ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ১১ই জানুয়ারী ২০০৭ সালের পট পরিবর্তন এখন ইতিহাসের অংশ। বর্তমানে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পটভূমিতে অনেকেই ১/১১-র রাজনীতিকে বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করে যাচ্ছেন। দু:খের বিষয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অনেক লেখাতেই ১/১১-র পরিবর্তনকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই বিশ্লেষিত হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এই ইতিহাস কোন দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং র্নৈব্যক্তিক দৃষ্টিতেই বিশ্লেষণ করা কাংখিত।

প্রথমেই প্রশ্ন করা যাক, ২০০৭ সালে ১/১১-র পরিবর্তন কেন অনিবার্য য়ে পড়েছিল? এ প্রশ্নের উত্তরে নি:সন্দেহে দলনিরপেক্ষ সচেতন নাগরিকরা একবাক্যে স্বীকার করবেন, রাজনৈতিক দলগুলোর চরম ব্যর্থতার কারণেই ১/১১-র পটপরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। বিশেষত: ২০০৭ সালের প্রস্তাবিত সংসদ নির্বাচনে হাওয়াভবন নিয়ন্ত্রিত অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ৪-দলীয় জোটকে জিতিয়ে আনার ষঢ়যন্ত্র, আওয়ামী লীগ নিয়ন্ত্রিত মহাজোটের সরকার বিরোধী আন্দোলনে সে সময়ে দিশেহারা ছিল সাধারণ জনগণ। সে সময়ে দুটি প্রধান রাজনৈতিক জোটের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে দেশে বড় ধরণের রক্তপাত হওয়ার আশংকা অমূলক ছিল না। এ অরাজকতা থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে তাই ১/১১-র অসাংবিধানিক সরকার পরিবর্তনকে সাধারণ মানুষ স্বাগত জানিয়েছিল– এ বাস্তবতা অস্বীকার করলে সত্যের অপলাপ হবে।

১/১১-তে অধিষ্ঠিত সেনা-নিয়ন্ত্রিত ড: ফখরুদ্দিনের অসংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুরুটা কিন্তু খারাপ করেনি। দূর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচনে সেদিনগুলোতে সাধারণ মানুষ হয়েছিল উল্লসিত। বিশেষ করে দূর্নীতিবাজ রাঘব-বোয়াল, যারা জীবনে ভাবতে পারেনি আইন তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করবে তাদেরকে যখন একেকটা দূর্নীতির দায়ে জেলে ঢুকানো হচ্ছিলো, তখন তো জনগণের উল্লসিত হওয়ারই কথা। যখন মানুষ দেখে তথাকথিত হাওয়া ভবনের দূর্নীতিবাজ যুবরাজ, ঋণখেলাপী ব্যবসায়ী সালমান রহমান, বসুন্ধরার লুটেরা আব্দুস সোবহান একে একে জেলে ঢুকছে তখন মানুষ দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

কিন্তু দূর্ভাগ্য, ১-বৎসরের মাথাতেই জেনারেল মঈন নিয়ন্ত্রিত সরকার লক্ষ্যচ্যূত হয়। বিশেষ করে মাইনাস টু ফর্মূলা (হাসিনা-খালেদাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে ফেলার যঢ়যন্ত্র) বাস্তবায়নে নানা অভিসন্ধীমূলক কার্যকলাপের কারণে সরকারের জনপ্রিয়তা পারদ অতি দ্রুত নামতে থাকে। এর বহি:প্রকাশ ঘটে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া সরকার বিরোধী আন্দোলনে। সম্ভবত: সে সময়েই ড: ফখরুদ্দিন তার সরকারের জনপ্রিয়তা ধ্বস নামার বাস্তবতা উপলব্ধি করে ২০০৮ সালের জানুয়ারীতে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। উল্লেখ্য, ১/১১-র মূল কুশীলব জেনারেল মঈনের ক্ষমতা দখল করে রাজনীতি করার খায়েশ থাকলেও আর্ন্তজাতিক বিশ্ব বিপরীত অবস্থান নেয়ার কারণে তা সম্ভব হয়নি।

পরিশেষে বলা যেতে পারে ১/১১-র পরিবর্তন দূর্নীতিবাজ রাজনৈতিক, আমলা, ব্যবসায়ীদের জন্য ছিল একটা টর্ণেডো। ১/১১-র ইতিহাস থেকে রাজনীতিকদের শিক্ষা নেওয়া বাঞ্চনীয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, চোরায় না শুনে ধর্মের কাহিনী! দল হিসেবে আওয়ামী / বিএনপি-র রাজনীতিতে চিহ্নিত দূর্নীতিবাজরাই হচ্ছে আরো ক্ষমতাবান। আর আবারো আগের মতোর রাজনৈতিক দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় লুটেরা ব্যবসায়ী, আমলাদের উথ্থান ঘটছে। জনগণের আকাংখার বিপরীতে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকান্ড চলতে থাকলে যে আবারো একটা রাজনৈতিক টর্ণেডো আসবে না সে নিশ্চয়তা কে দেবে!