ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 
image-45497

গত ২৮ মে যখন অফিস থেকে বের হবো ঠিক তখন হাতে এলো আবহাওয়া অধিদফতরের প্রেস বার্তা। পড়ে দেখি ঘূর্ণিঝড় মোরা এগিয়ে আসছে, তাই উপকূলে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার ও জলোচ্ছ্বাসের ’সম্ভাবনা’ রয়েছে। এজন্য উপকূলের মানুষকে তিন নম্বর সতর্কতা সংকেত দেখাতে হবে। বুঝের মানুষ হলেও বুঝে আসলো না সতর্কতা কিভাবে সম্ভাবনাময় হয়। আর বুঝার চেষ্টাও করলাম না। সম্ভাবনা হোক আর আশঙ্কা হোক মানুষকে সতর্ক করা আমার দায়িত্ব, আমি সেই দায়িত্ব পালন করে গেলাম।

পরদিন ডিউটি ছিল সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত। টিপটিপ বৃষ্টি উপেক্ষা করে অফিসে আসি। অফিসে এসেই দেখি ৮ নম্বর মহাবিপদ সংকেত। একটু আতঙ্ক নিয়েই ডিউটি শুরু করা। ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হচ্ছে আবহাওয়ার গতি-প্রকৃতি। চ্যানেলে চ্যানেলে লাইভ চলছে উপকূলীয় এলাকার পরিস্থিতি। সারাদেশের মানুষের মাঝে বিরাজ করছে আতঙ্ক। এর মাঝে জাতির স্বার্থে কিছু ’সম্ভাবনাময়’ আপডেটও দিচ্ছে আবহাওয়া অফিস। সর্বশেষ আবহাওয়া অফিস থেকে যে সতর্কবানী পাই সেটা ছিল ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত। সেখানেও লেখা ‘ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার ও জলোচ্ছ্বাসের ’সম্ভাবনা’ রয়েছে’ এবার একটু অবাকই হই। ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতও তাহলে আবহাওয়া অফিসের কাছে ’সম্ভাবনাময়’ সংবাদ!

সেদিন মধ্যরাতে ডিউটি শেষ হলেও বাসায় যাইনি। কেন যেন দায়িত্ববোধ আমাকে আটকে রেখে দিল। পরদিন ভোরে সেন্টমার্টিনের উপকূলে আঘাত হানে ঘূণিঝড় মোরা। যদিও রাতে থেকে যাওয়ার মূল কারণ আবহাওয়া অফিস থেকে জেনে সর্বশেষ সংবাদ জানাতে হবে দেশবাসীকে, কিন্তু রাত ১১টার পর থেকে মোরা আঘাত হানার পূর্ব পর্যন্ত আর দেখা মিলেনি আবহাওয়া অফিসের কোনো আপডেট। তবে সম্ভাবনার দিক হলো মোরার ক্ষয় ক্ষতির যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল ততটা হয়নি। যাক এ যাত্রায় বাঁচাই গেল। এবার ভাবলাম বেশি ক্ষয়-ক্ষতি হবে না এ খবর আবহাওয়া অফিস জানতো বলেই হয়তো ‘সম্ভাবনাময়’ পূর্বাভাস দিয়েছিল!

ঘূর্ণিঝড় মোরার রেশ কাটতে না কাটতেই ১৩ জুন ঘটলো পাহাড় ধসের ঘটনা। এ ঘটনায় প্রথমে ৩৭ জন পরে আরো কয়েকটি ঘটনা মিলিয়ে প্রায় ১৩০ জনের মৃত্যু হয়। আর এতে আবহাওয়া অফিসের ওপর আসে নতুন চাপ, পাহাড় ধসের সতর্কবার্তা দেয়াও হয়ে ওঠে তাদের নিয়মিত দায়িত্ব। ভাবলাম এতো লোক মারা গেলে আবহাওয়া অধিদফতরের প্রেস রিলিজ বোধয় এবার ঠিক আসবে। কিন্তু না, এবারও দেখি ব্যাতিক্রম ঘটেনি। আবহাওয়া অফিস এবার শুরু করেছে পাহাড় ধসের ’সম্ভাবনাময়’ সতর্কবানী দেয়া। তারা এখন সতর্কবানী দিচ্ছে ভারী বর্ষণে দেশের পার্বত্য অঞ্চলে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ‘সম্ভাবনা’ রয়েছে। প্রতিদিন এসব সতর্কবাণী দেখি আর অবাক হয়ে মনে মনে ভাবি- সরকার বেতন দিয়ে কাদের পালছে? এরা কি সম্ভাবনা আর আশঙ্কার তফাতও বোঝে না?

আবহাওয়া অফিসের সমস্যা-সম্ভাবনার বুঝ-অবুঝ নিয়ে যখন প্রশ্ন তুলছি তখনি অনেক বড় জ্ঞানীর পরিচয় দিল এই প্রতিষ্ঠানটি। ৬০ মিনিটের ঘণ্টাকে এবার তারা ৮০ মিনিটে নিয়ে বেশ আলোচনার সৃষ্টি করলো। গত ২১ আগস্ট তাদের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যে দেখা যায়, সেদিন বরিশালে সূর্য উঠেছে ৫টা ৮০ মিনিটে আর খুলনায় উঠেছে ৫টা ৭৪ মিনিটে। আবার তার আগের দিন (২০ আগস্ট) একটি গণমাধ্যমে দেখতে পাই, আবহাওয়া অফিসের বরাত দিয়ে তারা প্রচার করছে, আগামী ২৩ আগস্ট উঠবে চাঁদ আর কোরবানির ঈদ হবে ০২ সেপ্টেম্বর! এই হলো আমাদের আবহাওয়া অফিসের অবস্থা।

প্রতিদিন আবহাওয়া সতর্কবার্তায় লক্ষ্য করলে খালি চোখেই ধরা পড়ছে প্রতিনিয়ত কি পরিমাণ ভুল করে যাচ্ছে অতি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি। এটাকে অবশ্য ভুল বলতে আমি নারাজ। আমার মতে এটি জাতির সাথে খামখেয়ালিপনা ছাড়া আর কিছুই না। এখন প্রশ্ন হলো, জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে কাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে? যদি যথাযথ মানের লোক নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে তাহলে এ ধরণের ভুলগুলো কিভাবে হচ্ছে? আর প্রতিনিয়ত ভুল হলেও কেন দৃষ্টিতে আসছে না সংশ্লিষ্ট ঊধ্বতন কর্তাদের? নাকি ভুত মূলত সর্ষের মধ্যেই?