ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

একত্রিশ জানুয়ারিতে দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ছুটিতে গিয়ে বিদেশের মাটি থেকে পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।

সেদিন ছিল শনিবার। সকালের সময়টা অন্যান্য দিনের মতন হলেও সারাদিনে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে নিয়ে। যিনি ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি শনিবারে দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতির শপথ গ্রহণ আবার ২০১৭ সালের ১১ নভেম্বর আরেক শনিবারে (বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে শনিবার বিচারপতি সিনহার পদত্যাগপত্র পাওয়ার কথা জানানো হয়) পদত্যাগ করে যেন জাতির সামনে সেই শনির দশার কুসংস্কারের কলঙ্কিত অধ্যায়ের প্রমাণ চিহ্ন রেখে গেলেন!

কারণ, পদত্যাগ করা মাননীয় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বা এসকে সিনহার আলোচনা-সমালোচনা সেই ২০১৫ সালে ১৭ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ মনোনিবেশ করার ক্ষেত্রে এটি একটি দৃষ্টান্ত সিদ্ধান্ত বলে আমরা সেসময় শুভেচ্ছা-অভিনন্দন জানালেও তখন কয়েকটি ইসলামিক সংগঠনসহ মৌলবাদগোষ্ঠী তার প্রধান বিচারপতি হওয়া নিয়ে বিরোধীতা করেছিল। মিছিল-মিটিং করে সরকারের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করার উপক্রম! শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনাকেও ব্যক্তিগতভাবে আক্রমন করে অনেকে সমালোচনা করেছে। আমাদের অনেককে ব্যক্তিগতভাবে ভারতের দালাল, মালাউনের পা-চাটা চামচা বলেও গালাগালি করতে দ্ধিধা করেনি। আর এইসবের পিছনে ইন্দন জুগিয়েছে বিএনপি-জামাত।

 

এসকে সিনহা সাহেবকে প্রধান বিচারপতি করা নিয়ে নব্বইভাগ মুসলমানের দেশে হিন্দু-মালাউনের বিচার আল্লাহ মানবে না মর্মে প্রচার-প্রকাশ করে তখন বিএনপি-জামাত মৌলবাদগোষ্ঠীকে উস্কে দিয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে বিএনপির অনেক নেতার সাথে আলাপকালে তাদের একটাই কথা ছিল, ভাই! আপনার নেত্রী শেখ হাসিনা এ-কী করল? একটা হিন্দু লোককে মুসলমানের দেশে প্রধান বিচারপতি বানাল? শেষ পর্যন্ত দেশটা হিন্দুদের কাছে জিম্মি করে দিয়েছে(!)- এই ধরনের কথা বলেও তখন নানা রকমের সমালোচনা করেছিল।

এ নিয়ে আমরা যত রকমের যুক্তি-তর্কই উপস্থাপন করেছি, শেষ বেলায় তাদের একটাই বাণী, না-না ভাই! এটা শেখ হাসিনা ঠিক করেনি। বাংলাদেশে আল্লাহ্’র গজব পড়বে ইত্যাদি ইত্যাদি!

অবাক করার বিষয়, সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা সাহেবও তখন বিএনপি-জামাতের সেই আলোচনা-সমালোচনাকে নিজ উদ্যোগে ও নিজ প্রচেষ্টায় টেনে আনতে-আনতে শেষ পর্যন্ত ১১ নভেম্বর শনিবারের শনির দশায় পরিণত করেছেন। তিনি সাংবিধানিক পদে থাকার পরেও বার বার নিজেই নিজের সংবাদ শিরোনাম তৈরি করেছেন গণমাধ্যমে। শুধু যে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তাও নয়। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমেও তিনি সব সময় থাকতে ভালোবাসতেন। তাই একের পর এক বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি করে নিজেকে ফোকাসে রেখেছেন।

পাঠক! এখানে একটি ব্যাপার নিয়ে আপনিও নিজগুণে ভেবে দেখুন, নিজের একান্ত পারিবারিক কথাগুলো যখন বাইরে মাইক ব্যবহার করে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে পাড়া-মহল্লার মানুষদের জানাবেন, তখন আপনার ও আপনার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রতি সাধারণ মানুষের ভিতর কী ধারণা জন্ম নিবে?

আমরা ছোটকাল থেকেই জেনে এসেছি, একান্ত সমস্যাগুলো একান্তভাবে মিটিয়ে ফেলা উত্তম। আর যেখানে দেশের বিচার বিভাগ! যার সাথে পুরো জাতির আস্তা-বিশ্বাস জড়িত! দেশের মানুষের ভরসার স্থান। যেখানে মানুষের বঞ্চিত অধিকার ফিরে পাওয়া যায়। সকল মানুষ যেখানে ন্যায় বিচার পায়; সে বিচার বিভাগের ভিতরকার কথাগুলো যখন পাবলিকলি প্রকাশ করা হয় তখন সাধারণ মানুষ কার উপর নিজের শেষ ভরসাটুকু রাখবে? বিচার বিভাগের উপর আমার-আপনার মর্যাদাবোধটুকু কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

এসকে সিনহা সাহেব কতিপয় রাজনীতিবিদদের মত বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে কিছু মানুষের হাত তালি পেয়েছেন সত্য কিন্তু, সর্বনাশের কাজ বিচারবিভাগকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করে গেছেন। সাধারণ মানুষের ভিতরে ভয়-উৎকন্ঠা ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আর এখানেই তিনি থেমে থাকেননি, বিচার বিভাগের বড় কর্তা অর্থাৎ প্রধান বিচারপতির মত সাংবিধানিক পদে থেকে সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে শেষ বেলায় তিনিও একজন দুর্নীতিবাজ হিসেবে (তার বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে ১১টি দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে) সমাজ-রাষ্ট্রের কাছে অভিযুক্ত হয়েছেন।

এটা জাতির জন্য অভিশাপ! একজন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এক-দুইটি নয়, ১১টি দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের জনগণের আস্তা-বিশ্বাসের জায়গাটি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা অতি সহসায় অনুমান করা যায় যখন উত্থাপিত ১১টি অভিযোগের সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা না পেয়ে এসকে সিনহার সাথে বসতে রাজি নয় বলে স্পষ্ট জানিয়েছিল তার সহকর্মী অন্যসব বিচারপতিগণ।

আবার এদিকে প্রধান বিচারপতির শপথবাক্য পাঠ করার পর থেকে সরকার প্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘুমিয়ে পড়া সমালোচনাকারী মৌলবাদ অপশক্তিকে তার নিজের একক প্রচেষ্টায় রীতিমত টেনে জাগিয়ে তুলেছেন পদত্যাগ করা মাননীয় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। তিনি কারো সাথে আলাপ-আলোচনা ছাড়াই সুপ্রিমকোর্ট প্রবেশমুখে ন্যায় বিচারের প্রতীক গ্রীক দেবীর ভাস্কর্যকে স্থাপন করে তার সেই ধারাবাহিক সংবাদ শিরোনামের পাশাপাশি দুইভাগে বিভক্ত করে জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন।

রাজনীতিবিদ থেকে আরম্ভ করে দেশের সুশীল সমাজ ভাস্কর্য নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তথ্য-যুক্তি দিয়ে পরিবেশ শান্ত করতে চাইলেও এসকে সিনহা সাহেব মনে হয় অশান্তই পছন্দ করতেন। তাই ওই ভাস্কর্য সরিয়ে অ্যানেক্স ভবনের সামনে প্রতিস্থাপন করে মৌলবাদ অপশক্তিকে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রাখার সুযোগ করে দিয়েছেন। আর এই সুযোগ লুফে নিল বিএনপি-জামাত-হেফাজতসহ মৌলবাদ অপশক্তি।

এখানেও বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দক্ষতা-ভিজ্ঞতার সুকৌশল ব্যবহার করে দেশ-জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করলেন। তখনও দেশের কিছু মানুষ শেখ হাসিনার সমালোচনা করেছিল। এসকে সিনহার ব্যাপারে মৌলবাদীরা বলেছিল- শেখ হাসিনা দেশটাকে হিন্দুদের কাছে বর্গা দিয়েছে আর প্রগতিশীলরা বলেছিল- শেখ হাসিনা মৌলবাদীদের কাছে মাথা নত করেছে। ভোটের রাজনীতিতে আঁতাত করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

পাঠক! এখানে আঁতাত করেছে কে? শেখ হাসিনা? না এসকে সিনহা?-এই ধরনের প্রশ্ন আপনার মনে আসতেই পারে। আর আপনিও এসকে সিনহার এক শনিবার থেকে আরেক শনিবারের সংবাদ শিরোনামের লাইন বাই লাইন ধরে পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট তথ্য-উপাত্ত খুজে পাবেন। যে বিএনপি-জামাত পরিকল্পিতভাবে মৌলবাদগোষ্ঠীকে উস্কে দিয়ে হিন্দু ধর্মের এসকে সিনহাকে কেন প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে মর্মে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার অপচেষ্ঠায় লিপ্ত ছিল; সেই বিএনপি প্রকাশ্যে দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতির পক্ষ অবলম্বন করে বক্তব্য-বিবৃতিসহ মাঠে আন্দোলন-সংগ্রামও করেছে। দেশটা হিন্দুদের কাছে বর্গা দিয়েছে বলে বিপুল সংখ্যক মুসলমান জনগণের কাছে ভ্রান্ত বার্তা দিয়ে বিভ্রান্ত করে যারা সরকার পতনের চেষ্টা করেছিল; আবার তারাই এসকে সিনহার পক্ষে বড়-বড় কথা বলেছে! ঈদগাহ-এর পাশে গ্রীক দেবী ভাস্কর্য স্থাপন করা নিয়ে মুসলমানের নামাজ হবে না বলে যারা নোংরা ফতুয়া দিয়ে শেখ হাসিনার পতন চেয়েছিল; তখন তারাও একজোট হয়ে এসকে সিনহার পক্ষে উকালতি করেছে।

সত্য অনেক সময় তার তিক্ত স্বাধ গ্রহণে বাধ্য করে। যেমন, ছুটিতে গিয়ে বিদেশের মাটিতে বিএনপির এক নেতার বাসায় রাজকীয় আপ্যায়ণ গ্রহণ করে কে বা কারা দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল তা স্বয়ং সুরেন্দ্র কুমার সিনহা নিজেই সামনে নিয়ে আসলেন। কে কখন কার সাথে আঁতাত করেছে, তখন তাও স্পষ্ট করলেন এসকে সিনহা সাহেব। তার উপর বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত তার করা দুর্নীতির সংবাদ, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার নিজের শান্তি কমিটির সদস্য থাকার স্বীকারোক্তি, বিচারাধীন মানবতাবিরোধী অপরাধীর পরিবারের সাথে বিভিন্ন সময় বিভিন্নস্থানে গোপন বৈঠক এবং সর্বপরি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনসহ সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা না পেয়ে তারই সহকর্মীরা তার সাথে এজলাসে বসতে নারাজির পরিপ্রেক্ষিতে এখন আপনাকেই বুঝে নিতে হবে, প্রকৃত পক্ষে কে আঁতাত করেছিল।

আরেকটু গভীরে গেলে ৭৯৯ পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণে দেখবেন জিয়াউর রহমানকে অবৈধ এবং বিএনপি অবৈধ সন্তান বলাসহ জিয়া ও বিএনপির শাসনামল নিয়ে যে ধরনের পর্যবেক্ষন তুলে ধরেছেন, সেগুলো সত্য না হলে প্রতিবাদ বা রিভিউ করার মাধ্যমে প্রত্যাহারের দাবি জানাত বিএনপি। আর অন্যদিকে পরিকল্পিতভাবে বিএনপি-জামাত প্রধান বিচারপতির সাথে আঁতাত করেছে বলেই এই ধরনের পর্যবেক্ষণের পরেও শুধু ব্যক্তিগত নয় দলীয়ভাবেও এসকে সিনহার পক্ষ অবলম্বন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত না বিএনপি।

পদত্যাগ করার পর অনেক দিন গড়িয়ে গেল। এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সময় সরকারের। উত্থাপিত ১১টি অভিযোগ তদন্ত করে তার অপরাধের সঠিক তথ্য-উপাত্ত জাতির সামনে তুলে ধরা উচিত। শুধু প্রচার-প্রকাশ বা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না, অপরাধীর অপরাধের প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইন ও সংবিধান যদি সকলের জন্য সমান বিধান সৃষ্টি করে থাকে তাহলে বিচার বিভাগের মর্যাদা ও আগত অপরাধ রোধ করতে এবং সর্বপরি একজন অপরাধীর বিচার করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

এসকে সিনহার প্রধান বিচারপতির শপথ গ্রহণ-পদত্যাগ করা এক শনিবার হতে অন্য শনিবারের মাঝে ১ হাজার ৩০ দিনের নিজের রচিত কলঙ্কিত অধ্যায় এমনিতে জাতিকে যথেষ্ট পীড়া দিয়েছে। আবার তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে বিচার করার চিন্তা-ভাবনার আশ্বাসও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে। কিন্তু সে প্রক্রিয়া জাতি আদৌ দেখতে পায়নি। তাই একটা সংশয় তৈরি হয়েছে। আদৌ কী এসকে সিনহার অপরাধের বিচার হবে? সরকার কী বিচার করতে পারবে?

দেশের জনগণ চায়- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারকেই কাজ করতে হবে। দেশের মানুষের আস্তা-বিশ্বাসের শেষ জায়গাটুকু পবিত্র ও শক্তিশালী করতে হবে। জনগণের বঞ্চিত অধিকার ফিরে পাওয়ার সেই বিচারালয়ের বিচারকগণ তাদের সাংবিধানিক পবিত্র দায়িত্ব কলঙ্কমুক্ত রাখার জন্য আন্তরিক ও ন্যায়পরায়ণ হবে। দেশের প্রধান বিচারপতির নয়, একজন অপরাধীর অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করবে সরকার; এটাই জাতির প্রত্যাশা।

সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)।