ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

থ্রিজি কানেকশন নিয়ে আলোচনা চলছে বহু দিন ধরে। গুঞ্জনও কম নয়। চলতি বছরের মার্চ মাসে বেশ রাখডাক শোনা গিয়েছিল। সে মাত্রার প্রস্তুতি না থাকায় বারবার পিছিয়ে। অবশেষে টেলিটকই থ্রিজি চালু করার দায়িত্ব কাঁদে নিয়েছে। কচ্ছপগতির ইন্টারনেট সেবা থ্রিজি সেবার ক্ষেত্রে বড় মাত্রার বাধা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে হচ্ছে। যেহেতু দায়িত্বটা নিয়েছে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্ক টেলিটক। দেশপ্রেমিক জনতা লাইনে দাড়িয়ে ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে হাতে নিয়েছিলো ‘টেলিটক’।

টেলিটকের লোগো


কিন্তু জন্ম থেকেই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত হয় নানা বিতর্ক। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা, নেটওয়ার্ক দুর্বলতা সব কিছু মিলিয়ে গতিহারা হয় টেলিটক। এতো কষ্ট করে কেনা ‘স্বাদের’ টেলিটক সিমটিকে রেখে দিতে হয়েছে ‘মাচাঙে’।

টেলিটকসহ অন্যান্য নেটওয়ার্কগুলোর দৈন্যদশা বিরাজ করছে। বিটিআরসির থ্রিজি লাইসেন্স গাইডলাইন সঠিক সময়ে তৈরি করতে না পারায় সমস্যার জট বেড়েছে বৈকি! তার উপরে বড় বিষয় হয়ে দাড়িয়ে লেনদেনের মারপ্যাঁচ।


থ্রিজি প্রযুক্তি চালানোর জন্য সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের ২.১ জিএইচজেড গতি সম্পন্ন ১০ এমএইচজেড ব্যান্ড অনুমোদন দেবে সরকার। প্রতি এমএইচজেড ব্যান্ডের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। মোট মিলিয়ে ১০ এমএইচজেডের জন্য প্রত্যেক অপারেটরকে গুনতে হবে ১৫০০ কোটি টাকা। এদিকে টুজি সার্ভিসের নবায়নে মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে গিয়ে বেশ অর্থসঙ্কটে পড়েছে দেশের মোবাইল অপারেটরগুলো।

গত ৭ মাস ধরে দফায় দফায় সময় বাড়ানোর তদবির চলছে বিটিআরসির সঙ্গে। সর্বশেষ বাজেটে এ খাতে নতুন নতুন শর্ত তাদের চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। এই শোচনীয় অবস্থার মাঝে বিরাট অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে থ্রিজি প্রযুক্তি নিয়ে মাঠে নামাটা অপারেটরগুলোর জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ ছাড়া আর কিছু নয়। তাছাড়া বাংলাদেশে থ্রিজি চালুর ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হচ্ছে ইন্টারনেট সংযোগ। কচ্ছপগতির ইন্টারনেটে থ্রিজির মূল সুবিধাগুলো গ্রাহকরা পাবেন কিনা সেটাও একটা প্রশ্ন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অপারেটরগুলো থ্রিজি সংযোগের জন্য এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। শেষে তাই দায়িত্ব গিয়ে পড়েছে টেলিটকের কাঁধে। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এ কোম্পানির জন্য বাড়তি কোন অর্থ লাগছে না।

মুঠোফোনে একটি একটি ক্ষুদে বার্তা পেলাম যে টেলিটক নিয়ে আসছে থ্রিজি। উচ্ছ্বসিত হলাম। আরো উচ্ছ্বসিত হলাম ফ্রি পাবো এই ভেবে!! ক্ষুদে বার্তাটা দেখুনঃ As a Loyal subscriber, Teletalk is commited to give you 3G SIM first and free! join GRAVITY CLUB। for details, visit www.teletalk.com.bd

উচ্ছ্বসিত না হবার কোনো কারণ থাকতে পারে?- আপনিই বলুন। এবার ভিজিট করলাম টেলিটকের সাইটে। মাথায় হাত দেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। আবারও বিশাল সময় নিয়ে টানাটানির রশি’র গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে!! টেলিটক ব্যবহার করেছেন বা এখনো করছেন এমন গ্রাহকদের যারা পূর্ব ভোগান্তির স্বীকার হয়েছেন তাদের ক’জনবা লাইনে দাঁড়ান তাও দেখার বিষয়। আবার না এটা বিস্ময় হয়ে দাঁড়ায়!! রাখডাক বলে কথা।

প্রচারণা এবার বেশ জোরেশোরেই উঠেছে। জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র টেলিটকের ৩ লাখ গ্রাহককে দেয়া হচ্ছে হবে সুবিধা। আপনি হয়তো ভাবছেন বেশ সহজেই পেয়ে যাবেন থ্রিজি। আপনার সরল ভাবনায় গুড়ে বালি।

এবার চলুন গ্রাভিটি ক্লাবের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করে থ্রিজি পাওয়া প্রসঙ্গে। দেখুন টেলিটকের সাইটে গ্রাভিটি ক্লাবে সদস্য হতে টেলিটকের বিজ্ঞাপনটি।

কী বুঝলেন আপনি? সহজ বিষয়- ভোগান্তিটা বুঝা যাচ্ছে প্রারম্ভেই...

থ্রিজি সুবিধা দেয়ার জন্য যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে তা সহজ নয়। টেলিটকের থ্রিজি নেটওয়ার্ক পেতে একজন গ্রাহককে ৫০০ টাকা খরচ করে ‘গ্রাভিটি’ ক্লাবের সদস্য হতে হবে। পরবর্তীতে আরও ৩ মাস যাবত টেনে যেতে হবে এ ঘানি। তাতেও না হয় সমস্যা নেই ধরে নিলাম। কিন্তু এখানেই যে শেষ নয়। আপনি যে এতো টাকা খরচ করলেন থ্রিজি পেতে তাতেও কিন্তু আপনি নিশ্চিত নন আপনি থ্রিজি পাবেন কিনা। বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, রিচার্জকারীদের ২ মাস পর থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে থ্রিজি সংযোগ প্রদান করা হবে। ২০০০ টাকা খরচ করার পরও কোনো কঠিন শর্ত জুড়ে দেয়া হলো তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছেই।

প্যাঁচানো এ পদ্ধতি আরও সহজ করা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই জনগণের হাতে থ্রিজি পৌছে দেবার। বিষয়টি বিটিআরসি এবং টেলিটক কর্তৃপক্ষের আমলে নেয়া উচিত। কোন ধরনের হ্যান্ডসেটে এ প্রযুক্তি সাপোর্ট করবে তাও অনেকেরই জানা নাই। এ বিষয়গুলোও স্পষ্ট করা জরুরী। একটি সঙ্গে থ্রিজির আওতায় বাংলাদেশে কোন কোন সুবিধা গ্রাহক পাবেন সে সম্পর্কেও জানানো জরুরী।

২০০৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে টেলিটক। ২০০৫ সালে আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। আমি দেখেছি টেলিটকের জন্য দীর্ঘ লাইন। ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাড়িয়ে ধরে এ সংযোগ কিনতে হয়েছিল গ্রাহকদের। তারপর সবই গুড়েবালি। তারপর আর খুঁজেই পাওয়া যায়নি টেলিটককে। গ্রাহকরা পড়লেন চরম ভোগান্তিতে। এই কি ছিলো ভালোবাসা প্রতিদান?!! বলতে পারে অন্য সব অপারেটরদের চেয়ে বরাবরই বেশ পিছিয়ে আছে টেলিটক। সুবিধা দেবার বেলা কচু।সবাই ব্যস্ত নিজেদের আখের গোছানোর জন্য। আবারও বলছি টেলিটক নেটওয়ার্কের ক্ষমতা নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে। প্রশ্ন আছে টেলিটকে কর্মরত চাকরিজীবীদের আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে কতটুকু আগাতে পারবে।

আমরা খুশি এই জন্য যে থ্রিজি আসছে। আসছে টেলিটকের হাতে ধরে। এটা আমাদের জন্য বিরাট আনন্দের উপলক্ষ্।

কী
থ্রিজি মূলত তৃতীয় প্রজন্মের নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যবহৃত ২জি বা ২.৫জি এর চেয়ে থ্রিজি আরও অনেক উন্নত। রয়েছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা। একজন ইউজার এ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে উপভোগ করতে পারবেন ভিডিও কল, ব্রডব্যান্ড কানেকশন, মোবাইল টিভি, টেলিমেডিসিন আর জিপিএসের মাধ্যমে অবস্থান শনাক্তকরণ ছাড়া আরও অনেক আধুনিক সুবিধা। এ প্রযুক্তিতে ডাটা ট্রান্সমিশনের গতিও অনেক বেশি, ডাউনলিংকে এর গতি ১৪.৪ এমবিআইটি/এস এবং আপলিংকে ৫.৪ এমবিআইটি/এস, যেটা আমাদের প্রচলিত নেটওয়ার্কের তুলনায় অবিশ্বাস্যই বলা যায়। থ্রিজি নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত ইন্টানেটের গতিও অনেক বেশি, ৩ এমবিপিএসের উপরে। এ গতিতে ৩ মিনিটের একটি অডিও গান ডাউনলোড করতে সময় লাগবে মাত্র ১৫ সেকেন্ড। এক্ষেত্রে টুজির সঙ্গে তুলনা টানলে বোঝা অনেক সহজ হবে। টুজি নেটওয়ার্কে ইন্টারনেটের গতি ১৪৪ কেবিপিএস, অর্থাৎ ৩ মিনিটের ঐ গানটি এখানে ডাউনলোড করতে সময় লাগবে প্রায় ৮ মিনিট। মোটকথা থ্রিজির মাধ্যমে যে কেউ তার মোবাইলটাকে মিনি ল্যাপটপে পরিণত করতে পারবেন। কথা বলা আর ভিডিও কনফারেন্স থেকে শুরু করে ইন্টারনেট ব্যবহার সবই হবে দ্রুতগতির নেটওয়ার্কে। তবে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্য আপনার থাকতে হবে থ্রিজি সাপোর্ট করে এমন ধরনের মোবাইল সেট। (১১ আগষ্ট ২০১২, দৈনিক জনকণ্ঠ)

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অপারেটর টেলিটক যে অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার খুব সামান্যই পেয়েছে জনতা। ভোগান্তির শেষ নেই টেলিটক গ্রাহকদের। নেটওয়ার্ক বেশ দুর্বল। থ্রিজি প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক দরকার, তা কি আদৌ বাংলাদেশে আছে কিনা তা নিয়েও চলছে বিস্তর আলোচনা। টেলিটক অপারেটরদের নাগরিক বিড়ম্বনা চরমে। যে আশা প্রত্যাশা ছিলো টেলিটককে ঘিরে তার ছিঁটেফোটাও আমরা পেয়েছি। আর বিড়ম্বনা দেখতে চায় জাতি, সইতে চাইনা!! ইন্টারনেটের স্পিড না বাড়লে, টেলিটকের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না কমলে, দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা না করলে নাগরিক বিড়ম্বনা সৃষ্টি হবে। জনতার প্রত্যাশা ঘনিভূত হল আর তার কোনো প্রাপ্তি হলো না…আর তা হলে তার প্রভাব পড়বে আগামী নির্বাচনেও। এ বিষয়টা মাথায় রাখার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ রইল।

আমরা আশা করবো সত্যিকার অর্থেই সরকার টেলিটককে শক্তিশালী করতে কাজ করবে। আর কতো জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলবেন। এবার দেশের জন্য কিছু করুন। সাধারণ জনতা চায় দেশের সিম ব্যবহার করতে। আপনাদের কারণেই জনতা সেটা পারছে না। ’আমাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য’!! ’এই আমরাই তো বড় হইয়া আপনাদের আসনে বসবো!!!!!’ কতো সহ্য করবে টেলিটকের ভোগান্তি। আপনাদের নিম্ন মানসিকতাই এটার জন্য দায়ী। যে সুন্দর উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটা ছড়িয়ে দেবার জন্য নিয়মনীতি সহজ করুন।