ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

দুই সপ্তাহের টানা উত্তেজনা শেষে খুলছে সাউথ-ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্রী উত্ত্যক্তের জের ধরে প্রতিবেশী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাইম এশিয়ার সঙ্গে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির জের ধরে বনানী এলাকাতেই গত ৩ মার্চ বনানী এলাকা রণক্ষেত্র হয়ে উঠে। ভাংচুর করা হয় দুটি ক্যাম্পাসই। ক্ষতি হয় লাখ টাকার সম্পত্তি। ক্যাম্পাস বন্ধ হয় অনির্দিষ্টকালের জন্য। আমাদের শিক্ষা জীবন থেকে দুটি সপ্তাহ ঝরে গেছে। আমাদের পরীক্ষা অনিশ্চিত। ছাত্রছাত্রীরা ভুগছে আতংকে।

ঘটনার সূত্রপাত বনানীর ১৭ নং রোড সব সময়ই মুখর থাকে নানা পেশার মানুষের পদচারনায়। এই রোডেই প্রাইম এশিয়ার টেক্সটাইল ও সাউথ ইস্টের আইন বিভাগ। ইভ টিজিং বিড়ম্বনায় প্রতিনিয়তই হ্যাপা পোহাতে হয় দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের। ইভ টিজার সংঘবদ্ধভাবে টিজ করে চলে। এদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেকেই হেনস্তার শিকার হয়েছেন। কেউ আবার আহত হয়েছেন মারাত্মকভাবে। সহপাঠী মেয়েটির সম্মান বাঁচাতে গিয়ে অনেকে বেমালুম চেপে যাচ্ছে ঘটনা। যতবারই প্রতিরোধ,প্রতিবাদের সুর উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেটাকে ‘ অপ্রীতিকর’, ‘ শৃ্ঙ্খলা পরিপন্থি’ বলে থামিয়ে দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো ভাড়া করা।তাই ক্যাম্পাসের সিড়ি থেকে নামলেই ক্যাম্পাস আমাদের দায়ভার নিতে চায় না। অনেক ক্যাম্পাস আবার ফ্লোর ভাড়া করেছে। সাউথ ইস্টের কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট, ইইই বিভাগগুলো এ আর টাওয়ারে ক্লাস নিচ্ছে। ষষ্ট থেকে বারো – এই ফ্লোরগুলোর বাইরে ছাত্রছাত্রীদের কোন অসুবিধা হলে কর্তৃপক্ষ তার দায়ভার নিবেন না। দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই একই অবস্থা।

৩ মার্চের ঘটনার সূত্রপাত খাবার দোকানের সামনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যান্টিন আছে। ছেলেমেয়েরা সেখানে যাচ্ছে না কেন..? বাসি পচা খাবার এনে কিছু ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান টেন্ডার বিট করে রাজত্ব করছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। খাবারের দাম এতই বেশি যে ছাত্রছাত্রীরা বাধ্য হয়েই টং দোকানের খাবার খাই। এই খাবার দোকানেই ভিড় জমায় পাশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টরা। ঠুনকো কারনেই অনেক সময় হানাহানি লেগে যায়। কিন্তু এবারের হানাহানি একেবারেই বড় রূপ নিল।

অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী তখন ক্লাসরুমে। বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সূত্রপাত হতেই তারা ঘরে ফেরার তাড়ায় অস্থির হলে শুরু হয় পুলিশ বাহিনীর তান্ডব। যাকে পেয়েছেন, তাকেই বেধড়ক মেরেছেন। টিয়ার শেল নিক্ষেপ করেছে। মেয়েদের অবস্থা আরও সঙ্গীন। জান বাজি রেখে বাসায় গিয়েছে তারা। আমরা বাস না পেয়ে বিকল্প পথে হেটে বাসায় এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এত কিছু জানার প্রয়োজন নাই। গোটা বনানী যখন রণক্ষেত্র, তখন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনেকেই গা বাঁচাতে পড়িমড়ি করে বনানী ছেড়েছেন। অসহায়ের মত আমরা তাদের চলে যাওয়া দেখেছি।

দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ঘটনার শুরুতে মাঠে নামলে এই নৈরাজ্য সৃষ্টি হত না। তারা মজা লুটেছে। খুব অবাক হই, শিক্ষক মহলেও আমাদের বোনের লাঞ্ছনা নিয়ে যখন হাস্যরস হয়। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডার বিষয় হয়ে উঠে ইভ টিজিং। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসে। আমাদের মানবিকতা কত নিচে নেমে গেছে। দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধেই অনিয়মের গন্ধ পেয়েছে ইউজিসি। তদন্তকারী দল কি করবে জানি না আমরা। কিন্তু প্রতি সেমিস্টারে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা গুনে চলা ভার্সিটি আমাদের কি দিয়েছে….. !

অনেক আশা নিয়ে আমরা পড়ছি এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাদের পড়াশোনার মান নিয়ে প্রশ্ন জাগে বারবার। ভিসি, প্রো ভিসি নিয়োগে অনিয়ম, সেনাবাহিনীর দুরাত্মা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন, যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও লেকচারার নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা ভিন্ন খাতে খরচ সহ নানা অনিয়মের শিকার আমরা সাধারন ছাত্ররা। খুব উচ্চবিত্তের ঘর থেকে আসিনি আমরা। মধ্যমানের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টুডেন্ট অ্যাকটিভিটি ফি এর নামে টাকা নিলেও গুটিকয়েক সুবিধাভোগী ফ্যাকাল্টির কারনে আমরা সেই সুবিধা পাই না। ল্যাবরেটরিতে পর্যাপ্ত বই নেই। স্টাডি ট্যুরে যাওয়া তো দূরে থাক, প্রতি সেমিস্টার শেষে অনেক ডিপার্টমেন্টে আমাদের কোন প্রজেক্ট করানো হয় না। প্রতিটি সেমিস্টার দেরিতে শুরু হয়। তাড়াহুড়োতে মিডটার্ম, তারপর ফাইনাল পরীক্ষা। দুই সপ্তাহের বন্ধে আমাদের কোন এক্সট্রা ক্লাস নেওয়া হবে না। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি ল্যাব ক্লাসের আবশ্যিকতা থাকলেও ক্লাস হয় না। ল্যাবের যন্ত্রপাতির অবস্থা খু্বই সঙ্গিন। তারপরও শিক্ষার্থী টানতে বাহারি বিজ্ঞাপন প্রচার করে চলছে বিশ্ববিদ্যালয় দুটি। সেমিস্টার ফি বাড়ছেই কেবল।

কারও মাথা ব্যথা নেই। আমাদের কথা শোনার মানুষ নেই। আমরা কেউ মুখ খুললেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করার হুমকি দেওয়া হয়। তুচ্ছ ঘটনায় হেনস্তার শিকার হন অভিভাবক। পরতে পরতে দুর্নীতি ছড়িয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত কতটুকু সুষ্ঠু হবে আমরা সন্দিহান। নিজস্ব ক্যাম্পাসের কাজে এখনো হাত দেয়নি সাউথইস্ট। প্রাইম এশিয়ার স্থায়ী ক্যাম্পাস নিয়ে চলছে গণ্ডগোল। এর মধ্যেই আবার দুই বিশ্ববিদ্যালয়েই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের নেতারা আস্তানা গেড়েছেন। তরুণদের টানতে তারা নানা উপায়ও বের করেছেন। কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটা জানার পরও নিশ্চুপ। আমাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে এতটাই উদাসীন কর্তৃপক্ষ। জানি না লেখাটা উর্ধ্বতন মহলের নজরে আসবে কি না। আমরা সত্যিই খুব কষ্টে আছি। সার্টিফিকেট নয়, আমরা পরিপূর্ণ শিক্ষা চাই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নীতিমালা আরও স্বচ্ছ হোক। মালিক পক্ষের টাকার কাছে ইউজিসি যেন হার না মানে। স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপনে এবার কড়াকড়ি আরোপিত হোক। টাকার বিনিময়েও আমরা অধিকার বঞ্চিত, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী একটু ভাবুন আমাদের নিয়ে।

জয়ন্ত সাহা
ফিচার সাংবাদিক
শিক্ষার্থী, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়

***
ফিচার ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম থেকে সংগৃহিত