ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবার আগেই শহর সিলেটে স্মরণ করছে তিন তরুণকে। যারা নিজেদেরকে বিলিয়ে দিয়েছিল মৌলবাদ আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। ইতিহাসের পাঠ এমনই যে আদর্শভিত্তিক যে কোন আত্মত্যাগকেই সে স্মরণ করে কোন না কোন সময়ে। মুনীর, তপন ও জুয়েলের সে পাঠ ছিল তেমনই। প্রজন্মের বদল হয়েছে কিন্তু চেতনার বিনাশ হয়নি। আজকের যে অনতি তরুণ এমনও যার ভাল করে বুঝে উঠার আগে যারা শহীদ হয়েছে তাদেরকে স্মরণ করছে গভীর চেতনায়।

১৯৮৮ থেকে ২০১০ দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অনেকেই নাম মুখে আনেননি তাদের। অনেকের ছিল প্রাণ হারাবার ভয় আবার অনেকের ছিল ব্যবসা বাণিজ্যে অংশীদারিত্ব হারাবার ভয়। এই ভয় আর স্বার্থ মিলেমিশে একাকার ছিল যাদের তাদের অনেকেই খুনিদের সাথে হাত মিলিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। এই হত্যাকাণ্ডের সাক্ষ্য দিতে যাননি অনেকেই কারণ সেখানেও ছিল প্রাণের ভয়, স্বার্থের দ্বন্দ, ছিল পারিবারিক সম্পর্কের প্রভাব তাই এক সময়ে আদালতের বিচারে খুনিরা পেয়ে গেছে বেকসুর খালাস। প্রচলিত আদালত খুনিদের শাস্তি দিতে পারেনি শুধুমাত্র প্রমাণের অভাবে। কিন্তু সিলেটের তরুণ প্রজন্মের বিবেক ঠিকই তার সহজাত চেতনায় গর্যে উঠতে শুরু করেছে। তরুণ প্রগতিশীলদের মুখ ও অন্তর দিয়ে ক্রমে এই প্রতিবাদের স্বর চেতনা জাগানিয়া হয়ে জনগণের দোরগোড়ায় পৌছে যাচ্ছে। ২০১০ থেকে এ বছর পর্যন্ত এ নিয়ে তিন তিন বার সিলেটের প্রকৃত প্রগতিশীলেরা কোনরূপ রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছাড়াই একই ব্যানারের পেছনে এসে দাঁড়াচ্ছেন। এটা প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে একটা অভুতপূর্ব উদাহরণ হিসেবে জন্ম নিচ্ছে এবং আমাদের বিশ্বাস ক্রমে এ প্রতিবাদ ও গণসচেতনতা কর্মসুচি দিকে দিকে ছড়িয়ে গিয়ে একটি সুসংহত অরাজনৈতিক চেতনাঋদ্ধ সংস্কৃতি বিনির্মাণের পথে এগিয়ে যাবে।

শহীদ মুনীর-তপন-জুয়েল রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিক দিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন সত্য কিন্তু তাদের চেতনা ছিল অবিনশ্বর একটি চেতনা যা অসাম্প্রদায়িকতাকে ধারণ করত। স্বভাবত সেখানেই তাদের বিরোধ ছিল মৌলবাদী, ধর্মান্ধ জামায়াত-শিবির গোষ্ঠীর সাথে। তখন ছিল স্বৈরাচারের কাল এবং স্বৈরাচারের সাথে সব সময়েই মৌলবাদী ও ধর্মান্ধদের আঁতাত থাকে। এরশাদ শাহীর সাথে মৌলবাদী জামায়াতের সে সময়কার আঁতাতের ফলে বিনা বাধায় অথবা প্রশাসনের কোনরূপ হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করে নির্বিঘ্নে গা ঢাকা দেয়। এরপর জাসদ ছাত্রলীগ বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও সেভাবে সফল হতে পারেনি কারণ প্রশাসনের শ্যেন দৃষ্টি এবং জামায়াত-শিবিরের অস্ত্রশক্তির কাছে তাদের শক্তি ছিল অতিমাত্রায় সীমিত।

ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষ হত্যা, রগ কাটা থেকে শুরু করে যাবতীয় ধর্মবিরোধী কাজের সূচনা হয়ে আসছে আমাদের দেশেও। যারা এসবের সাথে জড়িয়ে আছে তারা ধর্মান্ধতার খোলসে আবদ্ধ অনেক আগে থেকেই। মানুষের ধর্মের প্রতি ভালোবাসাকে পুঁজি করে অধর্মের চাষ করে যাচ্ছে নিয়ত। যেখানে ধর্মের কোন যোগ নেই সেখানে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে ভিন্ন ভিন্ন নামে তাদের বিচরণ হয়ে চলেছে। প্রকৃত ধার্মিকের কোন সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই এই অধর্ম পালন ও ধর্মান্ধতাকে লালন হচ্ছে দিন দিন। মার খাচ্ছে ধর্মের ইস্পিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এক ধর্মের সাথে অপ্রত্যক্ষ বিবাদে জড়িয়ে যাচ্ছে অনেকেই। এর মূলে রয়েছে দুষ্ট রাজনৈতিক চর্চা ও সাধারণ জনমানুষের আবেগের অতিপ্রকাশ অথবা অপ্রকাশ। এর ফল ঘরে তুলছে জামাত-শিবিরসহ প্রতিক্রিয়াশীল চক্র।

ধর্মে ধর্মে বিরোধ সৃষ্টি ও ধর্মান্ধকে উস্কে দেয়ার কাজ যারা করছে তারা কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য- উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে এগিয়ে চলছে। অপরপক্ষে যারা আসাম্প্রদায়িকতা ধারণ করেন তারা প্রকৃত কারণ বের করার চাইতে শুধুমাত্র পারস্পরিক তীর নিক্ষেপের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। ফলে পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়নের পরিবর্তে শত্রু মানসিকতার পারদ তীব্র হয়ে চলছে দিন দিন। এ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে কারণ ধর্ম মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করেনি আগেও এবং এখনো করতে চায়না। জাতি হিসেবে আমরা বাঙালি এই ধ্যান-ধারণাকে লালন করলে এবং এই জাতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের দিকে তাকালেই কেবল আমরা অনুধাবণ করতে পারব এই ভূখণ্ডে ধর্মে ধর্মে নিবিড় সহাবস্থান ছিল, ছিল না ধর্মের নামে অধর্ম আর ধর্মান্ধতার চাষ।

মুনীর-তপন-জুয়েল একটি চেতনার নাম হিসেবে দেখা দিচ্ছে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন সিলেটবাসীর কাছে। তাই আজ সিলেটের সব প্রগতিশীল মানুষেরা এই মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী দিবসে সিলেটের রাজপথে নামছে। এখানে বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে হাইলাইট করার চেষ্টা হচ্ছেনা। সম্পুর্ণ অরাজনৈতিক প্ল্যাটফরমে দাঁড়িয়ে সব শ্রেণীর মানুষের মাঝে মৌলবাদ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে অংশ নেবার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

মুনীর-তপন-জুয়েল সিলেটের অসাম্প্রদায়িক চেতনার স্পন্দন হিসেবে পরিগণিত হচ্ছেন। সিলেটের অসাম্প্রাদিয়ক চেতনাধারি মানুষেরা তাদের মৃত্যুর দিনকে সিলেটে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী দিবস পালন করে আসছে। অনলাইন-অফলাইনে এই আন্দোলনে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধুমাত্র শহর সিলেটই নয় শহর সিলেটের বাইরে সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, রংপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ২৪ সেপ্টেম্বর তারিখে প্রতিবাদ হচ্ছে বিক্ষিপ্তভাবে। অনলাইন বিশেষ করে ফেসবুকের মাধ্যমে প্রগতিশীল যারাই শুনছে তারাই এ মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে কথা বলছে। এটা হতে পারে একটা অনন্য অর্জন।

২৪ সেপ্টেম্বর মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী দিবস পালন করছে সিলেটের প্রগতিশীল তরুণেরা। এই তরুণেরা দেখিয়ে দিয়েছে কোন এক শহর থেকেই মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠ হওয়া সম্ভব কোনরূপ রাজনৈতিক শক্তির সহায়তা ছাড়াই। দিনে দিনে এ আন্দোলনের ব্যাপ্তি বাড়ছে। শহর সিলেটের এই আন্দোলন এখন শহর ছাপিয়ে অন্যান্য জেলা শহরে ছড়িয়েছে। এটা হয়ত খুব বেশি দূরের না যখন এই আন্দোলন ও দিবস জাতীয়ভাবে পালিত হবে। তাই যারাই অসাম্প্রদায়িক ধারণাকে পোষণ করেন তাদের সবার উচিত এই আন্দোলন ও প্রতিবাদকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়া।

শহর সিলেটের প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার মুনীর-তপন-জুয়েল অসাম্প্রদায়িক চেতনার অবিনশ্বর নাম। তাদের এই আত্মত্যাগ একটা মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সমাজ বিনির্মাণে সহায়ক হলে তাদের আত্মদান তবেই স্বার্থক হবে।

আমরা সে দিনেরই অপেক্ষায় আছি প্রবলভাবে!

আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ুক এখানে-সেখানে; সবখানে