ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

93dd65503fbd5d5cbb6725fd675f35b1-59787f269bd38
দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে পরিবহন নৈরাজ্যে অসহায় নগরবাসী। সিটিং বাসের নামে যাত্রীদের থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়, যাত্রীদের নূন্যতম সেবা না দেয়া, হয়রানি, গায়ে হাত তোলাসহ নানা অভিযোগ উঠে আসছে গণপরিবহনগুলোর বিরুদ্ধে। নগরীতে চলাচলকারী বাস ও সিএনজি অটোরিকশাসহ গণপরিবহনগুলোর যাচ্ছেতাই আচরণের কারণে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ব্যক্তিগত পরিবহনের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। যা রাজধানীকে ঠেলে দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি যানজটসহ ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে।

ধনীরা গণপরিবহনব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রাইভেট পরিবহনকে বেছে নিলেও সাধারণ মানুষের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শত নির্যাতন সহ্য করেও তাদের চলতে হচ্ছিল গণপরিবহনগুলোতেই। যা দিনে দিনে বিক্ষুদ্ধ করে দিচ্ছিল নগরবাসীকে। নগরবাসীর পক্ষ থেকে একের পর এক উঠতে থাকে সিটিং বাসের নামে চিটিংবাজী বন্ধসহ গণপরিবহনের নৈরাজ্য বন্ধের দাবি। নগরবাসীর দাবির মুখে একসময় আসে সিটিং বাস বন্ধের ঘোষণা। ১৫ এপ্রিল থেকে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কথা থাকলেও কতিপয় পরিবহন মালিক ও শ্রমিক তা মেনে না নিয়ে যাত্রীদের জিম্মি করে টানা ধর্মঘট পালন করতে থাকে। ফলে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয় গণপরিবহন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিএ ও ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতিকে। আবারো বেপরোয়া হয়ে ওঠে পরিবহনগুলো। সিটিং সার্ভিসের নামে নৈরাজ্যকে আবারো প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতে দেখে কোনোভাবে মেনে নিতে পারছিল না নির্যাতিত রাজধানীবাসী। ঠিক তখনি আশার আলো নিয়ে এসেছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক।

রাজধানীবাসীকে গণপরিবহন ব্যবস্থার খোল পাল্টে দেবার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন রং-চটা, ভাঙাচোরা গাড়ি উঠিয়ে দিয়ে নামানো হবে আধুনিক নতুন বাস। নতুন এই ব্যবস্থা চালু হলে চালকদের যাত্রীর জন্য আর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামতে হবে না বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

Capture1
আনিসুল হক এসব পরিবহনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, রাজধানীতে যাত্রী সমস্যা শুধু অতিরিক্ত ভাড়ার জন্য নয়। বাস বে -তে বাস দাঁড়ায় না, একসাথে চারটা দাঁড়িয়ে যানজট তৈরি করে, একটার ঘাড়ে আরেকটা ওঠে যা টেনে আনে বড় ধরণের দুর্ঘটনা। এগুলোও আমাদের গণপরিবহনের বড় সমস্যা। এভাবে পরিবহণ ব্যবস্থা চলতে পারে না। এ সমস্যা থেকে মুক্তির পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, আমরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশকে স্টাডি করার চেষ্টা করেছি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যে পদ্ধতিতে গণপরিবহন চলাচল করে, শিগগিরই ঢাকায়ও সেই পদ্ধতি চালু করবো।

আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা কেমন হবে তা তুলে ধরে তিনি বলেন, নতুন পদ্ধতি চালু হলে যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা বন্ধ হবে। বিভিন্ন রুটের বাসকে সাতটি কোম্পানিতে বিভক্ত করা হবে। মানে, কেউ বাস নামাতে চাইলে এসব কোম্পানির অধীনেই নামাতে হবে। বাসের শেয়ার অনুযায়ী মাস শেষে এক সঙ্গে পাওয়া যাবে সমুদয় মুনাফা। এতে করে আলাদা কোনো বাসে যাত্রী কম বা বেশি হলে সেই বাসের চালক বা যাত্রীর কোনো সমস্যা হতো না।

মেয়র আনিসুল হক তার এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কাজও করেছেন। চলতি বছরের মধ্যেই কিছু অত্যাধুনিক বাস নামিয়ে দেওয়ার উদ্যেগ ছিল তার। সেই অনুযায়ী বাস মালিকদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠকও করেছিলেন তিনি। প্রথম দিকে বাস মালিকার বিরোধীতা করলেও তার পরিকল্পনা শুনে তারাও মুগ্ধ হন এবং বাসগুলো এক ছাতার নিচে চলবে এমন সিদ্ধান্তে একমত হন মালিকরাও। মেয়রের ঘোষিত পরিকল্পনায় এক নতুন পরিবহন ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিল নগরবাসী। আশার আলো দেখে নগরবাসী। স্বপ্ন দেখতে থাকে শিগগিরই মিলবে রাজধানীর পরিবহন সমস্যার সমাধান।

Untitled-35-5a218f58ab623
কিন্তু এ আশ্বাসের এক সপ্তাহের মাথায় ২৯ জুলাই সপরিবারে লন্ডন গিয়েছিলেন মেয়র আনিসুল হক। সেখান থেকে রাজধানীবাসীর কাছে আর ফিরে আসেননি নগরবাসীর প্রিয় এই মানুষটি। লন্ডনে থাকাকালীন ১৪ আগস্ট হঠাৎ ‘মাইল্ড ব্রেইন স্ট্রোক’ করলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে তিনি তিনমাস সেখানকার আইসিইউতে ছিলেন। সবশেষ গত ৩০ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে দশটার দিকে দেশবাসীকে কাঁদিয়ে তিনি চলে যান মহান প্রভুর কাছে।

মেয়র আনিসুল হক তার স্বল্প সময়ের মেয়র জীবনে রাজধানীবাসীকে দিয়েছিলেন অনেক কিছু। ক্ষমতার শুরুতেই তিনি রাজধানীর তেজগাঁওয়ের অবৈধ ট্রাক স্টেশন উচ্ছেদ করে রাস্তা উদ্ধার করে মন জয় করে নেন নগরবাসীর। শুধু তেজগাঁও ট্রাক স্টেশন নয়, আমিন বাজার থেকে শ্যামলী সড়ক পার্কিং ফ্রি ঘোষণা, হয়রানি রোধে ঠিকাদারদের বিল অফিসে পৌঁছে দেওয়া, সড়কে সাড়ে চার হাজার আধুনিক বাস সার্ভিস চালু, ২২টি ইউলুপ নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৭২টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন স্থাপন, ২০ হাজার বিলবোর্ড উচ্ছেদ ও পরিকল্পিত বিলবোর্ড স্থাপন, সবুজায়নে ইকো-বাস সার্ভিস চালু, জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণ, প্রধান সড়কগুলো রিকশামুক্ত করা, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন, পাবলিক টয়লেট স্থাপন, কারওয়ান বাজার ডিএনসিসি মার্কেট থেকে ব্যবসায়ীদের মহাখালী ও যাত্রাবাড়ীতে স্থানান্তর এবং উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা চালুসহ নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধিতে নানা ভূমিকার জন্য নগরবাসী বুকে ধারন করে নেয় এই ব্যক্তিটিকে।

মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই দখল শুরু
আনিসুল হক চলে গেছেন। তিনি দেখিয়েছিলেন নগরবাসীকে আধুনিক ঢাকার স্বপ্ন। কিন্তু তার অবর্তমানে গত ৪ মাসে কেউ আর ভাবেনি এসব নিয়ে। পরিস্থিতি বলছে হয়তো তার অনুপস্থিতিতে অংকুরেই বিনষ্ট হবে এসব আধুনিক পরিকল্পনা। হয়তো ভেস্তে যাবে আধুনিক নগরীর স্বপ্ন। জানি না আর কখনো কেউ ভাববে কি না আধুনিক ঢাকা বা আধুনিক গণপরিবহনের কথা। তবে জনপ্রতিনিধিরা ভাবুক আর নাই ভাবুক মানুষ ঠিকই মনে রাখবে এই নগরপিতাকে। অবাস্তবায়িত থেকে গেলেও আধুনিক ঢাকার স্বপ্নে প্রতিটি মানুষের মাঝেই বেঁচে থাকবেন মেয়র আনিসুল হক।

লেখক: যাত্রী অধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

slide