ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

আমরা সবাই দেশকে ভালোবাসি। জাতীয় সংগীতের শুরুতেই সেই ঘোষণা দিয়েছি আমরা। কিন্তু কতটুকু ভালোবাসি, কী সেই ভালোবাসার প্রকাশ? আমরা অনেকেরই সেই আত্মোপলব্ধি নেই। কথায় কথায় সরকারের দোষ, বিরোধী দলের দোষ, এমন কি জনগণের দোষ দিতেও কুণ্ঠা নেই আমাদের। একজন নাগরিক হিসেবে আমরা কি সুনাগরিকের দায়িত্ব পালন করছি। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি প্রতিটি নাগরিকের কিছু অংশগ্রহণ দেশকে এগিয়ে নিতে উন্নতির চরম শীর্ষে। আমরা তা করি না- পারি না।

জাতি হিসেবে আমরা দীর্ঘ চল্লিশ বছরেও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারিনি। বিশ্বব্যাংকের কাছে ধর্ণা দিতে হয় আমাদের পদ্মা সেতু তৈরিতে। বন্যাবিধ্বস্ত সাধারণ মানুষের মাথাগোঁজার ঠাঁই জোগাতে হাত পাততে হয় বিদেশীদের কাছে। এ আামাদের লজ্জা! তিরিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের গর্বিত জাতি আমরা ছোট হয়ে যাই উন্নত বিশ্বের কাছে।

১৬ কোটি মানুষের এই দেশে বিরাট জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরাও উন্নত হতে পারি। কৃষিতে আমাদের অর্জন সবচেয়ে বেশি। কৃষক নিরলস ঘাস ছড়ায় বলে। শিল্পে আমাদের অর্জনও কম নয়। কিন্তু বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে আমাদের উৎপাদিত পণ্য আমরা অবহেলা করি। আমাদের দেশের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী আমাদের তুষ্ট করতে পারে না। আমরা যা কিছু কিনতে যাই সবাই বিদেশী হওয়া চাই। সাবান থেকে শুরু করে সামান্য চিপস পর্যন্ত আমাদের বিদেশী হওয়া দরকার। এ মানসিকতা আর যাই হোক দেশপ্রেম নয়।

আমাদের দেশে তৈরি পণ্যও বিদেশীদের কাছে কম গুরুত্ব পায় না। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা থেকে ৬ মার্চ প্রকাশিত একটি খবর কোন পত্রিকায়ই গুরুত্ব পায়নি।

জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসস পরিবেশিত খবরে বলা হয় : ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যের রাজধানী গুয়াহাটিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশ রেকর্ড পরিমাণ ১০ কোটি ২৮ লাখ ৩ হাজার ডলারের রফতানি অর্ডার পেয়েছে। এর মধ্যে ৫৩ লাখ ডলারের অর্ডার ইতোমধ্যেই নিশ্চিত করা হয়েছে। এটাই কোনো আন্তর্জাতিক মেলা থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি অর্ডার।
বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্র জানায়, প্রাপ্ত অর্ডারের মধ্যে বাংলাদেশী কোম্পানী ‘ওয়ালটন’ একাই পেয়েছে প্রতি বছর ১০ কোটি ডলারের রফতানি অর্ডার। ইতোমধ্যে এর ৫০ লাখ ডলারের অর্ডার নিশ্চিত হয়েছে। এছাড়া ফার সিরামিক ১০ লাখ ডলার, ডায়মন্ড মেলামাইন ৬০ হাজার ডলার, প্রাণ ১৫ লাখ ডলার, বসুন্ধরা গ্রুপ ২৫ হাজার ডলার, হেলাল এন্ড ব্রাদাস ৪৫ হাজার ১৮০ ডলার, শরীফ মেলামাইন ৭০ হাজার ডলার, স্কয়ার টয়লারিজ ১০ হাজার ডলার, মুন্নু সিরামিক ৩০ হাজার ডলার, প্রাণ আর এফ এল ৭ হাজার ২০৬ ডলার, মসলিন জামদানি ৪০ হাজার ডলার, ঢাকাই জামদানি ৩০ হাজার ডলার, ইথিনিকা ৫ হাজার ডলার এবং মিনা হ্যান্ডিক্রাফ্ট ৫ হাজার ডলারের রফতানি অর্ডার পেয়েছে।

এ বছর গুয়াহাটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক মেলায় অংশ নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্যের বাজার খোঁজার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার তারিক এ করিম এই মেলায় অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ বছর বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে মেলায় বেশ কিছু স্টল খোলা হয়। এটা ছিলো বাংলাদেশের দ্বিতীয়বারের মত গোহাটির মেলায় অংশ নেয়া।

বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টার কমার্শিয়াল হাবিবুর রহমান খান বাসস’কে জানান, প্রতিবছর মেলায় জামদানি শাড়ী ও হস্তশিল্পসহ কিছু তৈরী পোশাক আনা হয় । এবার মেলায় প্রচলিত পণ্যের বাইরে বাংলাদেশর ১৪টি কোম্পানীর উৎপাদিত উন্নতমানের শিল্পজাত দ্রব্য আনা হয়েছিলো। এগুলোর মধ্যে ছিলো মোটরবাইক, রেফ্রিজারেটর, এলসিডি টেলিভিশন, মেলামাইন, সিরামিক, টয়লেট সামগ্রী, কসমেটিক্স, টিউবওয়েল, ওয়াটার ট্যাংক, ক্যাবল, জুস, ফুড প্রডাক্ট, প্লাস্টিক প্রডাক্ট ইত্যাদি। খুব ভালো ফলাফল পাওয়া গেছে। মেলায় আগত ভারতীয় এবং ভারতের বাইরের মানুষের কাছে এর চাহিদা ছিল বেশি।

তিনি বলেন, ‘এবার আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো মেলায় শুধু পণ্য বিক্রি নয়, বাংলাদেশের পণ্যের বাজার তৈরী এবং অর্ডার সংগ্রহ করা অর্থাৎ রফতানি বাড়ানো। এ ব্যাপারে আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি।’
গোহাটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশে উৎপাদিত আধুনিক শিল্পজাত দ্রব্যের পাশাপাশি প্রচলিত পণ্য জামদানি শাড়ী ও হস্তশিল্প প্রচুর বিক্রি হয়েছে। ’

নিজের দেশের পণ্য ক্রয় দেশপ্রেমের একটি উজ্জ্বল দিক। পৃথিবীর উন্নত জাতিগুলোর কাছে এই উদাহারণ বিরল নয়। আমরাও যদি আমাদের তৈরি পণ্যসামগ্রী কিনতে আগ্রহী হই আমাদের শিল্পকারখানা বিস্তারলাভ করবে। কর্মসংস্থান বাড়বে। আমরা যে বিদেশী জিনিসটি কিনলাম, সেই কেনার মাধ্যমে আমাদের দেশের টাকা অন্য দেশে চলে যাবে না। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবো আমরা। দেশ প্রেমের এই দিকটি উপেক্ষিত রয়ে গেছে দীর্ঘ বছরগুলোতে। বিদেশী জিনিস মাত্রই ভালো এই মানসিকতা কাটাতে হবে আমাদের। তাহলে জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের দরবারেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো একদিন।

১২ মার্চ, ২০১২