ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

আমি জীবনের মুখোমুখী সাহসের সঙ্গে দাড়াবো। যে আমাকে প্রেরণা দিয়েছে সে প্রেরণাময়ীর কাছে যাব। যে আমাকে গৃহপালিত মানুষে রূপান্তরিত করতে চায়, তার কাছে যাবো না। আমার বণ্যতা, আমার উদারতা, উদ্দামতা, অস্থিরতার যথাযথ ব্যাখ্যা করা উচিত। কি হতে চাই, কতটুকু যোগ্যতা আছে, পরিবেশ কতটুকু সুযোগ দেবে এবং পরিবেশকে কত দূর ভাঙতে হবে সেটিই দেখার বিষয়। ( আহমদ ছফার ডাইরী থেকে)

লিখতে বসেছি হুমায়ুন নিয়ে কিন্তু আহমদ ছফা কেন আসবে? আহমদ ছফা অবশ্যই আসবে। কারন হুমায়ুন আহমদ ছফা’র সৃষ্টি। হি ইজ পার্টলি মাই ক্রিয়েশন আহমদ ছফা দাবী করতেন। করবেন নাই বা কেন? হুমায়ূনেরও তাতে কোনদিন দ্বিমত হয়নি। আহমদ ছফা নিয়ে বলতে গিয়ে হুমায়ুন বলতেন ছফা ভাই ছিলেন আমার MENTOR। ছফা ভাই এমন একজন মানুষ যিনি নিমেষেই উত্তেজনা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন। ছফা ভাই হুমায়ুনকে বললেন গল্প লিখতে হবে। রোজ রাতে একটা করে। ছফা ভাইয়ের কথা মানেই আদেশ। হুমায়ুন রাত জেগে জেগে গল্প লেখা শুরু করে দিল। তার প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে প্রকাশের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন ছফা। লেখক শিবিরের প্রধান হওয়ায় নন্দিত নরকে কে বছরের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের পুরস্কার দিয়ে দিয়েছিলেন। নন্দিতে নরকের জন্য আহমেদ শরীফের যে ভূমিকা তাও ছফার সৌজন্যে পাওয়া। একজন তরুন ওপৌন্যাসিকের ক্ষেত্রে যা ছিল অকল্পনীয়। তবে হুমায়ুন আহমেদ ছফার বলয়ে থাকেন নি। তার এক সময় সন্দেহ হল ছফা যে জগতে বাস করেন তা বাস্তব জগত থেকে অনেক দূরে। তার রিয়েলিটি আর হুমায়ুনের রিয়েলিটি এক নয়। আহমদ ছফার ভাবনা দর্শন রিয়েলিটি নিয়ে লিখতে বসলে হুমায়ুনকে নিয়ে আর কিছু লেখা হবে না। তাই এই প্রসঙ্গ থাক। হুমায়ুনের মোহ ভঙ্গ হল। হুমায়ুনকে নিয়ে ছফা ভাইয়ের অনেক স্বপ্ন ছিল। হুমায়ুন নিজেই স্বীকার করেছেন সে তার কোনটাই পূরন করতে পারেন নি।

আহমেদ ছফাও হুমায়ুনের ভিতরে চেখভের মত একটা প্রতিভার সন্ধান করেছিলেন। কিন্তু তার আশা পূর্ণ হয়নি। হুমায়ুনের লেখা সম্পর্কে বলতেন – জামাকাপড় তো বানায়, কিন্তু প্রাণ দিতে পারে না, কী একটা মুশকিল!

হুমায়ুনকে তিনি শরৎচন্দ্রের চেয়েও জনপ্রিয় সার্টিফিকেট অনেক আগেই দিয়ে গেছেন। আশ্চর্য আমরা সুনিলের কাছ থেকে ফোন করে সেই সার্টিফিকেট নেওয়ার জন্য দৌড়াদৌড়ি করছি। আমাদের পশ্চিমা প্রীতি বোধহয় কোনদিনই যাবে না। আনন্দবাজারে টুকরো খবরে হুমায়ুনের মৃত্যূ সংবাদ পড়েও বোধদয় হবে না। হুমায়ুন আহমেদের সাথে সমসাময়িক লেখকদের তুলনায় ছফার বক্তব্য ছিল “হুমায়ূন আহমেদ একবিন্দুও সেক্স না লিখে শ্রেষ্ঠ বাজারসফল বই লিখছে, অন্যেরা সেক্স দিয়ে এইটার সাথে কমপিট করতে চাইছে। হুমায়ূন আহমেদ যত কিছুই করুক না কেন, তার নষ্টামিটা অন্য জায়গায়। তার নষ্টামিটা ব্রেনে। অন্যদের নষ্টামিটা শিশ্নে।” হুমায়ুন কেন টাকার জন্য বাজার লেখক হতে গেলেন তার একটা ব্যাখ্যাও ছফা দিয়েছেন – “উপর্যুপরি সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরাজয় সব মিলিয়ে এখানে যে চিন্তাহীন অরাজক পরিস্থিতি _ হুমায়ূন সেই সময়ের প্রোডাক্ট।”

নন্দিত নরকে বা শঙ্খনীল কারাগার তার দুই শ্রেষ্ঠ উপন্যাস অবশ্য তাকে জনপ্রিয় করে নি। তাকে জনপ্রিয় করেছিল বিচিত্রায় প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস অচিনপুর। যার জন্য তিনি তিনশ টাকা পেয়েছিলেন। নন্দিত নরকে এবং শঙ্খনীল কারাগারের জন্য রয়েলিটি হিসাবে পেয়েছিলেন চারশ টাকা। পাঠক হইত ভাবছেন টাকার অঙ্কগুলো বলার দরকার কি? বলার দরকার আছে। কারন হুমায়ুন টাকার জন্য লিখতেন। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনিও অস্বীকার করেন নি। এ প্রসঙ্গে তার জীবনের প্রথম গল্পটা শোনা যাক।

হুমায়ুনের বাসায় টি.ভি নেই। তার দুই মেয়ে নোভা, শীলা পাশের বাসায় টি.ভি দেখতে যায়। একদিন খুব মন খারাপ করে তারা বাসায় ফিরে আসল। পাশের বাড়ীতে মেহমান এসেছে বলে টি.ভি দেখতে দেবে না। এখন একটু বলি এমন ঘটনা আমার জীবনেও ঘটেছে। আমাদের টি.ভি ছিল না। বাড়ীওয়ালার বাসায় যেতাম টি.ভি দেখতে। ছোটবেলায় বুঝতাম না কিন্তু এখন বুঝি কি অপমানের মধ্যে দিয়ে না আমাকে টি.ভি দেখতে দিত ওরা। ওরা সবাই বিছানায় বসত। আমি বসতে দিত নীচে মেঝেতে। থাক সে প্রসঙ্গ আমরা হুমায়ুনের গল্পে ফিরে আসি। হুমায়ুনের বড় মেয়ে জিদ ধরল তাদের একটা রঙিন টেলিভিশন কিনে দিতে হবে। হুমায়ুন সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য লিখলেন কালজয়ী ধারাবাহিক নাটক ” এই সব দিন রাত্রি”। একটা রঙিন টি.ভির জন্য লেখা হয়েছিল এই নাটক। সেই নাটকে টুনির ক্যান্সার হয়েছিল। আমাদের হুমায়ুনও ক্যান্সারে চলে গেলেন। হুমায়ুন যদি বাজার লেখক না হতেন, অর্থ উপার্জনের জন্য না লিখতেন আমরা হয়ত বি.টি.ভিতে এই কালজয়ী নাটকটি দেখতে পেতাম না। যা আমাদের দর্শকদের কোলকাতা থেকে মুখ ফিরিয়ে দিয়েছিল। নদীয়ার ভাষা থেকে বাংলাদেশের ভাষা বলতে শিখিয়েছিল। বি.টি.ভি তেও শুরু হয়েছিল একটা নতুন অধ্যায়। টাকা নিয়ে হুমায়ুনের যুক্তি ছিল একজন লেখক চাদেঁর আলো খেয়ে বাচেন না। তাকে প্রোটিন এবং কার্বোহাইড্রেট খেতে হয়।

সিরাজুল ইসলাম চৌধূরী বলতেন, সাহিত্যে মধ্যবিত্তের কর্তৃত থাকবেই। আসলে সাহিত্যের বিশেষ প্রয়োজন মধ্যবিত্তের জন্যই. উচ্চবিত্তের জন্য ভিন্ন প্রকার আমোদ-আনন্দের পথ খোলা আছে, নিম্নবিত্তের তাই, মধ্যবিত্তের এদিক সেদিক যাওয়ার পথ খোলা নেই। এ কথা কি অস্বীকার করার উপায় আছে হুমায়ুন সেই মধ্যবিত্তেরই প্রতিনিধিত্ব করতেন। মধ্যবিত্তের সুঃখ, দুঃখ, আশা, আকাঙ্খা, স্বপ্ন, আনন্দ, নিরানন্দ, চাওয়া, পাওয়া, অর্থহীন প্রলাপ, মূল্যবোধ, সংশয়, যুক্তি, তর্ক, সময় ক্ষেপন, মিরাকলের প্রত্যাশা, অনিশ্চয়তা, আ্যান্টি লজিক, ব্যক্তিসাতন্ত্র বোধ, আত্বশ্লেঘা, অহামিকা, অভিমান, কৌতুকবোধ কি না উঠে আসে নি হুমায়ুনের লেখায়? আর মধ্যবিত্তের সাহিত্যই যদি প্রধান সাহিত্যের মাপকাঠি হয় তবে হুমায়ুন সেই মধ্যবিত্তের চেতনা ধারন করে আনার জন্য কেন টিকে থাকবেন না?

হুমায়ুনের লেখায় কি শুধুই মধ্যবিত্তের কাহিনী? উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্তের কি সেখানে স্থান নেই? আবার সিরাজুল ইসলামের কাছে ফিরে যায়। তিনি বলতে চান কৌতুক ও বাগবৈদগ্ধতার একটা ভূমিকা এই যে, তারা জীবনের কুৎসিত সত্যগুলোকে চোখের আড়াল করে রাখে। একটা ঢাকনা চেপে ধরে সেই মস্ত পাত্রের উপর যার ভিতর অপ্রিয় ও অসুন্দর সত্যগুলো কিলবিল করছে। সব রচনাতেই দেখা যায় অভাবপীড়িত মানুষকে অবলোকন করা হয়েছে দূর থেকে। সে জীবনের সাথে একাত্ববোধের ছাপ খুব অল্প। কৃষক কৃষক হিসাবেই সুখি হোক, কৃষিকার্য লেখনকার্যের মতই গুরত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ হয়ে উঠুক এই ইচ্ছাটা সাহিত্যে ফুটে ওঠে নি। বরং কৃষকের ছেলে মেধা থাকা সত্বেও কেন ডাক্তার হলো না, ধনীর দুলালীকে বিয়ে করতে পারল না সেই নিয়েই সাহিত্য গড়ে উঠেছে। এর ভিতরে একটা অসৎ সদিচ্ছা কাজ করছে যে দুঃখী দুঃখীই থাকুক, তাহলে আমরা আমাদের সুখজনিত সৌভাগ্যটা বুঝতে পারব। এবং দুঃখীর জন্য দুঃখ প্রকাশে ভাবালু হয়ে নৈতিক পরিতৃপ্তি লাভ করে সাহিত্য রচনা করব। খাটিঁ মধ্যবিত্ত সব সময় উপরে তাকিয়ে থাকে, নীচে কে তার ভয় পাছে সে ধরা পড়ে যায় যে সে নীচ থেকে বেশী উচুঁতে নয়। বৃত্তের ভিতরে আছি, অথচ বৃত্তের ভেতর থেকে সাহিত্য হয় না, জীবনের সাথে জীবনের যোগ সাহিত্য সৃষ্টির এ হল পয়লা শর্ত।

হুমায়ুন কি বৃত্ত ভাঙতে পেরেছিলেন? বৃত্ত নিয়ে হুমায়ুন বলেছিলেন প্রতিটা মানুষের আলাদা আলাদা বৃত্ত থাকে। কেউ সেই বৃত্ত অতিক্রম করতে পারে না। উনিও পারেন নি। কিম্বা হয়ত পারার চেষ্টা করেন নি। নিজের বৃত্তে থেকেই লিখে গেছেন। দাবী করেন নি কখনো নিজেকে উপ‌ন্যাসিক বলে। বরং বলতেন ফিকশন রাইটার। কারন উপন্যাসের সংজ্ঞা কি তা তিনি শেষ অবধি জানতে পারেন নি। তাই নিজের মত করে উপন্যাসের সংজ্ঞা দাড় করিয়েছেন। কিন্তু আমরা যখন তার অচিনপুর উপন্যাসটা দেখি তখন কি মনে হয় না তিনি বৃত্ত ভাঙতে পেরেছিলেন। সিরাজুল ইসলামের সব দাবীই কি তার অচিনপুর আর ফেরা উপন্যাস দুটি পূরন করে না।

অচিনপুর পুরোটা গ্রামীন আবহে লেখা একটা উপ‌্যাখ্যান। সেখানে নবুমামা আছে, বাদশা মামা আছে, নানা জান আছে, লাল মামী আছে। যে যার অবস্থানেই জীবনের সুঃখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। তাদের শহরমুখিতা নেই। তথাকথিত উচ্চাশা নেই। সিরাজুল ইসলাম যেমনটি চাইছিলেন কৃষক কৃষক হিসাবেই সুখি হবে সেমনটির প্রতিফলনই কি অচিনপুরে ঘটে নি। একথা সত্য সেখানে কৌতুক ও বাগবৈদগ্ধতার প্রাচুর্য আছে। কিন্তু তা কি আমাদের গ্রামীন আবহের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়। উপন্যাসে
“মাঠে সে রাতে প্রচুর জোছনা হয়েছে। চকচক করছে চারিদিক। ঠান্ডা একটা বাতাস বইছে। নবুমামা চেচিয়ে বলল – “কি জোছনা! খেতে ইচ্ছা হয়। মনে হয় কপকপ করে খেয়ে ফেলি। নবুমামা হা করে খাবার ভঙ্গী করতে লাগল। বিস্মিত হয়ে আমি তার আনন্দ দেখলাম।” জোছনার এমন সরল বর্ণনা পাঠককে কোথায় নিয়ে যায়। আমাদেরও কি নবুমামার মত সব সময়কে স্থির করে জোছনা খাওয়ার অদম্য বাসনা তৈরী করে না। আবার লাল মামী যখন গ্রাম বাংলার চিরচরিত নারীর প্রতিনিধিত্ব না করে একটা সমাজিক বিপ্লবের নারী স্বাধিনতার ডাক দেই তাতে কি সমাজের ভীত কেপেঁ ওঠে না।

নবুমামা দৌড়ে দেশলাই নিয়ে আসলেন। মামি আমাদের দুজনের সতম্ভিত চোখের সামনে ফস করে একটা বার্ডসাই সিগারেট ধরিয়ে টানতে থাকেন। আমাদের দুজনের নিঃশ্বাস পড়ে না। মামি বললেন, এই দেখ যত টানছি তত ছোট হচ্ছে।
….
মামির মুখের গন্ধ দূর করার জন্য পানি আনতে হয়। এলাচ দানা আনতে হয়। সেই সঙ্গে মামির প্রতি আমাদের নিষিদ্ধ আর্কষন জড় হতে থাকে।”

তবে হ্যা সেখানে জীবনের সবচেয়ে প্রচন্ড আর্থিক অভাবের চিত্রায়ন নেই। পুর্জিঁবাদী বা সমাজপতিদের বিরুদ্ধে আপামর জনগণের বিপ্লব নেই। নেই দারিদ্রতার চিত্রায়ন। যে আর্থিক অভাবের চিত্রায়ন হুমায়ুন করেছেন ফেরা তে। এইখানে গণমানুষের প্রতিবাদী চরিত্র আছে। আছে যৌক্তিক উপলদ্ধি। এবং এটাও গ্রামীন আবহে নির্মিত উপন্যাস

হুমায়ুনের ফেরা। কি নেই এই উপন্যাসে। কিছু অংশ তুলে ধরছি। “ভাত না খেয়ে বাচাঁর রহস্য সোহগীর লোকজনের জানা নেই। চৈত্র মাসের দারুন অভাবের সময়ও এরা ফেলে ছড়িয়ে তিন বেলা ভাত খাই। এবার কার্তিক মাসেই কারও ঘরে এক দানা চাল নেই। জমি ঠিক ঠাক করার সময় এসে গেছে। বীজ ধান দরকার। হালের গরুর দরকার। সিরাজ মিঞার মত সম্ভ্রান্ত চাষীও তার কিনে রাখা ঢেউ টিন জলের দামে বিক্রি করে দিল।

ঘরে ঘরে অভাব। ভেজা ধান শুকিয়ে যে চাল করা হয়েছে তাতে উৎকট গন্ধ। পেটে সহ্য হয় না। মোহন গন্জ থেকে আটা এসেছে। আটার রুটি কারও মুখে রোচে না। কেউ খেতে চাই না। লগ্নির কারবারীরা চড়া সুদে টাকা ধার দিতে শুরু করল।

ঠিক এই সময় কলেরা দেখা দিল। প্রথম মারা গেল ডাক্তার ফজলুল করিম সাহেবের কম্পাউন্ডারটি। তারপরই এক সাথে পাচজন অসুখে পড়ল। আমিন ডাক্তার দিশাহারা হয়ে পড়লেন। অষুধ পত্র নেই, খাবার নেই, কিভাবে কি হবে?
……

ভাতের কষ্ট বড় কষ্ট। নরুউদ্দিনের পেটে সারাক্ষনের ভাতের খিদা লেগে থাকে। শরিফা প্রায়ই বলে আজরফ টেকা পয়সা নিয়া আসুক, দুই বেলা ভাত রানমু।
কোনদিন আইবো?

উপন্যাসে এক সময় নুরুকে মাছ চুরির অপবাদ দেওয়া। মারধরও করে। সমাজের গন্যমান্য ব্যক্তির এই কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ায় আমিন ডাক্তার। প্রতিবাদে অনশানে বসে। অবস্থান ধর্মঘাট করে। এক সময় বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। নায্য হিসাবের দাবীতে নিজাম সরকারের মাছের খোলায় চড়াও হয় গ্রামবাসী। চুক্তি অনুযায়ি 30 ভাগ মাছ প্রাপ্তির দাবীতে। দুটি খুনও হয়ে যায়। এক সময় মোহন গন্জথানার সেকেন্ড অফিসার কোমরে দড়ি বেধে আমিন ডাক্তারকে থানায় নিয়ে যায়। ঘটনার এখানেই শেষ না। হুমায়ুন চমক দিতে ভালবাসেন। সরকার বাড়ীতে একটা নববধূকে মেরে গাঙে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই তথ্য শেষে উঠে আসে। হুমায়ুনের ফেরা কালজয়ী উপন্যাস হয়ে বাংলা সাহিত্যে কেন টিকে থাকবে না?

মোটাদাগে বাংলা সাহিত্য বঙ্কিমের হাত ধরে যে পথ চলা শুরু করেছিল রবীন্দ্রভাবনায় সমৃদ্ধ হয়ে শরৎ এর হাতে এসে আপামর জণগণের দোড়গোড়ায় চলে আসে। আপামর জনগণের দোড়গোড়ায় পৌছানোর কারনেই শরৎ বাংলা সাহিত্য সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকে পরিণত হন। এখন জনপ্রিয় লেখক ছিলেন বলেই শরৎ আজকে একশ বছরে অচল হয়ে যেমন জাননি তেমনি শরৎকেও জনপ্রিয়তাই ছাপিয়ে যাওয়া হুমায়ুনও হারিয়ে যবেন না একথা হয়ত ছেলেমানুষী হয়ে যাবে। তবু শরৎ এর দেবদাস পড়ে এখনও যেমন পাঠক অশ্রুজ্বলে ভাসে ভবিষ্যতে হুমায়ুনের নবনী বা কৃষ্ঞপক্ষের অরু/মুহিবের কাহীনি পড়েও পাঠক অশ্রু বির্সজন দেবে নির্দিদ্ধায় বলা যায়।

মানুষের হৃদয়বৃত্তি জাগ্রত করাই জনপ্রিয়তার মূল মন্ত্র। আর জনপ্রিয় লেখকরা বিশাল পাঠক গোষ্ঠির পাঠ্যাভাস তৈরী করে। হুমায়ুন লক্ষ মানুষের ভিতরে পাঠ্যাভাস পড়ে তুলেছিলেন এ কথা নতুন করে আলোচনার কিছু নেই কিন্তু তিনি পাঠককে যে আরও কিছু জানতে, আরও মহত্তম সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ত হতে কৌতিহলী করতেন সে কথা না বললেই না। উদাহরন হিসাবে হুমায়ুনের মাতাল হাওয়াকে ধরা যাক। মাতাল হাওয়া অসম্পূর্ণ উপন্যাস। উপন্যাসে আমরা যে গল্প খুজিঁ তার পুরোটাই হয়ত আছে কিন্তু যে বিশেষ সময়ের প্রেক্ষিতে গল্পের কাহীনি সেই সময়টা পাঠকের চোখে পুরোপুরি ধরা পরে না। ধরে পরে না তবে হুমায়ুনের সুনিপুন লেখনীর জোরে পাঠকে কৌতুহলী করে জানতে 69 এর কথা। পাঠক হুমায়ুনের থেকে গল্পের রসটা পেল সাথে পেল ইতিহাস জানার লিপ্সা। যেমনটি তার অনেক উপন্যাসের ভিতর ঢুকিয়ে দেয়া কালউর্ত্তিন সাহিত্য কর্মের উদ্ধৃতি পাঠককে তা খুজেঁ বের করে পড়ার ইচ্ছা জাগায়।

হাসান আজিজুল হকের বিশ্বাস “সাহিত্য সমাজের অবস্থাটাকে খুব সরাসরি তুলে ধরতে পারে, সরাসরি বিশ্লেশনের কাজটি করতে পারে তার সাথে মানুষের আবেগের যোগোযোগ ঘটাতে পারে। ফলে মানুষের চেতনা অনেক শানিত হতে পারে, যে যেতনা অবশ্যই সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।” উপন্যাস যদি শুধু কাল্পনিক হয় তবে তার কোন তাৎপর্য থাকে না। উপন্যাসর গল্পকে অবশ্যই হতে একটা বিশেষ সময়ের সমাজের গল্প, বাংলাদেশের 1975-2012 সময়কালে মধ্যবিত্তের ব্যাপক অংশের মন মানসিকতা, জীবন যাপন, চিন্তার পরিধি কেমন ছিল জানতে চাইলে সেরা অবলম্বন হবে হুমায়ুন।

হুমায়ুন সমাজ পরির্বতনে ভূমিকা রাখতে পারেনি। কিম্বা বদরুদ্দিন উমর যেমনটি চেয়েছেন সাহিত্য হচ্ছে সমাজ বিকাশের হাতিয়ার, হুমায়ুনের সাহিত্যভাবনা সেই হাতিয়ার হতে পারে নি। কিন্তু যাদের সাহিত্য সমাজ পরির্বতনে ভূমিকা রাখবে, যাদের সাহিত্য সমাজের বিকাশে ভূমিকা রাখবে তাদের দোরগোড়ায় পাঠককে পৌছে দিয়েছেন। পাঠকের মনোবল কখনো নষ্ট করেন নি। কিভাবে করতে হবে তার দিক নির্দেশনা হয়ত নেই তবে কি করতে হবে তার যথেষ্ট প্রচেষ্টা তিনি রেখেছেন। প্রিয়তমেষুতে আমরা দেখি একাকী অনবদ্য মনোবল নিয়ে নিশাতে ধর্ষকের বিরুদ্ধে এগিয়ে যাওয়া। তার একটা সাধারন ছোটগল্পের কথায় ধরা যাক। ছুনু মিঞা। ছুনু মিঞার নজর খুবই খারাপ। সে যার দিকে তাকায় তার সর্বনাশ হয়ে যায়। বিষয়টা গ্রামবাসী ভালভাবে দেখেনা। ছুনু মিঞার শাস্তির আয়োজন হয়। সামাজীক কুসংস্কারচ্ছন্নতা আমাদের দীর্ঘ দিনের ব্যাধি। হুমায়ুন ছুনু মিঞার জবানে সে ব্যাধি দূর করতে চাইছেন। “আমার আসলে কোন ক্ষমতা নাই। দুষ্ট লোকে গেরাম ভর্তি। ক্ষমতা থাকলে নজর দিয়া একেবারে শেষ কইরা দিতাম। যেমন ধরেন, আমরার চেয়ারম্যান গণি সাহেব। কত চেষ্টা করছি তারে নজর লাগাইতে। লাগে না।” ছুনু মিঞার আক্ষেপ কি আমাদের অনেকের আক্ষেপ না। যারা এই সমাজের কীট, যারা শোষক, নিপিড়িক তাদের প্রতি আমাদের আজন্ম ঘৃণা, উৎপাটনের আকাঙ্খা হুমায়ুন ধারন করেন নজরের মত অলৌকিক এক অবতারনায়। তিনি সামাজীক বিপ্লবের ডাক সরাসরি দেন না কিন্তু বিপ্লব যারা করবে তাদের পথ পরিষ্কার করেন।

রণেশ দাশগুপ্ত চাইতেন জনসাধারন এবং জনসমাজের গতিপথ ও সম্ভাবনাকে সামনে রেখে উপন্যাস লিখতে ও পড়তে হবে। হুমায়ুন কখনো আশাহতের গল্প শোনাতেন না। তিনি সম্ভাবনার কথায় বলতেন। অন্যদিনের পান্থনিবাস বোর্ডিং হাউসের কথায় আসি। মেস জীবন উপন্যাসের পাতায় এত সাবলীলভাবে কি কেউ কখনো বর্ণনা করেছেন হুমায়ুনের আগে। বেকার তরুনের পথ নির্দেশিকা দেখিয়েছেন। অসম্ভব সম্ভাবনাকে সম্ভব করতে যে মানসিক দৃঢ়তার প্রয়োজন সফিকের মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। “অশ্রু গোপন করবার জন্য সে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে মৃদু স্বরে বলল, শুধু জ্যোতিষার্ণিব কেন তুই নিজেও যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাস আমার তাতে কিছুই যাবে আসবে না। আমি ঠিক উঠে দাড়াব।” এই উঠে দাড়ানোর প্রত্যয় আমাদের গতিপথ এবং সম্ভাবনাকে টিকিয়ে রাখবে।

আহমেদ শরীফ বিশ্বাস করেন গণমানবমুক্তিই তো সব কলাচর্চার লক্ষ্য হওয়া বাঞ্জনীয়। গণমানবমুক্তির অনুপ্রেরণা সবচেয়ে বেশী আমরা কোথায় পাব? পাব আমাদের গৌরবাউজ্জল স্বাধিনতাযুদ্ধে। হুমায়ুন সেই স্বাধিনতাযুদ্ধকে তুলে এনেছেন তার জোছনা ও জননীর গল্পে। যেখানে মুক্তির প্রশ্নের একাত্ববদ্ধ হয়েছিল পুরো জাতি। মুক্তি মিলেছি কি মেলেনি সে প্রশ্ন অবান্তর। কারন মুক্তির যুদ্ধ একটা চলমান প্রক্রিয়া। যার প্রথম শর্ত স্বাধিনতা। আর স্বাধিনতার আকাঙ্খা তৈরী হয় মুক্তির স্বপ্লে। হুমায়ুন সেই মুক্তিযুদ্ধকে, মুক্তির স্বপ্নকে তার লেখনীতে যেভাবে জাগিয়েছেন এ যুদ্ধের পটভূমিকায় খুব কম উপন্যাসেই সেই জাগ্রত সত্বা পাওয়া যায়। পাঠক যখন নীলগন্জের মাওলানা সাহেবের নগ্ন ভাবে শহর প্রদক্ষিনের কথা পড়ে তখন শাষকের বিরুদ্ধে তার ঘৃণা সর্বচ্চো পর্যায়ে পৌছায়। হাছুইন্না গ্রুপের কর্মকান্ড, রফিক কিম্বা ডাকাত হারুন মাঝির যারা সাধারণ গনমানুষ থেকে উঠে এসে অসীম সাহসীকতায় বিপন্ন দেশমাতৃকার পাশে দাড়িয়েছিল গনমানবের মুক্তির প্রশ্নে যারা এগিয়ে যেতে চাই তাদের অনুপ্রেরনা হয়ে থাকবে চিরটাকাল।

এ কথা প্রচলিত সত্য যে আপাতঃদৃষ্টিতে যা ভ্রান্ত মনে হচ্ছে, নিজস্ব সীমাবদ্ধতার বা কুপমন্ডুকতার জন্য আপত্তিকর মনে হচ্ছে, চুড়ান্ত বিশ্লেষনে সময়ের আর্বতনে তা নির্ভূল প্রামনীত হতে পারে। হুমায়ুনের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহীনিগুলো নিয়ে স্থির স্বিদ্ধান্তে পৌছানোর সময় হয়ত আসে নি। কিন্তু সেই কাহীনিতেই বিজ্ঞানের কঠিন কপচানোর বিপরীতে হৃদয়ের সম্পর্কিক্তা সেই সময়ের (যদি সেরকম কিছু হয়েই যায়) হুমায়ুনের লেখা কিছু মানুষকে বুদ্ধির সাথে সাথে হৃদয় দিয়ে বোঝানোর কাজটি করবে। হৃদয় আর বুদ্ধির সংলগ্নতার যে বিকাশ আমাদের প্রয়োজন তা হয়ত বড় পরিসরে না হলেও কিছুটা চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে গৃহানুরাগ ব্যাতিরেকে উপন্যাস অসম্ভব। কিন্তু হুমায়ুনের অমর সৃষ্টি হিমু গৃহঅনুরাগি ছিল না। ছিল গৃহ ত্যাগি। রাজপুত্র সিদ্ধার্থের মত হেরেমে 84 হাজার যুবতি নারীর প্রলোভন এড়িয়ে মুক্তির অনেস্বায় ছুটে চলা এক কালের নাবিকের মত বাঙালীরও গৃহত্যাগী হবার গোপন লিপ্সা আছে দীর্ঘ যুগের। লেখার শুরুতে আহমদ ছফার ডাইরীর কিছু অংশ এনেছিলাম। “আমি জীবনের মুখোমুখী সাহসের সঙ্গে দাড়াবো। যে আমাকে প্রেরণা দিয়েছে সে প্রেরণাময়ীর কাছে যাব। যে আমাকে গৃহপালিত মানুষে রূপান্তরিত করতে চায়, তার কাছে যাবো না।” হুমায়ুন ছফার বলয় থেকে বেড়োতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমার কেন জানি ব্যক্তিগত ধারনা হুমায়ুন ছফার বলয় থেকে বেড়োতে পারেন নি। ছফাকে তিনি যে হন্টন পীর বলতেন তা তিনি হিমুর মধ্যে প্রকাশ করেছেন। প্রফেটিক সত্বার যে অভাব ছফার ছিল হুমায়ুন হিমুকে সেই সত্বা দিয়ে তার মত করে দিয়ে আত্বার শুদ্ধতা জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন। যদিও ছফার দর্শনের ধারে কাছেও হিমু নেই। পাঠকের দোড়গোড়ায় পৌছাতে কিছু অন্যায় যে হুমায়ুন করেন নি তা ভাবার কোন কারন নেই। কিন্তু বাঙালীর হিমু হবার গোপন লিপ্সাকে বের করেছেন। যেমনটি বাংলাদেশের লক্ষাধিককে করেছেন জোছনা প্রেমী। বর্ষাকে উপভোগের যে মন্ত্র হুমায়ুন শিখিয়ে দিয়ে গেছেন সেই মন্ত্রের বীজ রবীন্দ্রনাথও শত চেষ্টায় বোধহয় পারেনি আপামর এত হৃদয়ে প্রবেশ করতে। শুধু হিমুর কারনেই হুমায়ুনকে টিকিয়ে রাখা যায় সাহিত্যে অনন্তকাল। এ এমন এক প্রচেষ্টা যা হাজার বছর লালন করেছে বাঙালী।

শিরোনামে প্রশ্নছিল হুমায়ূন কেন? উত্তর খোজাঁর চেষ্টা করেছি সংক্ষেপে নিজে নিজেই। কোন বস্তুকে ডান দিক থেকে দেখলে তার অবস্থান হয় বায়ে, সেই একই বস্তুকে বা-দিক থেকে দেখলে তার অবস্থান হবে ডানে। এই সাধারন তত্ব আমরা সবাই জানি। তাই হুমায়ুনকে বিশ্লেষনে দেখার দৃষ্টিভঙ্গী একটা বড় নিয়ামক। একথা সত্য যে তার সবলেখায় অমর হবে না। হওয়ারও দরকার নেই। তবে হুমায়ুনকে আমাদের দরকার, আমাদের প্রয়োজনেই দরকার এবং তিনি টিকে থাকবেন কারন আমাদের কে বারংবার ফিরতে হবে হুমায়ুনের কাছে। তারমানে এই না আমরা হুমায়ুনের বলয়ে আবদ্ধ থাকব। হুমায়ুন বলয়ে আবদ্ধ থাকতে পছন্দ করতেন না। হুমায়ুন হবে আমাদের সিঁড়ি। যা আমাদের প‌ৌঁছে দিয়েছে কালজয়ীদের সাহিত্য কর্মে আর ভবিষ্যতে সাহায্য করবে সাহিত্যের মননশীল বিকাশে এবং পাঠকের পূর্নতা লাভের স্তরে পৌছাতে।

**তথ্য উপাত্ত সংগৃহিত