ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

প্রিয় ভাইয়ের বিয়োগব্যথা মেনে নিতে পারেনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেধাবী ছাত্রী পাপিয়া ভট্টাচার্য। মেয়ের মানসিক দুরাবস্থায় বাবা-মাও মেয়েকে ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের নিজ ভূমে। একলা মেয়ে পাপিয়া মনের কষ্ট চেপে রেখে পাড়ি দিল দূর আকাশে। ২০ এপ্রিল দুপুরে ওয়ার্ড থেকে ফিরেই আত্মহত্যা করেন। ঝরে গেল আরেকটি মেধাবী মুখ। ক্যাম্পাসে আত্মহত্যার মিছিলে সামিল হল আরেকটি নাম।
দেশের আর্থ সামাজিক পরিবেশ, শিক্ষাজীবন ও অনার্স-মাস্টার্স শেষে চাকরির অভাব, পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা, ঠুনকো আবেগ ও ব্যক্তিজীবনে হতাশা, দুশ্চিন্তা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ আত্মঘাতী প্রবণতা জন্ম নিচ্ছে।আসুন আত্মহত্যার পরিসংখ্যান দেখি। বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল, পত্রিকা আর ব্লগ ঘেটে এ পরিসংখ্যান করেছি আমি। অগোচরে রয়ে গেছে অনেক জীবন যন্ত্রনা, মান-অভিমানের অনেক উপাখ্যান। পরিসংখ্যান বলছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রেম ঘটিত কারন আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে তরুণ- তরুণীদের। কথা বাড়াই না, চলুন নজর বুলাই পরিসংখ্যানে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সাল থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট নয়জন ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে ২০০৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সূর্যসেন হলের ছাত্র হুমায়ুন কবির হলের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। একই বছরের ২০ অক্টোবর রোকেয়া হলের ছাত্রী উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিল্পী রানী সরকার প্রেমঘটিত কারণে বিষপানে আত্মহত্যা করেন। ২০০৬ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্র আক্তার হোসেন ট্রেনে কাটা পড়ে আত্মহত্যা করেন। একই বছরের ২৮ জুলাই রোকেয়া হলের ছাত্রী সাজিদা আক্তার চাচাতো ভাইয়ের সাথে প্রেমঘটিত কারণে আত্মহত্যা করেন। ২০০৭ সালের ২৫ জুন গলায় রশি লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী জোহরা খাতুন প্রজ্ঞা। চারুকলা ইনস্টিটিউটের সাবেরা খাতুন পাপড়ি অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহনন করেন। ২০১২ এর ২৬ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ও ঢাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হাসান ইকবাল সজীব ট্রেন থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথের বিদ্যাগঞ্জ স্টেশনের কাছে তিনি ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়েন। সজীব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষের হলেও তিনি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছিলেন। দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষায় অংশগ্রহনের সুযোগ না পেয়ে ও ব্যক্তিগত নানা সমস্যায় মুষড়ে পড়েছিলেন বলে দলীয় নেতা কর্মীরা জানায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: আত্মহত্যার দিক থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ই এগিয়ে। নির্মম এক পরিসংখ্যানে আঁতকে উঠবেন যে কেউ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৫৯ বছরে আত্মহত্যার ঘটনা ছিল একেবারেই নগন্য। সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে অহরহ। পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ফলাফল বিপর্যয় সহ নানা কারনে আত্মহননের প্রবণতা বাড়ছে বলে জানালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা। ২০১০ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মার্চ মাসে মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে তিন জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন ও দুই জন আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস কেয়া নিজ কক্ষের ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী মির্জাপুর এলাকার নীলা ছাত্রীনিবাসে এ ঘটনা ঘটে। মতিহার থানা পুলিশ জানায় , কেয়ার কক্ষ থেকে উদ্ধার করা ডায়েরীতে কেয়া অর্থনীতি বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র প্রেমিক কিরনের সাথে অভিমানের কথা জানিয়ে গেছে। পছন্দের পাত্রের সাথে বিয়ে না দেওয়ায় হলের পুকুরে ঝাপিয়ে আত্মহত্যা করেছিল তাপসী রাবেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী মার্কেটিং বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্রী উম্মে হাবিবা মিমি। প্রেমঘটিত কারনে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী কবিতা রানী রায় চলতি বছরের গত ১০ মার্চ রাতে ঠাকুরগাঁও জেলার নিজ বাড়িতে বিষপান করে আত্মহত্যা করে। ২০১১ এর ৭ মার্চ সহপাঠীদের কাঁদিয়ে প্রেম ঘটিত কারণে বিষপানে আত্মহত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাহাকুল ইসলাম ওরফে সোহাগ।

২০১১ এর সেপ্টেম্বরের বিকালে নগরীর মেট্রোপলিটন কলেজের একাদশ শ্রেনীর ছাত্রী কানিজ ফাতিমা শুক্তি (১৮) কলেজে যাওয়ার রিকশা ভাড়ার টাকা না পেয়ে স্বামীর ওপর অভিমান করে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। ঘটনার মাত্র দেড় বছর আগে শুক্তি পরিবারের অমতে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন রাজশাহী কমার্স কলেজের দ্বাদশ শ্রেনীর ছাত্র সজলকে। কিছুদিন আগে ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজির বিবিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র আজমুল হুদা বিশাল (২১) গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। কারন, পারিবারিক অশান্তি। ২০১১ এর ৫ ফেব্রুয়ারি আমানুর রহমান ইলিয়াস নামের বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের মাস্টার্স পরীক্ষার্থী পারিবারিক দ্বন্দের জেরে আত্মহত্যা করে। গত বছরের ২৭ মার্চ আত্মহত্যা করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী নিশাত ফারহাত টুম্পা। লাশের পাশ থেকে উদ্ধার চিরকুটের বাবার প্রতি ক্ষোভ ঝেড়েছেন। ২০১১ এর ৭ মার্চ প্রেমঘটিত কারনে বিষপানে আত্মহত্যা করেন লোক প্রশাসন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাহাকুল ইসলাম সোহাগ। একই কারণে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থী কবিতা রানী রায় (২২) ঠাকুরগাঁয়ের ভাদুয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন। ১৯ মার্চ ক্যাম্পাসের রবীন্দ্র ভবনের ছাদে নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আশিকুর রহমান আশিক (২৪)। কিন্তু সর্বনাশের আগেই তার বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। বিষপান ও ফাঁস নয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মহত্যার আরেক কৌশল -ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়া। ২০০৮ সালে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম স্টেশন বাজার এলাকায় ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। ২০১০ সালের ২৩ জানুয়ারি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন ফার্মেসি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সামছাদ শারমিন অনু। খুলনা থেকে ছেড়ে আসা ওই ট্রেনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনের কাছে আসলে সে ট্রেনের নিচে ঝাপ দেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে তার পুরো শরীর ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়। একই বিভাগের শরীফুল ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটান মাস কয়েক পর।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: ৯ আগষ্ট, ২০১১ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ৩৫তম ব্যাচের মেধাবী ছাত্রী মারজিয়া জান্নাত সুমীর আত্মহত্যা আলোড়ন তুলে দেশ জুড়ে। জাহানারা ইমাম হলের ৩২৩ নম্বর কক্ষে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন সুমি। স্নাতকে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হওয়া সুমি ২ আগস্ট তাঁর স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষ হলেও তিনি হলে অবস্থান করছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায় , উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের মনিরুজ্জামান শিকদার সুমনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ এক বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সুমি তাঁদের বলেছিলেন, স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তাঁরা বিয়ে করবেন। এরপর তাঁদের মধ্যে ফোনে কথা হতো। মাস দুয়েক আগে সুমির আগের বিয়ে এবং স্বামী তাঁকে ডিভোর্স দিয়েছেন এমন তথ্য পাওয়ার পর থেকে সুমির বিষয়ে আর আগ্রহ দেখাননি তিনি। সুমির মৃত্যুর পর জানা যায়, ছাত্রাবস্থায়ও সুমন সহপাঠীর সঙ্গে চার বছরের সম্পর্ককে অস্বীকার করেন। চরিত্রহীন আখ্যা দিয়ে সুমনের বিচারের দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাস হয়েছিল উত্তাল। ৩১ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের মেধাবী ছাত্র মুরাদের মৃত্যুও উল্লেখযোগ্য। হতাশা বা টেনশন যাই হোক, কখনো সিগারেট হাতে নেয় নি। মন খারাপের মূহুর্তে চলে যেত হলের ছাদে। সবসময়ের প্রিয় সঙ্গী গিটার নিয়ে গাইত জেমসের এপিটাফ গানটা। ‘ আর মনে রেখো কেবল একজন ছিল,যে ভালোবাসত শুধু তোমাদের।’ মৃত্যুর আগের দিন বুক ফুলিয়ে বলেছিল আইবিএর এমবিএ- তে চান্স সে পাবেই। এক্সিম ব্যাংকের পরীক্ষাও দারুন হয়েছে তার। বলা নেই, কওয়া নেই ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করল মেধাবী মুরাদ। হলের ছাদের ট্যাংকি থেকে লাফিয়ে পড়ার সময় পাম গাছে লেগে উল্টে গিয়েছিল আর মাথাটা ইটের রাস্তায় পড়ে বীভৎস ভাবে থেতলে গিয়েছিল। আত্মহত্যার মোটিফ জানা যায়নি। প্রেমিক পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ছাত্র সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘদিন একসঙ্গে বসবাসের পর হঠাৎ অভিমানে আত্মহত্যা করেন বিতার্কিক ও অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রী ফারহা নাজ রুহী। সাভারের ব্যাংক কলোনীর সাখাওয়াতের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় রুহীর লাশ। রহস্য ঘনীভূত হয়, যখন বাবা ফেনী সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক আবদুল কাদের এজাহারে উল্লেখ করেন, রুহীকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। ২৫ শে জুলাই, ২০১০ সেশনজটে অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যা করেন প্রানীবিদ্য বিভাগের ছাত্র সোহান। তার লাশ মিলে টেকনাফের নাফ নদীর শাহপুরী দ্বীপে । বন্ধুদের কাছে বেড়াতে যাবার নাম করে আর ফিরে আসেন নি তিনি। সালাম বরকত হলের সোহানের কক্ষ থেকে তার নিজ হাতে লেখা একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। তাতে তিনি তার মৃত্যুর জন্য বিভাগের সেশনজটকে দায়ী করেন। এছাড়াও তার জন্মদিন ২৫ জুলাইকে মৃত্যু দিন হিসেবে লিখে গেছেন। এর আগে ২০১০ সালে প্রেমঘটিত কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন নওয়াব ফয়জুন্নেছা হলের আবাসিক ও অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রী ফারহানা রাহী।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি প্রথম বর্ষের ছাত্র সৌরদীপ ধ্রুব হাটহাজারীর চৌধুরীহাট এলাকার বণিকপাড়ায় শ্রীরামকৃষ্ণ মিশন ছাত্রাবাসে নিজ কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে রশিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজাহাল হলের ৩৩৩ নম্বও কক্ষের বাসিন্দা ফাইন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সোহাগ হাওলাদার। হল সূত্রে জানা যায়, মাইগ্রেনের ব্যথা সহ্য করতে না পেরে সে আত্মহত্যা করে। তবে মৃত্যুর আগে লিখে যাওয়া চিরকুটে কাউকেই দায়ী করে নি সে। সরল, সোজা সাপ্টা জীবনধারার সোহাগের মৃত্যুতে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে ক্যাম্পাস। গত বছরের অক্টোবরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের আজমির হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। ১৬ জুন আইন তৃতীয়বষের্র শিক্ষার্থী লোকমান আত্মহত্যা করেন। পরে জানা যায়, অসুস্থতার কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি তিনি। এরপর বিশেষভাবে পরীক্ষার আবেদন করেও অনুমতি পাননি। এ ঘটনায় হতাশ হয়েই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন লোকমান। ৪ জুলাই বন ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের এক শিক্ষার্থী এসিড পানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এরপর আগষ্টে আত্মহত্যা করেন অর্থনীতি প্রমবষের্র শিক্ষার্থী সৌরভ মজুমদার । এর আগে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে আত্মহত্যা করেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী জয় নারায়ণ দেবনাথ। ২০০৯ সালে আত্মহত্যা করেন সমাজতত্ত্ব চতুর্থবষের্র শিক্ষার্থী আবুল হাসনাত। ২০০৮ সালে লোক প্রশাসন চতুর্থ বষের্র শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম আত্মহত্যা করেন। একই বছর আত্মহত্যা করেন সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. অ্যান্ড্রু অলক দেওয়ারি।২০০৮-২০১১ এ তিন শিক্ষাবর্ষে এক শিক্ষক ও আরও তিন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এ মৃত্যুর প্রবণতা বাড়লেও ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শ কেন্দ্রটি বছরের পর বছর ধরে রয়েছে নিষ্ক্রিয়। ফি বছর বাজেট দেওয়া হলেও এর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় অভিযোগ উঠেছে বারবার। কেন্দ্রের পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে বারবার। লোকপ্রশাসন বিভাগের এক ছাত্র নাম না প্রকাশ শর্তে জানায় পরিচালক ছাত্র নির্দেশনার চেয়ে প্রক্টরের দায়িত্ব বেশি পালন করেন। কেন্দ্রের বেহাল অবস্থায় ভ্রুক্ষেপ নেই। এ দিকে চবি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ায় একদিকে শিক্ষার্থীরা যেমন উদ্বিগ্ন পাশাপাশি তাদের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। কাউন্সিলর নিয়োগ প্রক্রিয়াটি আটকে আছে অজানা কারণে। শিক্ষার্থীরা দাবি জানিয়েছে , তাদের সঙ্গে সহজেই মিশে যেতে পারেন এমন একজন মনোবিজ্ঞানীকেই কেন্দ্রের দায়িত্ব দিতে হবে।
শাহজাহাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়:শাবিপ্রবিতে গত ৪ বছরে ৪টি আত্মহত্যা ও প্রায় অর্ধশত আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এ বছরের জানুয়ারিতে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ৪র্থ বর্ষ ১ম সেমিস্টারের সৈকত আল ইমরান কক্ষে সিলিং ফ্যানের সাথে রশি পেঁচিয়ে আত্ম হত্যা করে। চাপা স্বভাবের সৈকত ভালোবাসত বগুড়ার এক মেয়েকে। সম্পর্কের অবনতি তাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। নোটে সৈকত লিখেছিল ‘ কি করতে যাচ্ছি, তা হয়ত আমি নিজে জানি না। তবে যা কিছু হচ্ছে তা নিজের ইচ্ছায়। করো প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। ” ইমরানের পথ ধরে একইভাবে আত্মহত্যা করেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়মা সুলতানা এ্যানী, ফাতেমা তানজিন ঝরনা ও শ্রী নিবারণ।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: প্রেমঘটিত কারণে ২০০৯ সালের ২৪ জানুয়ারি ব্রহ্মপুত্র নদে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) শেষ বর্ষের এক ছাত্রী।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়: বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী ফাতিহা রেহনুম শাওন (২০) কাশর এলাকার নিজ বাস ভবনে ফ্যানের সাথে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। স্বামীর পরকিয়া সম্পর্ক মেনে নিতে পারেন নি অর্থনীতির ৩য় বর্ষের ছাত্রী জাকিয়া তালায়াত সাবা। নিজ বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের ফাঁকি দিয়ে ফাঁস নেন। জাকিয়ার আত্মহত্যার প্রতিবাদে প্ররোচনাকারী স্বামী ডাক্তার সজীব আবেদীনের বিচারের দাবিতে ক্যাম্পাস ছিল উত্তাল।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়:হর্টিকালচার বিভাগের এম,এস দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী অরুনা বিশ্বাস জ্যোতি ২নং হোস্টেলের ২০১ নং কক্ষে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ২০০৯ এর ২৭ মার্চ এম কেরামত আলী হলের আবাসিক ছাত্র কৃষি অনুষদের হুমায়ূন কবির মাসুদ আত্মহত্যা করেন। পড়াশোনার চাপ সহ্য করতে না পেরে সে আত্মহত্যা করে বলে জানিয়েছিল সহপাঠীরা। তার মৃত্যুর পর অতিরিক্ত সিলেবাসের চাপে অতীষ্ঠ শিক্ষার্থীরা উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়: প্রেমিকের প্রতারণার আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার সাথী। খুলনা মহানগরীর বয়রা মুজগুন্নি মহাসড়কস্থ ৬৩৪ নম্বর নিজ বাড়িতে ফ্যানের সাথে গলায় ফাঁস দিয়ে সে আত্মহত্যা করে। পুলিশ, এলাকাবাসী ও নিহতের পারিবারিক সুত্র জানায়, অগ্রনী ব্যাংক বয়রা শাখার কর্মকর্তা সুফিয়া বেগমের একমাত্র কন্যা শারমিন আক্তার সাথী খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করাকালে একই বিভাগের ছাত্র জেমস-এর প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ হবার সাথে সাথে সাথী তার প্রেমিক জেমসকে বিয়ে করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। এ নিয়ে জেমস বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ এবং তাকে এড়িয়ে যাচ্ছিল। এ অবস্থায় রোববার বিশ্ববিদ্যালয় জেমসের সাথে তার কথা কাটাকাটি ও মনোমালিন্য হয়। এর জের ধরেই সাথী আত্মহননের পথ বেছে নেন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মহত্যা: চলতি বছরের আত্মহত্যা করেন ১৯ মার্চ শ্যামলীর আশা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর প্রথম বর্ষের ছাত্রী ফারজানা আক্তার। মালিবাগ রেলগেট এলাকায় খালার বাসার বাথরুমে শাওয়ারের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস নেন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালিত প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সামির সাকির চৌধুরী বিষপান (মরটিন লিকুইড) করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন। সামির বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগে সামিরসহ ১২ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সাক্ষ্যগ্রহণ কর্মসূচির দিনে সকাল থেকে নোটিশ পাওয়া ১২ জন শিক্ষার্থীকে জেরার কাজ শুরু হয়। প্রথমজনের সাক্ষ্য নেওয়ার পরই প্রক্টরিয়াল বডির সামনে হাজির হন সামির সাকির। এ সময় শিক্ষকরা সামিরকে দেড় ঘণ্টা বিভিন্ন বিষয়ে জেরা করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র এম মঞ্জুর আলমের ইন্ধন রয়েছে বলে অঙ্গীকার নামায় স্বাক্ষর করতে বলেন। কিন্তু সামির জবানবন্দি দিতে অস্বীকার করে প্রক্টরিয়াল বডির একজন শিক্ষককে উদ্দেশ করে চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘এই শিক্ষকের জন্যই আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক। আমার মৃত্যুর জন্য উনি দায়ী।’ এ কথা বলেই আগে থেকে হাতে রাখা বিষ পান করেন সামির। পরে তাঁকে গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সামিরের সহপাঠী নাজমুল হাসান নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সহকারী প্রক্টর মীর তরিকুল ইসলাম বর্তমান ডিন পরিবর্তন হওয়ার পর থেকে ২০১০ সালে আন্দোলনে জড়িত শিক্ষার্থীদের নানাভাবে হয়রানি এবং চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।’ শিক্ষার্থীদের এই অভিযোগ সত্য নয় দাবি করে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য অধ্যাপক আহমদ রাজীব চৌধুরী বলেন ‘সাক্ষ্য দিতে আসা দ্বিতীয় শিক্ষার্থী সামির সাকির যথারীতি আমাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে এবং অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষরও দিয়েছে। সাক্ষ্য শেষে কিছু দূর যাওয়ার পর পকেট থেকে কী একটা বের করে মুখে দেয়। কোনো শিক্ষক বা মেয়রের বিরুদ্ধে সামির সাকির কোনো কথা বলেনি এবং শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও চাপ দেওয়া হয়নি।’ এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেন বলেন, ‘প্রিমিয়ারে কোনো শিক্ষক রাজনীতি নেই। ছাত্রদের অভিযোগ ডাহা মিথ্যা।’ ২০১১ এর ৬ আগষ্ট আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির শেষ বর্ষের ছাত্রী আন্নি আক্তার লিসা পারিবারিক দ্বন্দের জের ধরে আত্মহত্যা করেন। এ বছরের ১১ মার্চ সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র রাসেল আত্মহত্যা করেন। রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি এলাকায় বাসার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েন। পরিবার সূত্রে জানা যায় প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রাসেলের মনোমালিন্যের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞ অভিমত: সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ দশমিক ৮ ভাগ ছাত্র-ছাত্রী কম বেশি মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। তারা আত্মহত্যার ঝুঁকিমুক্ত নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘আত্মহত্যা কখনোই জীবন প্রশ্নের শেষ উত্তর নয়’ শীর্ষক সেমিনারে মনোবিজ্ঞানীরা এসব তথ্য তুলে ধরে আত্মহত্যাকে ভয়ানক মানসিক রোগ হিসাবে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, ভয়ানক এই রোগ প্রতিরোধের মানসিকতা পরিবার থেকেই গড়ে তুলতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-নির্দেশনা ও পরামর্শ দান দফতর আয়োজিত এ সেমিনারে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিভা আত্মহননের কারণে ধ্বংস হয়। আত্মহত্যা হত্যারই নামান্তর। আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে মুক্ত থাকতে একাডেমিক পড়ালেখার পাশাপাশি বিতর্ক, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং সেন্টার চালুর কথা বলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক শামীম ফেরদৌস করিম বলেন, সমস্যা সমাধানের উপায় না পেয়ে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কয়েক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোতে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল। তখন হলগুলোতে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। এতে বেশ ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়। তখন সব হলে কাউন্সেলিং করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। কিন্তু সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। অনেক সময় মানুষ একাকি থাকতে পছন্দ করে। এক ধরনের অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার চিন্তা থেকে তারা আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যায়। ’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তরের সহকারী পরিচালক আশরাফুজ্জামান বাবুল বলেন, ‘কাউন্সেলিং বা পরামর্শভিত্তিক আলোচনা শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। তবে সমাজে হতাশার অনেক কারণ বিদ্যমান। এগুলো দূর করা সম্ভব হলে ও শিক্ষার্থীদের মানসিক উন্নয়নে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে আত্মহত্যার প্রবণতা কমে আসবে’। বর্তমান সময়ে আত্মহত্যা বৃদ্ধির পেছনে কারণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দফতরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ড. শাহীন ইসলাম বলেন, পারিপার্শ্বিক অবস্থার নানাবিধ চাপ বেড়ে যাওয়া, মূল্যবোধের অবক্ষয়, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি প্রভৃতি কারণে বর্তমানে আত্মহত্যার মতো ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, আত্মবিশ্বাস হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় জায়গা। একটি শিশু সামাজিক ও পারিবারিকভাবে বেড়ে ওঠার সময় যে পরিবেশ পায় সেই পরিবেশে যদি সেই শিশুটির আত্মমর্যাদা ঠিকভাবে বেড়ে না ওঠে, নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক একটি সঠিক ধারণা তৈরি না হয় তবে পরবর্তী সময়ে জীবনে চলার পথে বিভিন্ন সময়ে তার সামনে যে বাধাগুলো আসে সেসব বাধা সে আর তখন সামাল দিতে পারে না। তাই আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি থাকার কারণে এবং আত্মমর্যাদা ক্ষুন্ন হওয়ার ভয় কিংবা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার ভয়ের কারণে সেই ব্যক্তি তখন পারিপার্শ্বিক চাপ সহ্য করতে পারে না। মনের এমন একটি পর্যায়েই আত্মহত্যা করাকে সেই ব্যক্তি সমস্যা সমাধানের সহজ উপায় হিসেবে বেছে নেয়।

এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে এলাকা ভিত্তিতে কয়েকটি স্কুলকে একত্রিত করে একজন অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞানীর সাহায্যে ছেলেমেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলে অভিমত জানান ড. শাহীন ইসলাম। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধীন ‘এডুকেশন অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলোজি’ নামে একটি আলাদা বিভাগ চালু করা হয়েছে। যেখানে ছাত্রছাত্রীদের প্রশিক্ষণের দিকটি বিবেচনার সঙ্গে নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাবি মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবা কানিজ কেয়া বলেন, তিনি বলেন, প্রেমঘটিত কারণে বর্তমানে তরুন-তরুণীদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতার মাত্রা কমে গেছে। এছাড়া আর্থিক অনটন, মাদক সেবন, পারিবারিক কলহসহ নানা কারণে আত্মহত্যার পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি রোধ করতে সামাজিক এবং পারিবারিক সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কাউন্সেলিং সেবা চালু করা উচিত। রাবির একই বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য শামসুদ্দিন ইলিয়াস বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টা তার মানসিক অস্থিরতা বা আবেগতাড়িত হওয়ার ফল।” সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছাদেকুল আরেফিন বলেন ‘বাস্তবতার সাথে খুব বেশি পরিচিত নয় বলে তরুণ -তরুণীরা আবেগপ্রবন। পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব প্রকট।’ মেয়েদের আত্মহত্যার প্রবনতা বেশি হওয়ার কারণ সম্পর্কে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শওকত আরা বলেন ‘মেয়েরা নিজেদেরকে ছেলেদের চেয়ে অনেকটা দুর্বল ভাবে। এছাড়াও মেয়েদের আবেগ অনেক বেশি। তারা তাদের মানসিক সমস্যাগুলো নিজেদের মধ্যে চাপিয়ে রাখে অর্থাৎ বাইরে প্রকাশ করতে চায় না। ফলে মানসিক চাপ যখন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায় তখন তারা সেটা সহ্য করতে পারে না। এর ফলে তাদের প্রতিরক্ষা কৌশল ভেঙ্গে পরে এবং সমাধান হিসেবে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।’ চবি প্রো ভিসি ডঃ আলাউদ্দিন জানিয়েছেন ‘ শীঘ্রই ছাত্র নির্দেশনা কেন্দ্রটি চালু করা হবে’।

চাই সুস্থ, সুন্দর জীবন: আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরে আসা দুই তরুন রকিবুল ইসলাম রকি ও জেবুন্নেসা জীবন। প্রথমজন সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক শেষ করেছেন। দ্বিতীয়জন পড়ছেন ইডেন কলেজের মনোবিজ্ঞান দি¦তীয় বর্ষে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক ছাত্র ও দর্শন বিভাগের সম্মান শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী রকিবুল ইসলাম রকি। সিরাজগঞ্জের সৌম্যদর্শন ছেলেটি পড়াশোনার পাশাপাশি নাম লিখিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগে। স্কুল বেলাতেই ক্লাসমেটের সঙ্গে মন দেওয়া- নেওয়ার পর্ব সেরে নিয়েছিলেন। ৯ মার্চ, ২০১০ এর মধ্য রাত। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রকি। হঠাৎ করেই প্রিয় মানুষটি ফোনে জানাল- ‘ আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। পরিবারের সিদ্ধান্তের বাইরে আমি যেতে পারছি না। ক্ষমা করো।’ স্তম্ভিত রকি অস্থির হয়ে উঠেন। নাওয়া – খাওয়া ভুলে সারাবেলা প্রিয় মানুষের স্মৃতি নিয়ে হতাশায় ডুবে থাকেন। মানসিক বৈকল্য গ্রাস করলো তাকে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হল। রুমমেট, পরিবার-পরিজনের কাছে বিষয়টি বেমালুম চেপে গেলেন। পাছে অপবাদ বা অপমান জুটে ! কষ্ট ভোলার সহজ তরিকা -গাজা সেবন। দিনকয়েক যেতেই মেধাবী রকি হয়ে উঠলেন ‘গাঁজাখোর রকি।’ হলের রুমে একাই থাকত রকি। প্রতি রাতের মাতলামিতে অতিষ্ঠ বন্ধুরা কক্ষের দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করে। ভর্তি করা হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে রকি ফিরেছেন সুস্থ জীবনে। চিকিৎসার ব্যাপারে রকি জানালেন ‘ আমার নতুন জীবনের জন্য বাবা, মা ,শিক্ষক, বন্ধুবান্ধবের কাছে ঋণী। তবে এই সহযোগিতা যদি সংকটকালে পেতাম, তবে এই পাপের পথে আমাকে পা বাড়াতে হত না। আমার কাছে পরিবার, সমাজ ও দেশের অনেক আশা। আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি জীবনের কাছে হেরে যাই নি। আমি যুদ্ধ করবো, এ যুদ্ধ টিকে থাকার যুদ্ধ।’ রকি ফিরেছেন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে। জীবনযুদ্ধে জয়ী আরেক সৈনিক ইডেন কলেজের মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী জেবুন্নেসা জেবিন। দ্বিতীয় বর্ষের এই ছাত্রী মাত্র ৭ বছর বয়সেই দেখেছেন পরিবারের ভাঙন। মেয়ে সন্তান জন্মানোর অপরাধে মায়ের সঙ্গে নিত্যনৈমিত্তিক ঝগড়াকে বাবা রুপ দিলেন ডিভোর্সে। শিক্ষিতা মা নিজের ক্যারিয়ারের চিন্তায় ধনাঢ্য এক ব্যক্তিকে বিয়ে করে বসলেন। জেবিন রইল নানা বাড়িতে। পদে পদে অপমান, ক্ষোভ নিয়ে বেড়ে উঠতে লাগল জেবিন। উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে শহর ঢাকায় আসতেই দেখলেন জীবনের কত রুপ ! পরিবার থেকে অনেক দূরে চলে আসা জেবিনকেও গ্রাস করে অন্ধকার। ড্রাগ নিতে শুরু করে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়মিত হয় সে। ঠিক এমনই সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ কৌশলের ছাত্র অন্তরের সাথে পরিচয়। অন্তরের ভালোবাসা তাকে ফিরিয়েছে সুস্থ ও সুন্দর জীবনে। ধানমন্ডি লেকে দুজনের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল আগামী দিনের স্বপ্ন বুনছেন তারা। অনাগত ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের সাজানোর মিশনে নেমেছেন। স্বপ্ন দেখেন, একদিন পৃথিবীটা আলোয় আলোয় ভরে যাবে। জেবিনের চোখে তখন কেবল আনন্দ।