ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

রেলওয়ে জাদুঘর। শুনতেই চমক লাগে। তাও গোটা দেশে একটি। কি কি আছে রেলওয়ে জাদুঘরে ! যেহেতু রেলওয়ে জাদুঘর, সেহেতু রেল সংশ্লিষ্ট বিষয়টিই এখানে ঠাঁই পাবে-এটাই স্বাভাবিক। রেলের যান্ত্রিক বিবর্তন, দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এর রূপান্তর- সবকিছু এক সাথে চোখের সামনে উপস্থিত হয় চার দেয়ালে ঘেরা ছোট্ট এই জাদুঘরে।

নগরীর পাহাড়তলী থানার রেলওয়ে ওয়ার্কশপের কাছেই রেলওয়ে জাদুঘরের অবস্থান। দক্ষিণমুখী এক ব্যতিক্রমী নকশার কাঠের বাংলোয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এই জাদুঘর। জাদুঘরের মূল গ্যালারিতে ঢুকতেই ফটকের ওপর ড্রাগন খোদিত কাঠের গেটে ইংরেজি হরফে লেখা আছে বাংলোর নির্মাণ কাল। ১৮৯৪ সালে এ বাংলো নির্মাণ করা হয়। ধারণা করা হয়, এখানে রেলওয়ে ভবনগুলোর মধ্যে এটাই সবচেয়ে পুরানো। এই দ্বিতল ভবনটির চতুর্পার্শ্বের পরিবেশও অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

রেলওয়ে জাদুঘরে রেলের যন্ত্রপাতি ৪ ভাগে ভাগ করে রাখা হয়েছে। চারটি বিভাগে যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ করা হয়েছে। তার মধ্যে বাম দিকের গ্যালারিতে আছে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে (এবিআর), ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে, ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে ও বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন মনোগ্রাম। একই সাথে রোলিং স্টাকে ব্যবহৃত কালার শেড, ইঞ্জিনের বিভিন্ন নিরাপত্তা ও প্রতিরোধক ডিভাইস, ওভার স্পিড ট্রিপ ডিভাইস গভর্নর, ইঞ্জিন গভর্নর ইত্যাদি। রেলের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির মধ্যে, ফুট প্যাডেল, ডেডম্যান লোকোমোটিভ সেফটি ডিভাইস, ডেডম্যান, এলার্ম বেল স্পিডোমিটার, ডেডম্যানলিলিপুট ডায়নামো, বিভিন্ন ধরনের ল্যাম্প যেমন- রিনিং ল্যাম্প, ঝাড়বাতি, ফ্যান্সি লাইট, গেইট ল্যাম্প, টেবিল ল্যাম্প, টেইল ল্যাম্প, সাইড ল্যাম্প, হ্যান্ডমিনাল ল্যাম্প। সংরক্ষণ করা হয়েছে রেলওয়ে গার্ডদের লুপস্টিক, ডেটিং মেশিন, পিতলের ব্যাজ, স্টেশন মাস্টার ক্যাপ, গার্ডবোট, উভেন পার, বক কংক্রিট পার, হ্যামার, রেলগেজ এমজি, বারক্রো, বারক্রো সুইং, বোর্ড লেবেল, বিভিন্ন পিচ পেট, বারকো পেইন রাউন্ড, স্পেশাল বিটার, হ্যামার, হ্যান্ড সিগনাল ফ্ল্যাগ, ফ্লেকসো মিটার, রক ব্যালাস্ট ইত্যাদি ।

পয়েন্ট টাইমিং মিটার, মোর্স কি উইথ সাউন্ডার, আর্ক লিভার, কন্ট্রোল কি, কি বক্স, সিগনাল আর্ম, টুলবক্স, টেবলেট, কয়েকধরনের সিগনাল রিভার্সার ,পয়েন্ট মেশিন, বিভিন্ন ধরনের এনালগ টেলিফোন, রোডল টেলিফোন ,রেডিও ট্রান্সমিটার, রেডিও রিসিভার ইত্যাদি সংকেত বিভাগে সংরক্ষিত যন্ত্রপাতি।

প্রকৌশল ও ট্রাফিক বিভাগে আছে-ভেনসোমিটার, থার্মোমিটার, মেজারিং ক্যান,স্প্যানার সিঙ্গেল, অ্যাডেড বারটমি, মনোরেল হুইল বোরো প্যাকিং লেভেল, প্যান পুলার, ক্যান-এ-বাউল ইত্যাদি।

এখানে ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে আছে ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক তথ্য। ৩০ মে রাতে সেনা অভ্যূত্থান ঘটানোর আগে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল সব ধরনের টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থা। তখন রেলওয়ের রেডিও ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে এই খবর ঢাকায় প্রেরণ করা হয়। যে রেডিও ট্রান্সমিটারের সাহায্যে এই খবর প্রেরণ করা হয়েছিল তাও এ জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। জানা গেছে ১৯৩০ সালের যুববিদ্রোহে রেলওয়ের যে ইংরেজ পুলিশ কর্মচারীদের ব্যারাকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার অভিযান চালিয়েছিল তার কিছু নমুনা সংরক্ষণ করার কথা থাকলেও তা এখনও পর্যন্ত জাদুঘরে রাখা যায়নি। চট্টগ্রাম রেলওয়ে জাদুঘরে দৈনিক ৭০/৮০ জন দর্শনার্থীর আগমন ঘটে ।

এখানে সংরক্ষিত রেলের যাবতীয় যন্ত্রপাতির কাজ সম্পর্কেও বর্ণনা দেয়া হয়েছে। প্রতিদিন বিকাল তিনটা থেকে জাদুঘরটি খোলা থাকে। সব দর্শনার্থীর জন্য জাদুঘর উন্মুক্ত।

জাদুঘরের ভিতরের পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দক্ষিণমুখী এ জাদুঘরটি একটি অনুচ্চ পাহড়ের উপর অবস্থিত। লম্বা সিঁড়ি বেয়ে উঠলে ভাঙ্গাচোরা গেটের অবয়বে দুটি পিলার। একটি পিলারে একটি বাঘের ভাস্কর্য। তারপর ছোট আঙ্গিনা অতিক্রম করেই জাদুঘরের ফটক । ঢুকলে হাতের বামে কর্তব্যরত কর্মচারী। ডান পাশে একটি রেলের মডেল। আর সামনের রুম থেকে জাদুঘরের প্রদর্শনের জন্য রাখা জিনিসপত্র। সামান্য ইতিহাসও আছে রেলওয়ের মনোগ্রামে। অর্থাৎ ব্রিটিশদের সময় থেকে বাংলাদেশ সময় পর্যন্ত রেলওয়ের বিভিন্ন মনোগ্রাম। তবে এখনও পর্যন্ত গাইড রাখার ব্যবস্থা করা হয়নি।

জাদুঘরের মনোরম নৈসর্গিক দৃশ্য

বিস্তৃত খালি জায়গাও আছে। নগরী থেকে পাহাড়তলির পথও কম নয়। তাছাড়া এ জাদুঘর এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এক চক্করেই জাদুঘর দেখা শেষ। তাই জাদুঘরের বাইরে খালি জায়গায় মনোরম একটি পার্কও গড়ে তোলা যায়। তাতে দর্শকের পাওনাটা ভারি হবে। অন্যদিকে নগরী থেকে সম্পূর্ণ কোলাহলমুক্ত পরিবেশে চমৎকার পার্কও গড়ে তোলা যেতে পারে। এ ব্যাপারে রেলওয়ের এডিশনাল চীফ ইঞ্জিনিয়ার শওকত আলী আকন্দ(প্রকল্প) বলেন ,পার্ক গড়ে তুলতে পারলে দর্শনার্থীদের বিনোদনের সুযোগটা বাড়ত। কিন্তু আর্থিক সঙ্কটের কারণে জাদুঘরটি সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে কনসালট্যান্ট নিয়োগ করার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন যাতে আরও পরিকল্পিতভাবে জাদুঘরকে সাজানো যায়।