ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

তখন বাংলাদেশের ২৯ রান বাকী। খেলা দেখতে দেখতেই দ্রুত মোজা পড়েনিলাম। কেডস জোড়া দরজার বাইরে রাখলাম আর আগে থেকেই টি-শার্ট আর থ্রি- কোয়াটার প্যান্ট পরেছিলাম। কারণ, বাংলাদেশের জিততে আর অল্প সময় মাত্র। যে কোনো মুহুর্তে খেলা শেষ হবে এবং আমি আর আমার ভাগ্নে আপন, এক দৌড়ে পৌছাবো স্টেডিয়ামের সামনে। আমার বাসা ১০ নম্বর সেকশনের এ ব্লকে। বাসা থেকে দৌড়ে স্টেডিয়ামে যেতে সময় লাগবে মাত্র ৫ মিনিট। কিন্তু ২১৮ রানে মাশরাফি যখন আউট হলো কেনো যেন আর ঠিক থাকতে পারলামনা পায়ের থেকে মোজা খুলে ফেললাম। আমার কাছে মনে হলো আর সম্ভন না কারণ, রাজ্জাকের কাছ থেকে (ব্যাটিংয়ে) আমি কিছু আশা করতে পারিনা। যাই হোক শেষ ওভারে দরকার ৯ রান। বাসার সবাই চুপ। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ যখন অপর প্রান্তে চলে গেলো তখন মনের ভেতরের শেষ আশাটাও মনেহয় নিভে যাচ্ছে। তারপরও যদি কিছু হয়। কিন্ত হলোনা শেষ বলে আর ৪রান হলোনা। হলোনা বাংলাদেশের এশিয়া কাপ জেতা। শুধু বুঝলাম আজ রাতের ঢাকা আর আলোকিত হবেনা। উল্লাসিত আর উচ্ছাসিত সমগ্র বাংলাদেশ চুপ হয়ে গেলো।

১৯৯৭ সালের আইসিসির সেই মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের কিলাত কিলাব মাঠের কথা সবারই (যারা ক্রিকেট ভালোবাসেন) মনে আছে। খেলার ধারাভাষ্য শুনছিলাম ফরিদপুরে গ্রামের বাড়ীতে ১২০টাকা দামের পকেট রেডিওতে। আমি তখন এইচ এসসিতে পড়ি। তখন ঐ রেডিওটি মনে হয় বাংলাদেশে রেকর্ড পরিমান বিক্রি হয়েছে। যাই হোক শান্ত’র এক বলে এক রান দরকার। খেলা বলার বল করলেন শান্ত ব্যাট চালালেন একরান হয়ে গেলো, আমরা যারা বাড়ীতে বসে খেলার ধারাভাষ্য শুনছিলাম দিলাম দৌড় স্কুল মাঠের দিকে, দোকান থেকে রঙ কেনা হলো এবার নিজে ভেজো অপরকে ভেজাও। পাশেই মূল সড়ক। গাড়ী আসছে আর আমরা রঙ মারছি (মাফ করবেন যারা ঐদিন আমার হাতে রঙিন হয়েছেন)। সে কি আনন্দ। সাড়াদিন রঙ মারার পর আমাদের চেহাড়া আর চেনা যাচ্ছিলনা। বিকালে জেলা অফিস থেকে পরিবার পরিকল্পনা অফিসের কর্মকর্তা আসলেন পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক কিছু একটা প্রজেক্টরে দেখাতে। ওনাকে রঙিন করে ঐদিনের কমূসূচী শেষ করা হলো। সেদিন যারা রঙে ভিজেছিলেন তাঁর মধ্যে যারা ক্রিকেট ভালোবাসতেন তারা হয়তো আমাদের মাফ করে দিয়েছেন আর যারা তখনও ক্রিকেট ভালোবাসতেননা তারা হয়তো ২২ মার্চ রাতে আমাদের মাফ করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন।

নাসির যখন রান পাচ্ছিলেন না তখন আমার পরিবারের বেশ কয়েকজন (যারা ক্রিকেট ভালোবাসেন কিন্তু খেলেন না ) বলছিলেন ও আউট হয়ে যায়না কেনো? আমি তাদের বলেছি একজন ব্যাটসম্যান ক্রিজে থাকলে রান আসবেই তা এখনই হোক অথবা কয়েকবল পরে হোক। কিন্ত যে চাপে দর্শক চাচ্ছিলেন না নাসির রান না করতে পারলে আউট হয়ে যাক, সম্ভবত সেই চাপেই নাসির নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নাই। রানের জন্য পাগল হয়ে শেষ পর্যন্ত আউট হয়েছেন। আসলে এতো চাপে দর্শক হয়ে আমরা নিজেদের যখন ঠিক রাথতে পারিনা সেখানে ওরা অনেকটাই সামাল দিয়ে যাচ্ছিলো। হয়তো শেষ হাসিটা আমরা হাসতে পারিনি। ভুন্ডুল হয়েছে সমগ্র বাংলাদেশের জয়ের আনন্দ। হয়নি উম্মাদনা। শুধু একটাই আহাজারি …. ইশ…. কি হলো….।

মাশরাফির সাক্ষাৎকারের একটা কথা আমার খুব ভালো লেগেছে। আমাদের (বাংলাদেশ দলের) এখন থেকে এরকম পরিস্থিতে মাঝে মধ্যেই পরতে হবে। এরকম অবস্থা থেকে আমাদের কিভাবে উৎরে উঠতে হবে তা এরকম পরিস্থিতি থেকেই শিক্ষা নিবে।

আমি স্থানীয় পর্যায়ে ক্রিকেট খেলেছি, অধিনায়কত্বও করেছি অনেক ম্যাচ। আমার কাছে এখন যা মনে হয়। বাংলাদেশের আর পেছনে ফিরে তাকানোর সময় আর নেই। আমরা উপরে ওঠার শিরিটা পেয়ে গেছি। এখন শুধু এগিয়ে যাওয়ার পালা। যে চারটি আঙ্গুল দেখিয়ে তামিম আমাদের উপহার দিয়েছে ৪টি হাফ সেঞ্চুরির। এবার তাঁর দায়িত্ব একটি আঙ্গূল বাকি রয়েছে যেখানে সে দেখাবে আমাদের সেঞ্চুরি। যেখানো ভিরাক কোহলি সেঞ্চরির পরেও আরও একটি সেঞ্চুরির দিকে এগিয়ে যায়, সেখানে হাফ সেঞ্চুরি করেই যেন আমাদের প্লেয়ার’রা মনোযোগ হারিয়ে না ফেলে। মাশরাফিকে বলবো ওয়েলকাম ব্যাক। কিন্তু শেষ ২/৩ ওভারে আরও বেশি যতœশীল ও অভিজ্ঞ হতে হবে। রাজ্জাক বল হাতে যা করছে তার সাথে ফিল্ডিংয়েও আরও ভালো করতে হবে। কারণ, বাংলাদেশের ফিল্ডিংয়ের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি আমার চোখে রাজ্জাক। একটা বিষয় আমাদের চোখে ধার পরেছে তা হলো ব্যাটসম্যানরা যখন আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে বসা তখন তাঁদের শারিরিকভাবে অনেক বেশি দুর্বল মনে হচ্ছিলো। ম্যানেজমেন্ট কে এ বিষয়ের প্রতি নজর রাখতে হবে যেন প্লেয়াররা শারিরিকভাবে আরও বেশি সবল হতে পারে। মুশফিক সম্পর্কে বলবো পাইলটৈর যোগ্য উত্তরসুরী আর বিশ্বের সেরা উইকেট কিপার। সাকিব সম্পর্কে একটাই বলতে চাই, এগিয়ে যাও….. আমরা বাংলাদেশ দলের সঙ্গে আছি আর বাংলাদেশ দল তোমার সঙ্গে আছে।

জীবনে শুধু ক্রিকেট খেলার জন্য কোনোদিন ভালোমতো লেখাপড়া করিনাই আর এর ফলে রেজাল্টও যা হবার তাই হয়েছে। তবে জীবনে ফেল করিনি। শুধু ভালো রেজাল্ট হয়নি। বাংলাদেশের বর্তমান দলের সকল খেলোয়ারদের বলবো বাংলাদেশের অতীতের দল ফেল করেনি হয়তো সব সময় ভালো রেজাল্ট করতে পারেনি। এখন তোমরা যারা দলে খেলছো তোমরা সবাই মেধাবী এবং সবারই ভালো করার সুযোগ রয়েছে। সুতরাং তোমরা এগিয়ে যাও। সামনে অনেক কিছুই অর্জন হবে যা বাংলাদেশ দেখেনি আগে… বাংলাদেশের সকল খেলোয়ার ও দর্শকদের জন্য শুভকামনা।

ফেসবুকে ২০ তারিখ শ্রীলংকার সাথে খেলা শুরু হওয়ার আগে একটা স্টাটাস দিয়েছিলাম যেখানে আমি লিখেছিলাম এশিয়াকাপ ২০১২ উইনার বাংলাদেশ। স্টাটাসটি এখন আমাকে বলছে তুমি ভুল লিখেছো লেখাটা হবে ওয়ার্ল্ডকাপ উইনার বাংলাদেশ। সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম।