ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

১৯৬২ সাল। ২ আগষ্ট। যুগের চাহিদার প্রেক্ষিতে সাংবাদিকতা শিক্ষার প্রয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সাংবাদিকতা বিভাগ’ নামে একটি বিভাগ গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে এর নাম গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ।

শোভাযাত্রায় শিক্ষার্থীদের একাংশ >>>ছবি: রেজাউল করিম

হাঁটি হাঁটি পা পা করে বিভাগটি তার ৫০ বছর পার করলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার ইতিহাস আর বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার ইতিহাস একই সূত্রে গাঁথা।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষা এবং বিভাগের ৫০ বছর পূর্তিতে “স্বাধীন গণমাধ্যমই গণতন্ত্র” এই স্লোগান নিয়ে বৃহস্পতিবার নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপিত হলো। অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিলো শোভাযাত্রা, আলোচনা অনুষ্ঠান, পুরস্কার প্রদান এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিভাগের করিডোর, অফিস, সেমিনার কক্ষ আর টিএসসিকে সাজানো হয় বর্ণিল সাজে। তৈরি হয় আনন্দগণ উৎসবমুখর আবহ।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ৫০ বছর পূর্তিতে ঢাবি’র টিএসসি’তে শ্রদ্ধেয় শাওন্তী হায়দার ম্যাম এবং আমরা ক’জন

বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে সুবর্ণজয়ন্তীর শোভাযাত্রা শুরু হয়। শোভাযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ বিভাগের চেয়ারম্যান, শিক্ষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং বর্তমান শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। বেলা ১২টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে আয়োজন করা হয়ে বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান।

বিভাগের প্রভাষক সাইফুল হকের সঞ্চালনায় ও চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. আখতার সুলতানার সভাপতিত্বে বৃত্তি প্রদান করা হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিভাগেরই শিক্ষক ও ঢাবির উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

আরো উপস্থিত ছিলেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, বিভাগের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও বিভাগের অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত আলী খান, বিভাগের অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার দাস।

আরেফিন সিদ্দিক বলেন, “১৯৬২ সালে বিভাগটি প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে ৫০ বছরে উপনীত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ইতিহাস এবং বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার ইতিহাস এক ও অভিন্ন। এই বিভাগ শিক্ষার্থীদের সত্যনিষ্ঠ হতে শেখায়।”

সত্যের অন্বেষণ চালিয়ে যাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, “সত্যের আলোতে দেশকে আলোকিত করতে হবে।”

অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত আলী খান বলেন, “আমাদের এই বিভাগটি ১৯৬২ সালের ২ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ শুধু বাংলাদেশের প্রথম নয় এই উপমহাদেশে প্রথম। বর্তমানে সাংবাদিকতার যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দরকার আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।’’

উপাচার্য বলেন, “আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আমাদের এখানে এসে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি, সিলেবাস, রেফারেন্স বই ইত্যাদি দেখে তারাও বিভিন্ন সময়ে এটাকে বিশ্বমানের হিসাবেই মন্তব্য করেছেন।”

তিনি আরো বলেন, “বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা এবং সত্য অনুসন্ধানের মত ইস্যুগুলো সাংবাদিকতার আনুষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই এগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”

অনুষ্ঠানে বিএসএস (সম্মান) পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের স্বীকৃতিস্বরূপ মার্জিয়া হোসেনকে ‘নভেরা দীপিতা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণীতে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের স্বীকৃতিস্বরূপ জেনিনা ইসলামকে ‘তৌহিদুল আনোয়ার ও আলী হায়দার স্মৃতি বৃত্তি’ এবং ‘তাজিন স্মৃতি বৃত্তি’ প্রদান করা হয়।

এবার ইতিহাসের দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যাক। পূর্ব পাকিস্তান প্রেস কমিশনের সুপারিশ অনুসারে ১৯৬২ সালের ২ আগস্ট বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকতা শিক্ষা প্রদান শুরু হয়। আর ঐ সময়ের বিখ্যাত সাংবাদিক আতিকুজ্জামান খান বিভাগের প্রথম প্রধান নিযুক্ত হন। এক বছর মেয়াদি সান্ধ্যকালীন ডিপ্লোমা কোর্স চালু হয়। প্রথম ব্যাচে ১৬জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়।

১৯৬৮-৬৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে দুই বছরের মাস্টার্স কোর্স চালু হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরপর বিভাগের নাম হয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ডিপ্লোমা কোর্স যুগের অবসান হয়। চালু হয় তিন বছর মেয়াদি সম্মান এবং এক বছর মেয়াদি মাস্টার্স কোর্স। ১৯৯৭-৯৮ সালে বিভাগটি কলা অনুষদ থেকে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে স্থানান্তর করা হয়।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এ বিভাগটি আরো কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হবে এমন আশা আমরা করতেই পারি। নেতা জন্মগ্রহণ করে না, তৈরি হয়। শিক্ষাদানের মাধ্যমে বিভাগটি সাংবাদিক গোষ্ঠী তৈরি করছে। সাংবাদিকতার মান উন্নয়নে নানা গবেষণাকার্যও পরিচালনা করে আসছে বিভাগটি।

‘হলুদ সাংবাদিকতা’, ‘তেলবাজি সাংবাদিকতা’, সাংবাদিকতার ‘রাজনৈতিক মেরুকরণ’ বন্ধ হোক। সত্যিকার অর্থে গণমাধ্যম জনগণের জন্য কাজ করবে আমরা এই প্রত্যাশা করতেই পারি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাত ধরে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার মান উন্নয়ন হোক এই কামনা রইল।