ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

সবে লিখতে শুরু করেছি একটি জাতীয় দৈনিকের ফিচার পাতায়। পত্রিকাটির পাঠক সংগঠনের সাথে অনেকদিন ঘোরাঘোরির পর মাথায় এল, এখানে থাকলে প্রতিভার অবমূল্যায়ন বৈ কিছুই হবে না। বিভাগটির সম্পাদকের বিরুদ্ধে বাতাসে গুঞ্জন – লোকটি অতি মাত্রায় নারী লোভী। বিষিয়ে উঠল মনটা। টুকটাক লিখছি সায়েন্স ম্যাগাজিন ও নগর পাতায়। পূজোর আগে কিছু আইডিয়া নিয়ে ধরনা দিলাম লাইফ স্টাইল ম্যাগাজিনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের কাছে। আইডিয়া পছন্দ তো দূরের কথা, যাচ্ছেতাই ভাষায় অপমান করেছিলেন আমায়। নতুন বলে আমি তখন মুখ বুঝে অপমান গিলছি। তাকিয়ে দেখলাম, চারপাশে চাটুকর প্রদায়কের আনাগোনা। পদলেহী সেই প্রদায়কগুলো নানা গুনকীর্তনে মুখর সহ- সম্পাদকদের। তারচেয়েও বড় আঘাত এল দিনকয়েক পর। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে ভার পড়ল নির্বাচন ম্যাগাজিনের। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা সত্ত্বেও কাজ করলাম। সাড়া ফেলল সেই ম্যাগাজিনটি। কিন্তু প্রকাশের দিন দেখা গেল- শুধু মাত্র পদলেহী কিছু প্রদায়কের নাম এসেছে। বিলও হয়েছে তাদের নামে। মন মানল না। স্বজনদের নিষেধ সত্ত্বেও ছাড়লাম সেই পত্রিকাটি। লেখক মানুষ। সারাদিন এটা সেটা লিখি। বাজারে জোর গুঞ্জন আসছে কালের কণ্ঠ। ফেইসবুকে রিপা ( জিনাত জোয়ার্দার রিপা, সহ সম্পাদক, জয়িতা) আরাফাত শাহরিয়ার (সহ-সম্পাদক- সিলেবাসে নেই) এর দেখা পেলাম। নিয়মিত আপডেট রাখতে শুরু করলাম- কেমন হবে নতুন এই পত্রিকাটির ফিচার বিভাগ। উৎকন্ঠায় কাটছে দিন। ওদিকে বাড়ি থেকে হাত খরচের টাকা পাঠানো বন্ধ। ভার্সিটিতে অন্য ডিপার্টমেন্টের ছেলেমেয়েদের নোট, অ্যাসাইনমেন্ট করে দিয়ে সামান্য কিছু টাকা পাই। মহাখালী থেকে বনানী , প্রতিদিন হেটে ক্লাস করি। দিনগুলো কেমন করে পার করেছি আমিই জানি। একদিন সাহস করে রিপা আপুকে বলেই ফেললাম- ‘আপু কাজ করতে চাই। অ্যাসাইনমেন্ট দেন।’ নভেম্বর ১৫, ২০১০ থেকে নিয়মিতই যাতায়াত শুরু করলাম। এমন সময়ই দেখা পেলাম পুরনো অফিসের বড় ভাই তানজীর মেহেদী ( কালের কণ্ঠের পড়ালেখা পাতার সহ- সম্পাদক)। তার মাধ্যমেই পরিচয় ওমর শাহেদের সাথে। তিনি বানাবেন আমার স্বপ্নের পাতা ক্যাম্পাস। এমনই এক অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে বসলেন, আত্মারাম ভয়ে খাঁচা ছাড়া। তারকাদের ক্যাম্পাস লাইফ – নতুন এই বিভাগটি দিয়ে শুরু হল নতুন যুদ্ধ। এ অ্যাসাইনমেন্টটি করতে গিয়ে আমি বিরাগভাজন হলাম আপুর। নারী পাতার অ্যাসাইনমেন্টগুলো একের পর এক ফেল করলাম। কপালে জুটল – মোস্ট ফেইলিউর পার্সন অব দ্য ওয়ার্ল্ড!

ক্যাম্পাস পাতাকেই আঁকড়ে ধরলাম। তারকা ক্যাম্পাস- এর শুরুটা তিশা ও সারিকাকে দিয়ে। ওদের ম্যানেজ করা তো চাট্টিখানি কথা নয়। তিশাকে ধরতে ছুটলাম ‘গর্ভধারিণী’র শুটিং স্পটে। একুশে টিভিতে তিন ঘন্টা অপেক্ষার পর সারিকা। তখন তো কিছুই লিখতে পারি না। কথার পিঠে কথা ছোড়ার অভ্যাস নেই আমার। কাকে কোন প্রশ্ন করব,সেটা তৈরি করতেই রাত ভোর হয় আমার।

এর মধ্যেই টেক প্রতিদিনে কাজ শুরু করলাম। ইশতিয়াক ভাই নিয়মিত অ্যাসাইনমেন্ট দিতে শুরু করলেন। ওদিকে আমার তারকা ক্যাম্পাস বিভাগটি নিয়ে বিনোদন বিভাগ উঠল খেপে। বিনোদন দুনিয়ায় নবীনদের সাথে আমার সখ্য। ও পাতার এক দাম্ভিক সাব এডিটর আমাকে তো প্রায়ই জেরা করেন। চারপাশে মানুষের বিরুপ মন্তব্য। ভাবলাম – এ সেগমেন্ট আমি করব না। তারকাদের মোবাইল নম্বর চাইতে গিয়ে কটু কথা শুনতে হয়।

ভেবেছিলাম প্রদায়কদের একটু সম্মান দিতে শিখবে কালের কন্ঠ। অফিসের স্টাফ না হয়েও পত্রিকার প্রসারে আমাদের অবদানের স্বীকৃতি মিলবে। অফিসটাকে বড় বেশি করে নিজের করে ভেবেছিলাম। মানুষগুলোকে খুব আপন করে ভাবতাম। কিন্তু প্রদায়কদের প্রতি অফিসের দৃষ্টিভঙ্গির কোন পরিবর্তন নেই। নতুন একটি পত্রিকার লেখক সম্মানি পেতে আমাদের লেগে গেল ছয় মাস। নভেম্বর .২০০৯ থেকে কাজ শুরু করলেও সম্মানি দিয়েছে জুন, ২০১০ এ। ডামি পাতার কোন বিলই পাই নি। আমার মতই সাংবাদিকতাকে প্যাশন করে লিখতে এসেছিল জনা ত্রিশেক তরুন- তরুনী। এদের অনেকেই আবার নিতান্তই পেটের দায়ে কলম ধরেছিল। কেউবা ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার। জানুয়ারির বিলের জন্য বারবার আমরা ধরনা দিয়েছিলাম আমার একাউন্টস সেকশনে। ‘দিব-দিচ্ছি’ করে আমাদের ছয় মাস ঘুরিয়েছে। অনেকেই এই বিলের আশা ছেড়ে অন‌্যত্র চলে গেছে। অনেক মেধাবী লেখক হারিয়ে গেছে। সাহিত্য পাতার অনেক লেখক অফিসে ফোন করে রীতিমত অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেন। কিন্তু ফিচার লেখাটা আমার ভালো লেগে গেল। রয়ে গেলাম কালের কণ্ঠেই।টাকা না পাই, কাজ তো শিখতে পারছি। এভাবে প্রায় তিন বছর হয়ে গেল। কিন্তু প্রদায়ক বা কন্ট্রিবিউটর বলে খোদ অফিসেই স্টাফ জার্নালিস্টদের নাক সিটকানো আমাদের সহ্য করতে হয়। অফিস স্টাফ না হয়েও আমাদের দায়িত্ব অনেক। সঠিক সংবাদ উপস্থাপনের দায়। কোন প্রশিক্ষন নেই আমাদের। নিজেরাই গড়ে তুলছি নিজেদের। অ্যাসাইনমেন্টে গিয়ে আইডি কার্ড না থাকার দরুন আমাদের অনেকেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। অনেক বলে-কয়ে আইডি কার্ড নিয়েছি। এইতো গেল, আমার হাউজের কথা। দেশসেরা পত্রিকা বলে মানেন প্রথম আলো-তে। সেখানকার চিত্রটা একটু ভিন্ন। সহ-সম্পাদক( পেইজ এডিটর) -এর সখ‌্যতা একটু অন‌্য পর্যায়ে থাকতে হবেই। একেবারেই নবীনকে গ্রাহ্য করার মানসিকতা তাদের নেই। তাই একদম হাত পাকিয়ে তবেই প্রথম আলো-তে লেখালেখি শুরু করতে হবে। সেই সঙ্গে উপরোক্ত গল্পের মত, তৈলমর্দনের বাড়তি যোগ্যতা থাকতেই হবে। একটু অপছন্দের কিছু হলেই আপনাকে ছুঁড়ে ফেলবে। মনে পড়ে, ২০০৭ এ আলপিন যখন বন্ধ হয়, তখন বলির পাঠা করেছে প্রদায়ক আরিফুর রহমানকে। তাকে জেলে পাঠানো হয়েছিল। নরওয়ে প্রবাসী আরিফ ভাই এখনও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। সুমন্ত আসলাম চাকরিচ‌্যুত হয়েছিলেন। কিন্তু আলপিন তো ফিচার সম্পাদক সুমনা শারমিন বা তার ডেপুটি বিশিষ্ট সাংবাদিক জাহিদ রেজা নূরের টেবিলে সম্পাদিত হয়। তাদের কোন দায় কী একেবারেই ছিল না। পুলিশি জেরায় তারা বেঁচে গেল খ্যাতি আর টাকার জোরে। দায়ের কোঁপ পড়েছে প্রদায়কের উপর। প্রথমেই এই ভুল ধরা পড়লে আরিফ ভাইকে আলপিনে না লিথতে দিলেই হত। অনেক বন্ধু প্রদায়ক (নাম না প্রকাশ শর্তে) জানিয়েছে, অ্যাসাইনমেন্টের ক্ষেত্রেও চলে গ্রুপিং। সমকাল, ইত্তেফাক, ভোরের কাগজ, যুগান্তর, জনকন্ঠের প্রদায়কদের অবস্থা আরও করুন। তাদের কারও আইডি কার্ড নেই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা কাজ করছেন। বছরের পর বছর বিল আটকে আছে। কিন্তু সাংবাদিকতা যখন প্যাশন, তখন শত কষ্ট সয়েও তারা লিখছেন অবিরাম। পাঠক তো জানেই না আমাদের কথা। আমাদের সম্পাদক বা মালিকপক্ষ আমাদের যন্ত্রনার কথা জানে না। পত্রিকার কাটতি বাড়াতে আমাদের শ্রম তার কানে পৌঁছে না। জানি, লেখাটা পড়েই আমার বাড়বাড়ন্ত, ইছড়ে পাঁকা বা বোকা হদ্দ বলেই গালি ছুঁড়বেন। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব টেলিভিশন বিটিভির এক জেষ্ঠ্য সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন- প্রদায়ক সাংবাদিকতা সাংবাদিকতার কোন ক্যাটাগরিতেই পড়ে না। আমাদের অগ্রজদের অনেকেই প্রদায়ক হিসেবেই ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। দীর্ঘদিন প্রদায়ক জীবন শেষে স্টাফ হয়েছেন। কিন্তু এই মানুষগুলো বেমালুম ভুলে গেছেন তাদের যন্ত্রনার কথা। সাংবাদিকদের নানা কাউন্সিল থাকলেও কন্ট্রিবিউটর কাউন্সিল বলে কিছু নেই। আমাদের দাবিগুলো ছন্নছাড়া ভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। সংঘবদ্ধ কোন আন্দোলনের কোন উদ‌্যোগ তো নেই , নেই সদিচ্ছা।

এ গল্পটা আমার একার নয়। এ গল্প দেশসেরা সব পত্রিকায় কাজ করা প্রদায়কদের। স্রেফ আত্মসম্মানের ভয়, নয়তো ওই পেপারের স্টাফ হবার নেশায় তারা বেমালুম চেপে যায় কথাগুলো।

প্রদায়কদের একটু সম্মান দিতে শিখুন। তাদের অবদানের স্বীকৃতি দিলে খুব তো ক্ষতি হয়ে যায় না।