটে; তবে সামাজিক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই জামান কাকা একদিন মিতিশো আন্টির গলায় মালা দিলেন।

মিতিশো আন্টিদের সময়ে ইন্টারনেট ব্যবস্থা কেমন ছিল, তা নিয়ে জানা নেই আমার। তবে মিতিশো আন্টি খুব পড়তে ভালোবাসতেন। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস নিয়ে পড়তেন বেশি। কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলে তিনি লাইব্রেরিতে যেতেন।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তাকে বেশি টানত। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা, রাজনীতি, স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে বিস্তর পড়ালেখা করতে চাইলেন। মিতিশো আন্টি খুব করে চাইতেন, বাংলাদেশে আসবেন। যে দেশের জন্য ত্রিশ লাখ মানুষ রক্ত ঝরিয়েছে, যে দেশের জন্য জামান কাকা তার পরিবারের নারীদের হারিয়েছেন, যে দেশে এক মহান নেতা শেখ মুজিব আছে, সেই দেশে আসতে চেয়েছেন মিতিশো আন্টি।

মিতিশো আন্টি ইংরেজি জানতেন না। জামান কাকা তাকে পড়ে পড়ে শোনাতেন। আর তা শুনেই মনে রাখার চেষ্টা করতেন মিতিশো আন্টি। আর তার একটা বাদামি রঙের ডায়েরিতে টুকে রাখতেন হাজারো প্রশ্ন।

মনে মনে ভেবেছিলেন- বাংলাদেশে গিয়ে সে দেশের মানুষকে তিনি হাজারো প্রশ্ন করবেন। বিপত্তি বাধল আবার; তিনি  ইংরেজিটা খুব ভালো জানেন না।

মিতিশো আন্টি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি বাংলা শিখবেন। বাংলাদেশে গিয়ে তিনি বাংলায় কথা বলবেন। সবার আগে নিজের শাশুড়িকে চমকে দেবেন ভেবে বাংলা ভাষা শিখতে শুরু করলেন। শুধু তাই নয়, তিনি জামান কাকার হাত ধরে বাংলাটা লিখতেও শিখে গেলেন।

জামান কাকাদের বাড়ি ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া এলাকায়। কাছেই বাওর, একটু দূরে হাকালুকি হাওর। হাওরের উত্তুঙ্গ বাতাসের গল্প শোনাতেন জামান কাকা। শোনাতেন নীলচে আকাশের তলায় উত্তাল জলরাশি, তার বুকে ভেসে বেড়ানো ভুখানাঙ্গা মানুষ আর জীবনযুদ্ধের গল্প। জামান কাকা শোনাতেন পাহাড় গড়িয়ে নেমে আসা জল, চপলা জলকাহনে কখনো চোখ ভিজে আসতো মিশিতো আন্টির। এভাবেই একটা দেশের প্রতি ভালোবাসা জন্মেছিল তার।

মিতিশো আন্টি জানতেন, জামান কাকার পরিবারের একাত্তরের স্মৃতিকথা। জামান কাকার বোন, ফুফুদের হারিয়ে যাওয়া, আত্মদান আর তারপর নৃশংস বর্বরতার গল্প। তাইতো কর্মস্থলে একদিন এক পাকিস্তানিকে পেয়ে গালমন্দ করেই ক্ষান্ত হননি, তাকে চটিপেটা করতেও ছুটেছিলেন। জাতিতে জাপানি হলেও মনেপ্রাণে মিশিতো আন্টি যে তখন পরিপূর্ণ এক বাঙালি, যার বুকে বাংলার জন্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

একদিন জামান কাকা, মিতিশো আন্টির ছুটি মিলে যায়। সাদারঙা বিমানে চেপে টোকিও থেকে ঢাকার কুর্মিটোলা, তারপর সেখান থেকে রাতের ট্রেনে চেপে মাইজগাও, আর তারপর ঘিলাছড়া।

সেদিন খুব বৃষ্টি ছিল।  তবু কাদামাখা পথ মাড়িয়ে তিনি উঠে গেলেন ঘিলাছড়ার বাড়িটায়। টিলার উপরে জামান কাকার আম্মা। প্রথম দেখাতেই জামান কাকার আম্মাকে ‘আম্মা’ বলে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন মিতিশো আন্টি। সে দৃশ্যের সাক্ষী ছিল ছোট কাকা। মিতিশো আন্টি সবাইকে একদম দশ মিনিটেই আপন করে নিলেন।

জামান কাকা বলতেন, এটা ছিল মিরাকল। মিতিশো আন্টিকে দেখতে সেদিন নাকি জনস্রোত বয়েছিল টিলাবাড়িতে।

মিতিশো আন্টিকে দেশ চেনাতে হবে। ঘিলাছড়া থেকে সার কারখানা খুব দূরে না। একদিন একটা বেবিট্যাক্সি চেপে জামান কাকা মিতিশো আন্টিকে নিয়ে চলে এলেন আমাদের আইটি কলোনির বাসায়।

তখন আমাদের একান্নবর্তী পরিবার। বাবা, মা, পিসি, ঠাকুমা, জেঠিমা, কাকা, জেঠতুতো ভাইবোন… বাসা রীতিমতো গমগম করছে। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি ট্র্যাডিশনের দেশ থেকে এসে একটা জয়েন্ট ফ্যামিলি দেখার আনন্দ কে সামলায়!

আমি তখন বোধহয় দুই বছরের। মা গর্ভবতী। মাকে দেখতে এসে মিতিশো আন্টি তাজা সবজি আর ফলমূল আনতে ভোলেননি।

টিলার ওধারে একটা কুয়ো ছিল। ভীষণ ঠাণ্ডা তার জল। মা সেই জল খেতে ভালোবাসতো। সেটা জেনে একটা বোতলে ভরে জলও নিয়ে এসেছিলেন মিতিশো আন্টি। মা তাকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসেছিলেন।

আমি ছোটবেলায় নাকি একটু  ‘ত্যাদোড়’ টাইপের ছিলাম। মা, বাপ, কাকা, পিসির বাইরে কারো কোলেটোলে চড়তে চাইতাম না। কিন্তু মিতিশো আন্টির সাথে নাকি বেশ বনে গিয়েছিলো আমার। ছবিও আছে মিতিশো আন্টির সাথে। গল্পটা লেখার সময় ছবিগুলো খুঁজলাম। কিন্তু কোথায় যে রেখেছি ছবিটা!

মিতিশো আন্টি যতদিন ঘিলাছড়া ছিলেন,  প্রতি সপ্তাহে দু’তিন দিন আমাদের বাসায় আসতেন। সঙ্গে করে আনতেন, তার সেই বাদামি ডায়েরি। অনেক প্রশ্ন ছিল তার। বাবাকে, মাকে, ঠাকুমাকে দিনভর  প্রশ্ন করতেন মিতিশো আন্টি।

একদিন বাবার সঙ্গে  সার কারখানা ভ্রমণে গেলেন। বাবা কেমিক্যাল ল্যাব, মেশিনারিজ, গ্যাস চেম্বার ব্যাপারগুলো আন্টিকে দেখালেন।

সার কারখানার চারপাশে চা বাগান। সেখানে আছে আদিবাসি পল্লী। মিতিশো আন্টি পিসিকে সঙ্গে করে পল্লীগুলোতে গিয়েছিলেন।

দেশটা চষে বেড়ানোর শখ ছিল তার বড়। ছোট কাকুকে ধরলেন আচ্ছা করে। কাকুর বিভিন্ন জেলায় সফর অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবেন তিনি।

উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব;  চষে বেড়ালেন তারা। বাদ গেল না সিলেটের কোনো জেলা। মিতিশো আন্টি সবচেয়ে বেশি চমকপ্রদ হয়েছিলেন রাজশাহী বিভাগে গিয়ে। পদ্মার রূপালী ইলিশের স্বাদ নিয়ে তিনি খুব করে বলেছিলেন জামান কাকুকে। তারপর নদীর দেশ সফরে বেরিয়ে মাদারীপুর, শরীয়তপুর, বরিশাল ঘুরে এসেছিলেন।

মা বলত, সফরের সব কথা তিনি লিখে রাখতেন সেই বাদামি রঙের ডায়েরিতে। তার সবগুলো ডায়েরি বাদামি ছিল কিনা জানি না। তবে মার ভাষ্যে, সবগুলোর রঙ অবিকল একই্ ছিল।

ছুটি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। দুই মাসের ছুটি শেষে আবার সেই সূর্যোদয়ের দেশে যাবেন জামান কাকু ও মিতিশো আন্টিরা।

যাওয়ার আগের চার-পাঁচটে দিন মিতিশো আন্টি প্রতিদিন আসতেন আমাদের বাসায়। আমাকে দেখতে। জামান কাকুদের বাসায় ছোট্ট বাচ্চা ছিল না। তার সার্কেলের মধ্যে যত পরিবার, তার মধ্যে একমাত্র বাচ্চা আমি। আমাকে কোলে করে মা কেমন করে খাওয়ায়, প্রেগন্যান্সি নিয়ে মা কেমন করে সবকিছু সামলে নিচ্ছে- তা খুব অবাক হয়ে দেখতেন তিনি। তারপর আনমনে কী কী যেন লিখতেন।

মাকে শুধু বলতেন, বাবুর বেবি সাইকেলটা নিয়ে লিখছি। মিতিশো আন্টি আমাদের রক্তজবাটা খুব ভালোবাসতেন। এসেই একটা ফুল তুলে খোঁপায় গুঁজতেন। যাওয়ার বেলায় নিতেন গন্ধরাজ।

অনেক মানা করার পরও ওই শরীর নিয়ে  মা তার প্রিয়তম বন্ধুকে বিদায় দিতে গিয়েছিলেন স্টেশনে। শুনেছি, আমিও গিয়েছিলাম।  মিতিশো আন্টি আমাকে জড়িয়ে খুব করে কেঁদেছিলেন ট্রেনে ওঠার আগে।

জাপানি আন্টিকে বিদায় জানাতে যথারীতি জনস্রোত ছিল মাইজগাও স্টেশনে।

এরপর অনেক বছর কেটে যায়। আমার পরিবারের কাছে মিতিশো আন্টির স্মৃতি বলতে কয়েকটি ফটোগ্রাফ।

মিতিশো আন্টি একদিন বাবাকে চিঠি লিখেন। একদম শুদ্ধ বাংলায় গোটা গোটা অক্ষরে। আমার কঠিন হৃদয় বাবা সেই চিঠি পড়ে কেঁদেছিলেন। তারপর সেই চিঠি পড়ে চিঠির চরিত্ররা সবাই কেঁদেছেন। চার পাতা চিঠির একটা পাতা জুড়ে আমি ছিলাম! আমার ছোট্ট ভাইটার জন্য অনেক চুমু পাঠিয়েছিলেন মিতিশো আন্টি।

চিঠি চালাচালি হতে হতে একদিন বন্ধ হয়ে গেল। মা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। তখন টেলিফোন ছিল না, বাবা  কয়েকবার তারবার্তা পাঠিয়ে প্রত্যুত্তর পেলেন না।

মিতিশো আন্টির কথা আমি বড় হয়ে একদিন জানতে চাইলাম। তখন আমরা সিলেট থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে চলে এসেছি।

একদিন আমাদের ঠিকানায় একটি চিঠি এল। টোকিওর ঠিকানা দেখে বাবা-মা খুব উৎফুল্ল হলেন। চিঠিটা বাদামি রঙা। তার মানে মিতিশো আন্টির নিজের হাতের লেখা। বাবা পুরো চিঠি পড়ে বসে পড়লেন চেয়ারে। ২০০১ সালে যে চিঠিটা আমরা পেয়েছিলাম তা লেখা ছিলো ১৯৯৯ সালে।

তার সঙ্গে আরো একটা চিঠি ছিল জামান কাকুর। ত্রস্ত হাতে ভুল বানানে ভরা সেই চিঠিতে একটা মর্মন্তুদ খবর এসেছে। মিতিশো আন্টি আর নেই।

আমার ফটোগ্রাফে দেখা সেই জীবন্ত চরিত্র এক মুহূর্তে মৃত। এটা কেমন করে হয়?

জামান কাকু লিখেছেন, ২০০০ সালের শুরুর দিকে তার কোলন ক্যান্সার ধরা পড়ে । হায়ার সেকেন্ডারি স্টেজ থেকে ফিরতে লড়াইও করেছিলেন মিতিশো আন্টি। কিন্তু পারেননি।

তার আগে মিতিশো আন্টি আমাদের জন্য একটা উপহার রেখে গেছেন। একটা ছোট্ট বোন। তার নামটা মিতিশো আন্টি কোনোভাবেই জাপানি নাম করলেন না। তার নাম রাখা হয়েছিল আয়েশা তারান্নুম।

আয়েশা তখন স্কুলে যেত। সম্ভবত লেভেল টু বা থ্রিতে পড়ত। প্রতিদিনের মতো অসুস্থ মায়ের ঠোঁটে চুম্বন করেছিল সে। প্রতিদিনের মতো সে মায়ের জন্য তাজা ফুল এনে রেখেছিলো ফুলদানিতে। মাকে বলে গিয়েছিল, মা তুমি চুপটি করে ঘুমাও। স্কুল থেকে এসে তোমাকে খাইয়ে দেব।

আয়েশার মা আর ঘুম থেকে উঠেননি। ওয়াশরুমের ভেতর পাওয়া গিয়েছিল তার মরদেহ।

মিতিশো আন্টি পাহাড় ভালোবাসতেন খুব। চেয়েছিলেন, মরে গেলে যেন তার মরদেহ বাংলার মাটিতে দাফন করা হয়। কিন্তু সেটা তো আর হয়নি। পরে তার জন্মভূমি কাজোনোর পাহাড়ের বড় নিভৃতে একটা জল-জঙ্গলের গ্রামে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

মিতিশো আন্টির অধ্যায়টা হয়তো খুব চাপা থাকত। কখনো খুব খুঁচিয়ে নিয়ে লিখতে পারিনি।

নব্বইয়ের দশকে বাংলা-বাঙালির প্রেমে পড়া এক সাধারণ জাপানি নারীর গল্প হয়তো ভূরি ভূরি রয়ে গেছে। কিন্তু আমার কাছে যে তিনি বড় অসাধারণ।

মৃত্যৃর আগে একটা অসাধারণ কাজ করে গেছেন মিতিশো আন্টি। তিনি তার সব বাদামি ডায়েরির গল্প জাপানি ভাষায় অনুবাদ করে গেছেন। সেগুলো আবার দেওয়া হয়েছে আয়েশাদের স্কুলে। টোকিওতে আয়েশার স্কুলে লাইব্রেরিতে ডায়েরিগুলো হয়তো পাওয়া যাবে এখনো।

বাঙালি শ্রমিকের প্রেমে পড়ে বিধিনিষেধের দেয়াল টপকে সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখানোর সাহস না হয় মিতিশো আন্টি দেখিয়েছিলেন। কিন্তু এই প্রেমকাব্যকে ছাপিয়ে বাঙালির এমন পরম বন্ধু হয়ে ওঠা কয়জনে পারে?

জাপান যাওয়ার সৌভাগ্য কখনো হবে কি না জানি না। আয়েশার ইমেইল আইডিটা পেলে ওকে বলব, ব্রাউন ড্রায়েরির একটা জেরক্স কপি যেন সে আমাকে অবশ্যই দেয়। তার জন্য যতটা মূল্য চুকাতে হয়, আমি করব।