ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

বাংলদেশের পার্বত্য অঞ্চল বসবাসকারী চাকমা, মারমা, মুরং, ত্রিপুরা, লুসাই, তঞ্চল্যা ও পাঙ্খু এবং সমতলের সাওতাল, মাহাতো, মাহালী, ওঁরাও, কোচ, বর্মন, ভীল, গারো, হাজং প্রভৃতি নৃগোষ্ঠীকে কেউ আদিবাসী বলছে, কেই বলছে উপজাতি, আবার কেউ বলছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। যে যেভাবেই ডাকুক না কেনো সেখানেই রয়েছে রাজনীতি। জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক যে রাজনীতিই হোক না কেনো, এই রাজনীতিই তাদের আদিবাসী বানিয়েছে, কিংবা উপজাতি বানিয়েছে। ‘সংখ্যায়’ কম বলে ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠী হিসেবে প্রচার করাকে সমীচিন মনে করছি না।

ব্লগপাড়া বেশ সরগরম হয়ে ওঠেছে ব্লগারদের প্রানবন্ত বিতর্কে! আবার অনেকে অহেতুক তর্কেও জড়িয়ে যাচ্ছেন। আমি অবশ্য অন্যসব ব্লগারদের মতো তথ্য কিংবা যুক্তি দিয়ে প্রমাণের দিকে যেতে পারছি না। কারণটা বলে দিচ্ছি জানা-শোনার অভাব। তারপরও লিখছি ব্লগসহ দেশের নানা স্থানে বর্তমানের বিতর্ক দেখে-শোনে।

বিষয়টি নিয়ে যেনো বিভক্ত দেশ জনতা। আমি বিভক্তিতে যেতে চাচ্ছি না। অনেকে বলছেন, তারা যদি আদিবাসী হন আমরা কারা? আমরা কী পরবাসী? আবার তাদেরকে উপজাতি বলা হলে ছোট করা হয় বলে মনে করি। তারা তো জাতিই। চাকমা জাতি, মারমা জাতি, গারো জাতি প্রভৃতি যেমনটি আমরা বলি বাঙ্গালী জাতি।

মূলত তিনটি কারণে আমি আজকের এ লেখাটির অবতাড়না করছি।

১.সাম্প্রতিক সময়ে এবং বহুকাল আগে থেকে চলে আসা আদিবাসী/উপজাতি/ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী দেশজুড়ে বিতর্ক এবং ব্লগ পাড়ায় এ নিয়ে জম্পেস্ট তর্ক-বিতর্ক

২.আগষ্ট ০৯ বিশ্ব আদিবাসী দিবস হওয়ায় এ নিয়ে বিতর্কটা একট বোধ করি বেশিই হচ্ছে। দিবসকেন্দ্রিক আলোচনাও অন্যতাম কারণ হিসেবে বিবেচনা করছি এবং

৩.বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আদিবাসী/উপজাতি কেন্দ্রিক বিতর্কের লিফলেট বিতরণ।

ক্যাম্পাসে দেখলাম “বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করার চক্রান্ত রুখে দিন” শিরোনামের একটি লিফলেট বিলি হচ্ছে। হুবহু তা তুলে ধরছি।
………………………………………………………………………………………………………………….
আদিবাসী না উপজাতি

আদিবাসী কারা? বাংলাদেশে আদিবাসী আছে কি?
আক্ষরিক অর্থে ও আভিধানিক সংজ্ঞানুসারে কোন দেশ বা স্থানের আদিম অধিবাসী বা অতি প্রাচীনকাল থেকে বসবাসরত জনগোষ্ঠীই ঐ অঞ্চলের আদিবাসী (Indigenous)। সেই অর্থে বাংলাদেশের ভূ-খন্ডে বিভিন্ন সময়ে আগত অন্যান্য নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অধিবাসী বটে, আদিবাসী নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে শত বছর পূর্বেও বাঙ্গালী ছিলো। সেখানে আশেপাশের দেশ থেকে আগত নৃ-গোষ্ঠীর জনগন (Ethnic Group) আজ এ দেশের নাগরিক। কিন্তু তাদের আদিবাসী বলা হবে কেনো? এ বিষয়ে যে সকল আন্তর্জাতিক দলিলের কথা বলা হচ্ছে সেগুলো আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার উপনিবেশিকতার যাঁতাকলে পিষ্ঠ রেড ইন্ডিয়ান ও এ্যাবোরোজিনদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে; যারা এখনও পর্যন্ত নিজেদের ভূমি ও অন্যান্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।

শান্তিপ্রিয় দেশবাসী ভেবেছেন কি?
১.যারা মাত্র কয়েকশ বছর আগে এই ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে তারার কি করে সহস্র বছরের প্রাচীন বাঙ্গালী অধ্যুষিত অঞ্চলে আদিবাসী হয়? তারা আদিবাসী হলে বাঙালীরা কি নিজ ভূমে পরবাসী?

২.হঠাৎ এই দাবী কেন? পাহাড়ের সরলমনা জনগোষ্ঠীর মনে কে বুনেছে এই বীজ?

৩.দেশের প্রচলিত আইন কি পারে না এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ করতে? তারা তো ভিনদেশী নয়, এদেশেরই গর্বিত নাগরিক।

৪.পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ‘আদিবাসী’ পরিচয় বা স্বীকৃতি কেন দরকার? কেন এজন্য আন্তর্জাতিক আইনের শরণাপন্ন হতে হবে?

৫.ক্ষুদ্র এই নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ নং ধারা কি যথেষ্ট নয়? যেখানে বলা হয়েছে যে, ‘জনগণের যে কোনো অনগ্রসর অংশকে অগ্রসর করার নিমিত্তে, সুবিধা দেবার নিমিত্তে রাষ্ট্র যে কোনো প্রকারের বন্দোবস্ত নিতে পারবে এবং সংবিধানের অন্য কোন ধারা সেটাকে বাধা দেবে না’।

আইএলও কনভেনশন ১০৭ এ কি আছে?
১৯৫৭ সালের এ কনভেনশন ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়। ঐ দলিলের মূল প্রতিপাদ্য ছিলোঃ

উপজাতি জনগোষ্ঠীকে মূলধারার সমকক্ষ হতে সহায়তা করা হবে।

তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে রাষ্ট্র কর্তৃক সহায়তা করা।

এ ক্ষেত্রে কোন ধরণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যাবে না।

ভূমির উপর তাদের ঐতিহ্যগতভাবে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে, যা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।

রাষ্ট্র নিরাপত্তা বা আর্থ- সামাজিক উন্নয়নে জমি ব্যবহার করতে পারবে, তবে এক্ষেত্রে তাদের স্বাধীন মতামত গ্রহণ এবং যথাযথ পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

উপজাতি জনগোষ্ঠী দেশের প্রচলিত ধারায় বিচারযোগ্য হবেন।

আইএলও কনভেনশন ১৬৯ এ কি আছে?
১৯৮৯ সালের এ কনভেনশনের মূল বক্তব্য হলোঃ

উপজাতি জনগোষ্ঠী চিরস্থায়ী এবং সবচেয়ে পুরানো জনগোষ্ঠী এই ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত।

সর্বক্ষেত্রে তারা আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হবে এবং রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করবে।

তাদের আত্ম পরিচয় নিরূপণের ক্ষেত্রে তারা মূল জাতিগোষ্ঠী থেকে ভিন্নতর, নিজস্ব সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং আর্থ-সামাজিক মানদন্ডে বিবেচিত হবে।

ঐতিহ্যগতভাবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মালিকানার পাশাপাশি তাদের জীবনধারণ ও বিবিধ কর্মকান্ডের জন্য ব্যবহৃত জমির উপর উপজাতীয়দের নিরঙ্কুশ অধিকার এবং দখল রাষ্ট্র কর্তৃক সংরক্ষণ করা হবে।

এখানে খাস জমি থাকবে না, এমনকি প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে তাদের মতামত প্রাধাণ্য পাবে।

এই জনগোষ্ঠীর বাইরের কেউ এখানকার জমির মালিক হতে পারবে না, যা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।

কারা অন্তরীণ ব্যতীত তাদের প্রচলিত ধারায় শাস্তি প্রদানকে প্রাধান্য দিতে হবে।

কনভেনশন ১৬৯ এর প্রস্তাবনাসমূহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে বহুলাংশে খর্ব করে এবং বিভিন্ন বিষয়ে আইনি জটিলতার অবতারণা করতে পারে বিধায় সংগত কারণেই বাংলাদেশ সরকার ঐ কনভেনশন অনুমোদন করা থেকে বিরত থাকে

জাতিসংঘের ঘোষণা ২০০৭ এ কি আছে?

আদিবাসীদের আত্ম নিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং আভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে স্বায়ত্তশাসন।

ভূমি ও অঞ্চলের উপর অধিকার।

নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও তা নিয়ন্ত্রণের অধিকার।

আদিবাসীদের অনুমতি ব্যতিরেকে বা যৌক্তিক না হলে ঐ অঞ্চলে সামরিক কার্যক্রম পরিহার।

জাতিসংঘ বা আন্তরাষ্ট্রীয় সংস্থা কর্তৃক এই অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ প্রয়োগের নিমিত্তে জনমত গঠন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বা কারিগরী সহায়তা প্রদান।

আদিবাসী বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধান কি বলে?

অনুচ্ছেদ ২৩ (ক): রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।

উল্লেখ্য সংবিধানের কোথাও আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণকে আদিবাসী স্বীকৃতি দিলে কি হবে?

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখায় চিহ্নিত একটি এলাকায় আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দিতে হবে।

সেক্ষেত্রে ঐ ভৌগোলিক সীমারেখায় চিহ্নিত রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন কানুন, সংবিধান, প্রশাসনযন্ত্র, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা বিপন্ন হবে।

এমনকি ঐ এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ, বনাঞ্চল, নদ-নদী, জলাদার বা জন সমষ্টির উপর দেশের সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

দেশপ্রেমিক জনগণ একবার ভেবে দেখুন!!!

দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য এর চেয়ে বড় হুমকী আর কি হতে পারে? তাছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর স্বকীয়তা রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য দেশের আপামর জনগণকে বঞ্চিত করা সমীচিন হবে কী?

যদি পার্বত্য চট্টগ্রাম কিংবা ময়মনসিংহের গারো পাহাড় অথবা সিলেটের বিভিন্ন স্থান দেশের অন্যান্য জেলার আপামর জনসাধারণের জন্য রূদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে কি বাঙালী অধ্যুষিত সমতলের সমুদয় এলাকা থেকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণকেও বিতারিত করা হবে? এ দেশে গারো, সাঁওতাল, চাকমা কিংবা বাঙালী সকলের অধিকার কি সমান নয়?

ভারত পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ। সে দেশেও রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত এবং বাংলাদেশে একই গোত্রভুক্ত উপজাতির বসবাস রয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা কিংবা বিদেশী এনজিও-রা কেন বাংলাদেশের উপজাতিদের বিশেষ মর্যাদা প্রদানে আগ্রহী তা স্পষ্ট নয়।

পরিণতি

প্রকৃতপক্ষে, পার্বত্যাঞ্চলে অবস্থানরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির পরিণতি দেশের জন্য ভয়াবহ হবে। পাহাড়ী নেতারা তা ভালো করেই জানেন। অথচ সাধারণ পাহাড়ীদের সরলতা ও অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে এবং বিদেশী দোসরদের মদদে পার্বত্যাঞ্চালের কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল ও অর্থলোলুপ ব্যক্তির মদদে এ বিষয়ে যারা ইন্ধন যোগাচ্ছেন তারা সাবধান! নয়তো আপনি না হলেও আগামী প্রজন্ম দেখবে তিমুর কিংবা সুদানের মতো বিভক্ত একটি দেশ। এ দেশের দেশপ্রেমিক জনগণ কখনোই তা মেনে নেবে না, বরং এই সকল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
………………………………………………………………………………………………………………..

“বাংলাদেশের নাগরিক ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সমূহকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে কেন উপস্থাপন করা হচ্ছে? কারা তা করছে এবং কোন উদ্দেশ্যে?” -এই শিরোনামে বিডিনিউজ২৪ডটকম’এর ব্লগের দিকে দৃষ্টি দিলে কিছু তথ্য ও প্রাণবন্ত বিতর্ক পাবেন। আমি আর সেদিকে যাচ্ছি না।

“তারা কি আদপে আদিবাসী?” শিরোনামের ব্লগটিও আপনি দেখতে পারে। আরো নানা লেখা রয়েছে। কিন্তু সব তো আর সংযুক্ত করা সম্ভব নয়।

‘নাম’ নিয়ে টানাটানির এতো দরকার? দরকার আছে। আমার আপনার না হোক ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীসমূহের নিশ্চয় রয়েছে। আবার এটাও ঠিক সংখ্যালঘুরা বরাবরই বঞ্চিত হয়। সেদিকে অবশ্য সরকার নজর দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সেদিকে আমরা নজরদারি করতে পারি।

বিতর্ক চলুক। তবে তা যেনো সংঘাতে রূপ না নেই। আমরা কি পারি না? উপজাতি কিংবা আদিবাসী নয়, সবাইকে সমান চোখে দেখতে। সবার ক্ষেত্রেই জাতি শব্দটি প্রযুক্ত হলে দোষ কোথায়?