ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফর নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ বেশ সরগরম করে রেখেছে তাঁদের মিছিল-মিটিং ও আলোচনা সভাগুলো। মুলধারার গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমেও এ নিয়ে নানান ধরনের জল্পনা-কল্পনা করতে দেখা যায়। কেউ হয়-তো বুঝে আবার কেউ হয়-তো লোক মুখে শুনে যার-যার মতন করে কখনো চার টেবিলে আবার কখনো আড্ডাস্থলে তর্ক-বিতর্কের ঝড় তুলছে।

বিগত সফরগুলোতে তিস্তাচুক্তি নিয়ে বেশ হৈচৈ দেখা গেলেও এবার প্রায় সবার আলোচনা-সমালোচার বিষয় দেখা যায় ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি’ বা ‘সামরিক চুক্তি’র বিষয়টি। আর সে সাথে যুক্ত হয়েছে নানান বিষয়াদি।

সামরিক চুক্তির ব্যাপারে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বিশ্বের প্রতিটা দেশেরই সামরিক নীতি থাকে। এগুলো একেবারেই নিজস্ব বা গোপনীয় বিষয়। তাই প্রতিরক্ষা বিষয়াদি বা প্রতিরক্ষা চুক্তি যেমন স্পর্শকাতর ও উভয় দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবার সার্বভৌম ও নিরাপত্তার আর সময়, বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই উভয় দেশের জন্য এই ধরনের সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

ইতোমধ্যেই দুই দেশের কুটনীতিকের বরাত দিয়ে কিছু সংবাদও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। আর এখানেই স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে, ঢাকা-দিল্লির দুই সরকার প্রধানের শীর্ষ বৈঠকে অন্যান্য বিষয়ের সাথে প্রতিরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচনায় স্থান পাবে এবং একটি সমঝোতা স্মারকও সই হতে পারে।

কী আছে এই সামরিক চুক্তিতে এই ব্যাপারে যাঁরা অতিমাত্রায় আলোচনা-সমালোচনা করে রাজনৈতিক মাঠ বা ভার্চুয়াল জগৎ গরম রাখার চেষ্ঠা করছে তাঁদের অনেকের সাথে যোগাযোগ করা হলে আমাকে রীতিমত আশাহত করেন। তবে সামরিক বিশ্লেষণ বা বিশ্লেষকের ধারণা, সামরিক ক্ষেত্রে আরো বাড়তি যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিষয়াদি ওঠে আসতে পারে। আবার দু’দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করাও একটা ব্যাপার হতে পারে।

অন্যদিকে দিল্লি চাইতে পারে ভারতের কাছ থেকে বেশি পরিমাণে বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র কেনার একটা ক্ষেত্র তৈরি করতে। বর্তমানে ঢাকা বেশিরভাগ অস্ত্র চীন থেকে ক্রয় করে। আর দিল্লি সেই জায়গাতে নিজের অবস্থান তৈরি করতে একটা চেষ্ঠা চালাতে পারে। আবার বর্তমানে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের যে অপতৎপরতা তৈরি হয়েছে সেই সন্ত্রাসবাদী ধ্বংসাত্মক তৎপরতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে যৌথ অভিযান বা সম্মিলিত অভিযান চালানো যায় কীনা সেরকম একটা সুযোগ তৈরি করার একটা ব্যাপার এ চুক্তির মধ্যে দিল্লি রাখতে চাইছে বা চাইতে পারে।

এখানে চুক্তির মেয়াদ কী বা এই চুক্তির বিশাল অর্থের যোগাদাতা কে বা কারা ইত্যাদি নিয়েও গণমাধ্যমে বিশ্লেষণ চলছে। তবে প্রকাশিত তথ্য সুত্র বলছে, চুক্তির মেয়াদ হতে পারে ২৫ বছর বা আলোচনা সাপেক্ষে আর এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করতে পারে দিল্লি।

এখানে সমালোচনার খাতিরে অনেকেই দেখছি ভারত এতে এতো আগ্রহী কেন তা খুব বেশি হৈ-চৈ করছে। এখানে একেবারেই স্পষ্ট, আমরা যখন দোকানে যাবো সবচেয়ে ভালো জিনিসটাই কিনতে চাইবো অথবা ব্যবসায়িক চিন্তা করলে কোথায় বা কোন মার্কেটে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দিলে আমার ব্যবসা ভালো হবে সেটা আমার যেমন প্রধান চিন্তা, সেটা অপরেরও একই চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক।

দিল্লি নর্থ-ইস্টার্ন রিজিয়নে তার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য অনেক ধরনের চিন্তা-ভাবনা করে রাখতে পারে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে এখন পর্যন্ত ঢাকার সাথে দিল্লির সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক যে সুসম্পর্ক রয়েছে তা সামরিক ক্ষেত্রেও বৃদ্ধি করার একটা কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে ভূরাজনৈতিক অবস্থান থেকে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ নির্ধারণ করে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে বাংলাদেশ সরকার। চীন-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা সমরাস্ত্র এবং উন্নত সামরিক সরঞ্জাম নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে সামরিক বাহিনীতে। সম্প্রতি চীন থেকে কেনা দুটি সাবমেরিনও যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যা নিয়ে সস্তা কথায় বস্তা পঁচা সমালোচনাও স্যোশাল মিডিয়ায় অবলোকন করা গেছে।

আর প্রতিরক্ষা বা সামরিক চুক্তির বিষয়ে চীন-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র এর মাঝখানে দিল্লি তার নিজের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা বা ঢাকার সাথে প্রতিরক্ষাখাতে আরও সুদৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন করতে জোর প্রচেষ্ঠা চালাবে এটাই স্বাভাবিক। ভারত বাংলাদেশের পরিক্ষিত বন্ধু ও পরম আত্মীয় তাই আলোচনার পরিধিও নানান বিষয়ের উপর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশেষ করে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সামরিক খাত, কানেক্টিভিটি বাড়ানোর ও জ্বালানি সহযোগিতার উপর গুরুত্ব পাবে বলে বিশ্লেষকেদের ধারণা।

বাংলাদেশের সমালোচনার রাজনীতিতে ভারত বিরোধী পক্ষ সব সময় বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে জনগণকে কীভাবে উদ্বুদ্ধ করা যায়, কীভাবে ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণকে গরম রাখা যায় তার একটা নোংরা অপপ্রচার সেই মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে আজও বিদ্যমান। মনগড়া গল্প আর গাল ভড়া বুলি দিয়ে জনগণের মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টির একটি অপকৌশল গ্রহণ করে থাকে যা দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

আমাদের মনে রাখাতে হবে, শেখ হাসিনা শুধু দেশের সরকার প্রধানই নয় তিঁনি বঙ্গবন্ধু’র কন্যা। যিঁনি তাঁর পরিবারের সর্বস্ব হারিয়েও দেশ ও দেশের জনগণের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিরূপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনাই ভারতের সঙ্গে আবারও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেছিলেন বলেই আলোচনার মাধ্যমে ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তি চুক্তি ও গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি হয়েছিল।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারও ভারতের সঙ্গে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে আসে আঘাত। একের পর এক ভারতবিরোধী নেতিবাচক কর্মকান্ড এবং সেই দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশের মাটিতে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার থেকে সহযোগিতা করা হয়।

২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু’র কন্যা শেখ হাসিনা ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটিগুলো শুধু গুঁড়িয়েই দেননি, বাংলাদেশের মাটিতে লুকিয়ে থাকা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিতাড়িত করেছেন। অনেক বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে ধরে ভারতের কাছে হস্তান্তরও করা হয়েছে।

কিছু ভারত বিরোধী ও মনভরা গল্পের সমালোচক ছাড়া দেশের জনগণ বিশ্বাস করে, মা’র চেয়ে মাসির দরদ যেমন প্রকৃত দরদ নয়; তেমনি শেখ হাসিনার চেয়ে দেশপ্রেম ও দেশের জনগণের জন্য আত্মবলিয়ান আরও কারো হতে পারে না। যিঁনি ইতোমধ্যেই তাঁর পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ ভাই রাসেলকে হারিয়েও দেশ, মাটি ও মানুষের কাজের জন্য বিশ্ব নন্দিত হয়েছেন। অর্জন করেছেন বাংলাদেশ ও বিশ্বের কোটি-কোটি মানুষের সম্মান-শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। আর এখানেই আমাদের বিশ্বাস, শেখ হাসিনাতেই আমাদের আস্থা।

সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিষ্ট ফোরাম (বোয়াফ)