ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

স্বনামধন্য বহুল প্রচারিত ও সর্বাপেক্ষা বিশ্বাসযোগ্য(!) পত্রিকাটি এতো বড়ো ভুল করতে পারে, ভাবতে পারি না। দেশসেরা প্রতিবেদকরা কাজ করেন এ মিডিয়া হাউজটিতে। ‘এজেণ্ডা’ ভিত্তিক এ পত্রিকাটি ‘হেজিমনি’কে আরো শক্তিশালী করার জন্য নানান সমাজ উন্নয়ন ধর্মী কাজ করে যাচ্ছে। স্বার্থ যাই হোক বা যারই হোক প্রথম আলো কাজ তো কিছু করছে।

আমি হলফ করে বলতে পারে, পাঠক জরিপে ১ নম্বর অবস্থানেই থাকবে পত্রিকাটি। ফলে প্রথম আলোর কাছে পাঠকের প্রত্যাশার পারদটা একটু বেশিই। প্রথম আলোর দাবি অনুযায়ী প্রতিদিন প্রথম আলো পড়ে ৬০ লাখ পাঠক। যদি তাই হয়, বলতে হবে রোববারে বিশেষ প্রতিবেদনে প্রথম আলো তার বিরাট সংখ্যক পাঠককে বিভ্রান্ত করেছে, ভূল বার্তা দিয়েছে।

‘অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না’ শিরোনামে (৩০ সেপ্টেম্বর, রোববার) যে বিশেষ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এবং মোট জাতীয় উৎপাদন (জিএনপি)- এ দুটি প্রত্যয়ের মধ্যে তালগোল পাকানো হয়েছে।

চলুন, বিশেষ প্রতিবেদনটির সূচনা অংশটি বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। বলা হয়েছে,

মোট জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি), বিনিয়োগ, রপ্তানি ও মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। অন্যদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন সমস্যা গুরুতর হয়ে দেখা দিয়েছে।

মোট জাতীয় উৎপাদন লিখে বন্ধনীতে লেখা হয়েছে ‘জিডিপি’।

পরক্ষণেই বলা হয়েছে,

দেশের অর্থনীতি নিয়ে এই মূল্যায়ন সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের।

প্রতিবেদনে কী পরিকল্পনা কমিশন মোট জাতীয় উৎপাদন হিসেবে জিডিপি’র কথা বলেছে। ধরে নিচ্ছি, সরকারের পরিকল্পনা কমিশন ভুল করলো। তাহলে গণমাধ্যম কী ভুলটা করবে? নিশ্চয় নয়। পরিকল্পনা কমিশন ভুল করে থাকলে তা প্রকাশ করাও গণমাধ্যমের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। গণমাধ্যম সে দায়িত্ব এড়াতে পারে?

মোট জাতীয় উৎপাদন মানে যে জিডিপি নয় এটা প্রথম আলোর স্বনামধন্য সাংবাদিক প্রতিবেদক শিশির মোড়লকে কে শেখাবে। উনি জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য নিয়ে যে সকল প্রতিবেদন করেছেন তা এক কথায় অসাধারণ। আমি বলছি না এই প্রতিবেদক কিছু বুঝেন না। উনার জানাতে যে বিশাল ঘাটতি রয়েছে তা স্পষ্টত বুঝা যায়। অর্থনীতির মৌলিক প্রত্যয়গুলো যদি না জানেন তাহলে অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিবেদন করা কী দরকার?

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে। সাংবাদিকতার জন্য আরো বেশি প্রযোজ্য প্রবাদটি। ‘হোয়েন ইন ডাউট লীভ ইট আউট’।

আপনি যদি না জানেন অন্তত আউট করে দিন না! প্রয়োজনে আর একটু প্রত্যয়গুলো সম্পর্কে জেনে শুনে লিখুন। প্রতিবেদন অনেক ভালো হয়েছে একথা বলা যায়। কিন্তু সমস্যা এই জায়গাতে।

প্রতিবেদনটিকে যে পরিসাংখ্যিক তথ্য দেখা হয়েছে, প্রত্যয় ভুল হবার কারণে এ নিয়ে বিভ্রান্তি হবার অবকাশ আছে। এখন ঐ তথ্যকে আমরা মোট দেশজ উৎপাদন ধরবো নাকি ধরবো মোট জাতীয় উৎপাদন হিসেবে। শিশির মোড়ল ‘প্রখ্যাত’ সাংবাদিক হবার কারণে হয়তো তার লেখাটি এডিটিং প্যানেলে যায় নি বা তিনি মনেই করেননি তার লেখা এডিটিং প্যানেলে যেতে পারে।

বড় প্রতিবেদকেরা ছোটো ভুল করতে পারেন! তাই বলে মৌলিক বিষয়ে ভূল। আপনাদের কী এ ভুল মানায়। আপনাদের ভুলের খেসারত কেনো পাঠক দেবে? বিভ্রান্তিতে পড়বে পাঠকরা। আপনারা যদি এতো বড়ো ভুল করেন ‘ছোটো’রা কী করবে? নয়া প্রতিবেদকরা শিখবে কার কাছ থেকে? ভুল শিখানো বা ভুল বার্তা দেবার অধিকারও নিশ্চয় নেই আপনাদের কারোরই। দয়া করে, একটু খেয়াল রাখুন; অর্থনীতি বিষয় লেখার আগে অর্থনীতির মৌলিক প্রত্যয়গুলো অন্তত জেনে নিন।

টীকা:

জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন হলো দেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে এক বছরে উৎপাদিত পণ্য্য ও সেবা সামগ্রীর জোগান। চলতি ও স্থায়ী বাজার মূল্যে দু’ভাবেই জিডিপি পরিমাপ করা হয়। স্থির মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হিসেবে ধরা হয়।

জিএনপি বা মোট জাতীয় উৎপাদন হলো একটি দেশের জনসাধারণ সাধারণত এক বছরে যে পরিমান দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদন করে ও সেবাকর্ম জোগান দেয় তার সমষ্টি। এতে দেশে অবস্থানরত বিদেশীদের আয় অন্তর্ভূক্ত হয় না। কিন্তু প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ যোগ করা হয়। রফতানি আয় ও আমদানী ব্যয়ের প্রার্থক্য বিবেচনায় আনা হয়। (সূত্র: অজয় দাশগুপ্ত ও রোবায়েত ফেরদৌস সম্পাদিত ‘ব্যবসায় সাংবাদিকতা’)