ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ বা মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়ের ইতিহাস নতুন প্রজন্ম তথা বাঙালি জাতির কাছে বার বার আড়াল করার চেষ্টা করেছে প্রায় সব রাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যক্তি মহল। নিজেদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তি স্বার্থের কারণে যুব সমাজের কাছ থেকে প্রকৃত ইতিহাসকে দূরে রাখার চেষ্টাই প্রতিনিয়ত দেখা গেছে।

৭৫-এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর মোসতাক-জিয়া গ্যাং পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক গল্প-কাহিনী ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দিতে সব ধরনের চেষ্টাই করেছিল। স্বাধীনতার ঘোষক, ২৫ মার্চ কালোরাতে শুরু হওয়া পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে কার কী নেতৃত্ব, কার কী অবদান, রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের বর্বর তান্ডব গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নী সংযোগ ইত্যাদি ক্ষমতার স্বার্থের নীচেই যেন ধামাচাপা দিয়েছিল।

বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পরিকল্পিতভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতারও অংশীদার করা হয়েছিল। ৩০ লক্ষ শহীদ আর ২ লক্ষ সম্ভ্রম বিনাসের নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অর্জিত লাল-সবুজ-এর পতাকা স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে তুলে দিয়েছিল। চেষ্টা করা হয়েছিল, মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধ্বংস করে পাকিস্তানের অখন্ড অংশ পুনরুদ্ধার এবং পাকিস্তানের সংবিধান রক্ষা করা! যা ইতোমধ্যেই মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকরের বিরোধীতা করে পাকিস্তান সরকার সে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে বাঙালি জাতিকে পরিস্কারভাবে বুঝিয়েছে।

প্রকৃত ইতিহাস আড়াল করার ধারাবাহিকতায় জাসদের বিতর্কিত কর্মকান্ড রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে আবারও আড়াল করার মাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মহাজোটের ক্ষমতাসীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) নিয়ে খুব বেশী সমালোচনা না হলেও মাঝে মধ্যে ১৯৭২ থেকে ৭৫-এর বিতর্কিত কর্মকান্ড নিয়ে সমালোচনা দেখা যায়। এটা যে একেবারেই ব্যক্তি আক্রোশে বশবর্তী হয়ে, তা কিন্তু নয়। লক্ষ-কোটি ধূলিকণা দিয়ে একবিন্দু সত্যকে যেমন কখনও আড়াল করা সম্ভব নয়! তেমনি মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও তার পরবর্তী প্রেক্ষাপটের সঠিক তথ্যাদিও লুকানো অসম্ভব! ইতিহাস তার নিজেস্ব গতিতেই যুগে যুগে তার পংক্তিমালা দিয়ে দেশ, জাতি ও বিশ্বকে সত্যতা জানান দিয়ে আসছে।

একটা সময় এদেশে কোনও যুদ্ধাপরাধী নেই, যুদ্ধাপরাধ ঘটেনি বা মানবতাবিরোধী কোনও কর্মকান্ড ৭১-এ হয়নি বলে যারা ইতিহাসের পাতা থেকে তাদের পরিচালিত বর্বরতা মুছে দিতে চেয়েছিল; তারাই আজ ইতিহাস থেকে নিক্ষিপ্ত হয়েছে! নিগ্রীত হয়েছে দেশ ও জাতি থেকেও! নতুন প্রজন্ম ৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবিতে মাঠে-ময়দানে সদা সোচ্চার ও দাবি আদায়ের লক্ষে আজও অনড়।

জাসদ-এর ভূমিকা নিয়ে অন্য সময়ের চেয়ে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের একটি বক্তব্য নিয়ে জাসদ নেতাকর্মীদের মাঝে তখন একটু বেশীমাত্রায় আঘাত পেয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ৭৫-এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ডের ক্ষেত্র তৈরির জন্য জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলকে দায়ী করে জাসদ থেকে মন্ত্রী করার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে; তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের এমন মন্তব্য নিয়ে আওয়ামী লীগ, সরকার ও ১৪ দলের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনাও দেখা গিয়েছিল।

পাঠক! তখন সব কথার মাঝে সবাই একটা সত্যকেই আড়াল করার চেষ্টা করছে! আর তা হচ্ছে ইতিহাসের পাতা থেকে জাসদ-এর বিতর্কিত কর্মকান্ড নতুন প্রজন্মের মাঝে ঢাকার এক অনন্ত চেষ্টা।

২০১৬ সালের ১৩ জুন টিএসসি মিলনায়তনে ছাত্রলীগের বর্ধিত সভার সমাপনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ৭৫-এ জেলখানায় হত্যাকান্ডের শিকার মুজিব নগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে ছাত্রলীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাসদ গঠন করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাসদ নামক বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে পরিচালিত করে। মুক্তযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের একটি অংশ। কিন্তু জাসদের নেতা-কর্মীরা এই সফল মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছিল। বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার আগেই ছিন্নভিন্ন করার চেষ্টা করেছিল। তারা যদি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সমস্ত পরিবেশ সৃষ্টি না করত, তবে বাংলাদেশ একটি ভিন্ন বাংলাদেশ হত।’

জাসদের তখনকার ভূমিকা নিয়ে যে শুধু সৈয়দ আশারাফুল ইসলামই একা বলেছে তা কিন্তু নয়। এর আগে ২০১৫ সালের ২৩ আগষ্ট জাতীয় শোক দিবসের এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সভাপতিমন্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘স্বাধীনতাবিরোধীরা কখনও বঙ্গবন্ধুর ওপর আঘাত হানতে পারত না, যদি এই গণবাহিনী, জাসদ বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করে বিভিন্ন জায়গায় ডাকাতি করে, মানুষ হত্যা করে, এমপি মেরে পরিবেশ সৃষ্টি না করত। সুতরাং বঙ্গবন্ধু হত্যার মুল রহস্য বের করতে হবে, কারা-কারা জড়িত ছিল।’

‘আমি শুধু বলব, হঠাৎ করে জাসদকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কেন শুরু করলেন, আমি জানি না’ -তখন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু একথা বললেও তখন সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মন্তব্যে বলেন, ‘এখন ইতিহাস চর্চার সময় নয়।’

জাসদের ইতিহাসকে আড়াল করার লক্ষ্যে অনেক রাজনীতিবিদের আন্তরিকতা দেখে নতুন প্রজন্মসহ তখন অনেকে সত্যিই মর্মাহত হয়েছিল। বিভিন্ন চা-স্টলে বা আড্ডা আলোচনা ছিল এই ইতিহাস আড়াল করার প্রশ্ন নিয়ে। কেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও তার পরবর্তী প্রেক্ষাপট জাতির কাছে আড়াল করা হচ্ছে? তাও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়…? আলোচনা-সমালোচনার মাঝে অনেকে তখন বলেছিলেন, শুধু শুধু বিএনপি-জামাতকে আমরা দোষারোপ করছি কেন? এই (সত্যকে আড়াল করার) দৌঁড়ে তো কেউ কারো থেকে কম নেই..!

পাঠক! জাসদের তখনকার রাজনৈতিক দিনালিপি খুজলে দেখবেন- এই সেই জাসদ, যাদের নেতা মেজর জলিল স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমানকে চ্যালেঞ্জ করে রাজধানীর সুত্রাপুর থেকে ভোটে দাঁড়িয়েছিল! তাদের নেতা আ স ম রব জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজাতে চেয়েছিল! এই সেই জাসদ, যারা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ পতনের পর এদেশে সমাজতন্ত্র কায়েম করার চিন্তা-ভাবনা করে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মদদ দিয়েছিল!

কথিত আছে, একদিকে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক ট্যাংকের ওপর উঠে নেচেছিল বর্তমান জাসদ একাশেংর সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। আবার অন্যদিকে কর্নেল তাহের নাকি বঙ্গবন্ধুর লাশ দাফন না করে বঙ্গোপসাগরেও ভাসিয়ে দিতে বলেছিল!

তবে এদিকে জাসদের শরীফ নুরুল আম্বিয়া অংশের কার্যকরী সভাপতি ও চট্টগ্রাম ৮ আসনের সংসদ সদস্য মঈন উদ্দিন খান বাদল তাঁর লন্ডন সফরের সময় চ্যানেল এস টেলিভশন ‘অভিমত’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রায় স্বীকার করেই নিয়েছেনে যে, ১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত জাসদের ভূমিকা, বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত বিরোধিতা এবং বিপ্লবের জন্য জেনারেল জিয়াউর রহমানকে নির্বাচন করা কর্নেল তাহেরের ভুল সিদ্ধান্ত এবং তিনি ১৪ দল সরকারের তথ্যমন্ত্রীকে নিয়েও বলেন, ‘এই হাসানুল হক ইনুর ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন আসছে! আদতে তার ভূমিকা নিয়ে এতো প্রশ্ন হয়! তাহলে কেন তাঁকে মন্ত্রী রাখা হয়েছে?’

পাঠক! বঙ্গ দেশে রঙ্গ খেলায় মেতে আছে অনেকেই। কেউবা পরিকল্পিতভাবে, কেউবা সাময়িক লোভ-লালসার কারণে আবার কেউবা ক্ষমতা কিংবা স্বার্থের কারণে ইতিহাসকে আড়াল করার চেষ্টায় মশগুল ছিল! আজও আছে!

তখনকার সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় জাসদ প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক আ স ম রব গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য ও অনভিপ্রেত। বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য আওয়ামী লীগই দায়ী। আওয়ামী লীগের ভুল রাজনীতি বঙ্গবন্ধুকে দলীয় আবর্তে বন্দী করে, উপনিবেশিক শাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ করে জনগণ থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করে, মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল।’

আবার জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাংসদ ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর জাসদ গণবাহিনী গঠন করে বেছে বেছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা না করলে দেশে দুর্দিন আসতো না। বঙ্গবন্ধুর মতো এতবড় জাতীয় নেতাকে আমরা হারাতাম না।’

এখানে লক্ষ্য করলেই দেখবেন, একটু স্বীকার করার দায়েই যেন জাসদের অন্য অংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধান তখন তাঁদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। জাসদসহ সকলের ভুল-ভ্রান্তি নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু স্মরণ করা উচিৎ, আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১০ দলীয়, ১৫ দলীয় জোট গঠন করে ইতোপূর্বে সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক সংগ্রাম করেছি।’

সাম্প্রতিক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের এক মন্তব্যেও পরিপ্রেক্ষিতে আবারও জাসদ বিতর্ক চলমান রয়েছে। জাতীয় প্রেসক্লাবে ৭ নভেম্বর জেনারেল খালেদ মোশাররফের স্মরণসভায় এইচটি ইমাম বলেন, ‘স্বাধীনতার পরে দুটি জিনিস আমাদের পেছনে নিয়ে গেছে। প্রথমত- সেনাবাহিনীতে পাকিস্তান ফেরতদের আত্মীকরণ। যে কাজটি জিয়াউর রহমান এবং জেনারেল ওসমানী মিলে করেছিলেন। দ্বিতীয়ত- কর্নেল তাহের ও মেজর জলিলদের নিয়ে আসা। এগুলো না হলে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হতো না, দেশ অনেকদূর এগিয়ে যেত।’
তার পরের দিন (৮ নভেম্বর) জাসদ একাংশের সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তাঁর নিজের এলাকা কুষ্টিয়ায় এক সমাবেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রতি ক্ষোভ ঝেড়ে বলেছেন, আপনারা ৮০ পয়সা থাকতে পারেন। আপনি এক টাকার মালিক না। যতক্ষণ এক টাকা হবেন না ততক্ষণ ক্ষমতা পাবেন না। আপনি ৮০ পয়সা আর এরশাদ, দিলীপ বড়ুয়া, মেনন আর ইনু মিললে তবেই এক টাকা হবে। আমরা যদি না থাকি তাহলে ৮০ পয়সা নিয়ে আপনারা (আওয়ামী লীগ) রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরবেন। এক হাজার বছরেও ক্ষমতার মুখ দেখবেন না। সুতরাং ঐক্য করেছি জাতীর জন্য, দেশের জন্য, মানুষের জন্য। সেই ঐক্যের ফসল হিসাবে আজ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী। আগামী জাতীয় নির্বাচন ঐক্যবদ্ধভাবে হবে। জাসদ ঐক্যের মর্যাদা রাখবে, আপনারা পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করবেন না। জাসদের কাফেলা চলতেই থাকবে।”

তার আগে জাসদের অপর অংশের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধান এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমামকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ‘ষড়যন্ত্রকারীদের একজন’ আখ্যায়িত করে বিবৃতিও দিয়েছেন!
যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা বলেছেন, ‘১৯৭৫ সনের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী খুনি খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিপরিষদ সচিব অতি উৎসাহী আমলা সে সময়ের মতোই একই ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক আচরণ করছেন।’

পাঠক! দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাসদের বিতর্কিত কর্মকান্ড কিংবা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মুল পরিবেশ সৃষ্টির ইতিহাসটুকু কৌশলে শুধু জাসদই নয়; খোদ আওয়ামী লীগই আড়াল করার চেষ্টা করছে। আর হয়তো এই কারণেই তখন দলটির সভাপতিমন্ডলির সদস্য (বর্তমানে সাধারণ সম্পাদক) ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘জাসদ নিয়ে তিঁনি (সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম) যে বক্তব্য দিয়েছেন, এটা একান্তই ব্যক্তিগত মতামত। এটা দলীয় কোনও মতামত নয়।’

এখানে যে শুধু ওবায়দুল কাদের একা তা কিন্তু নয়। স্বয়ং ১৪ দলের নেতারা তখন বলেছিল, ‘জাসদ নিয়ে দেওয়া সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের এ বক্তব্য ঠিক, তবে সময় উপযোগী নয়। নেতাদের মতে, এ সময়ে এমন কঠিন সত্য বলার পরিবেশ দেশে নেই। এছাড়া সৈয়দ আশরাফের এই বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত, এতে জোটের ঐক্যে ফাটল ধরবে না।’

পাঠক, সত্য বরাবরই কতিপয় শ্রেণি বিশেষকে তার তিক্তস্বাদ গ্রহণে সহায়তা করে থাকে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বেশ ভাল করেই জানে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য মিথ্যে নয় এবং এ সত্যটুকু তারা এবং স্বয়ং তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ (একাংশ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুও এমন্তব্যকে মিথ্যা-বানোয়াট বা চ্যালেঞ্জ না করে বরং স্বীকারের নিমিত্তে এখন ইতিহাস চর্চা না করার জন্য আহবান জানিয়েছিলেন।

এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, আওয়ামী লীগ থেকেই জাসদের জন্ম। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে ছাত্রলীগ দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার মাধ্যমে জাসদ গঠন হয়। ১৯৭২ সাল থেকেই জাসদের সমাজতন্ত্রবাদীরা সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে নিজেদের পরিচালিত করতে থাকে। আর সেই পথ চলায় জাসদের বিতর্কিত কর্মকান্ডের ইতিহাসটি সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্যে নতুন প্রজন্ম তার সত্যতা খুজে পায় যখন জাসদের জন্ম থেকে ৭৫-এর ভূমিকা নিয়ে মঈন উদ্দিন খান বাদলের মুখে ‘কাফফারা’ দিচ্ছি শব্দটির মাঝে!

ইতিহাসকে কেউ কখনও ধামাচাপা দিয়ে রাখতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। বরং ইতিহাসের শিক্ষা নিয়ে আমাদের সামনের দিকে এগুতে হবে। আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর ভক্ত। আগুন সন্ত্রাসী, বোমাবাজের রানী, পেট্রোল সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদের রানী, জাতির অভিশাপ ইত্যাদি ইত্যাদি নতুন-নতুন এই ধরনের শব্দের উদ্ভোবক আমার প্রিয় জাসদের এই মন্ত্রী। বিপ্লব, বিপ্লব কিংবা অতি বিপ্লব শব্দ চয়নে তথ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে নতুন প্রজন্মের অনেক কিছু শিক্ষার আছে।
তার উপর স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধী ও তাদের অশুভ রাজনৈতিক আদর্শ দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে জাসদের বর্তমান ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য।

ইতিহাসকে ইতিহাসের গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। জাতি বিচার-বিশ্লেষণ করবে। আর তাই রাজনীতিবিদদের প্রতি অনুরোধ- অনেক কাটা ছেড়া হয়েছে ইতিহাসকে। ইতিহাসের ভুল শিক্ষা দিয়ে জাতিকে অনেক ক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্তও করা হয়েছে। যার যা অবদান তা অকপটে স্বীকার করুন। গুণীজনের মর্যাদা দিন। অপরাধীর অপরাধ তুলে ধরুন। সে আপনার ঘরের লোক হোক বা পরের বাড়ির শত্রুও হোক। আর জাসদের উচিৎ হবে ১৯৭২ থেকে ৭৫-এর প্রেক্ষাপটের ইতিহাসকে আড়াল না করে বরং সেই সময়ে নিজেদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া। ক্ষমা চাওয়া উচিত বঙ্গবন্ধু পরিবারের কাছেও।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিষ্ট ফোরাম (বোয়াফ)