ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আজ আষাঢ়ের চতুর্থ দিন! মনের কোনেও কি মেঘ জমে আষাঢ় এলে? গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবা দাহে তৃষ্ণার শান্তি, মঙ্গল কান্তি নিয়ে যখন তুমি চলেই এলে, তখনো কি আমি নিশ্চুপে প্রহর গুনবো ভেবেছ?

না, বাতাসে বৃষ্টির এই মাতাল গন্ধী দিনে আমি যে তারই আভাষ পেতে চাইবো যারে এমনও দিনে কিছু কইতে পারবো! মনে মনে ভাবি বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি, সে কি সহজ গান? আর তাই তো এই সাতসকালে ঘন ঘোর বরিষন মেঘ ডমরু বাজে, আমার মনে আর শাল মহুয়া, তমাল, পিয়ালদের বৃষ্টিস্নাত বনে বনে!
তোমার উতল হাওয়ায় আমার আজও যেন গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করেঃ
এই-যে তোমার প্রেম,ওগো হৃদয়হরণ,
এই-যে পাতায় আলো নাচে সোনার বরন॥
এই-যে মধুর আলসভরে মেঘ ভেসে যায় আকাশ-‘পরে,
এই-যে বাতাস দেহে করে অমৃতক্ষরণ॥
,কিন্তু হায়, তা যে নিয়তঃই হৃদয়ে রক্তক্ষরন ঘটায়, আর আমায় ডাকে দূরে সেই সাগর পারের গোপন পুরে!
তোমার প্রথম কদম ফুল তো তুমি আময় দাওনি হে মৃণালস্পর্শী আষাঢ়, তবু তোমার খোলা হাওয়ায় টূকরো করে কাছি আমি যে ডুবতে রাজী আছি তা কি তুমি জেনে ফেলেছিলে? তাই বুঝি এত তাচ্ছিল্যে আমারই বঁধুয়া আন বাড়ী যাও আমারই আঙ্গিনা দিয়ে?
কিন্তু কি হবে তখন যখন আমি তোমায় জিজ্ঞেস করবো কেমন করে তুমি আমার সন্ধ্যা ফুলের মধু পান করে বারেবার পালিয়ে যাও?

তুমি তো মেঘে মেঘে বেলা ঢেকে দিচ্ছ আজকাল, কি যে করি, তোমার ওই সোঁদা মাটির অতুল ঘ্রানে যে আমার হৃদয় নাচে, আমার মন ভোলায় চিরদিনের জন্যে!

তুমি সারাদিন মেঘের কোলে কোলে বকের পাতিদের কোন অজানাতে পাঠাও হে? স্নিগ্ধ শ্যাম বেনী বর্ণা মালবিকা তুমি কার কন্ঠে দোল? কেতকী কদম যুথিকা কুসুমে বর্ষা দিয়ে মালা গেঁথেও কি তুমি ভরসা পাওনা যে তোমার পথে পথে অবিরল পানি ছিটিয়ে চঞ্চলা মেয়ের মতো খেলতে হয়?

তুমি তো জাননা, আমি তখনো ছিলেম মগন গহন ঘুমের ঘোরে যখন বৃষ্টি টি এল, আর তাও ঠিক করে পাঠালে তুমি তিমির নিবিড় রাতে! কি জ্বালা বলতো, সজল শ্যামল সুন্দরের একি তুলনাহীন উপদ্রব? আকাশে মেঘের পরে মেঘ জমিয়েই কি ক্ষান্ত দাও তুমি, পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে, তুমি আমার মাতাল প্রা্ন কে বার বার জাগিয়ে যাও!

বৃষ্টি নেশা ভরা সন্ধ্যাবেলা আমি বলিহাড়িদের সাথে চেলা গিরি করে ঘুরে বেড়াই দেহে তোমার স্পর্শ মেখে! সেই দেহের সীমাও যখন তুমি ছাড়াতে চাও, তখন কি যক্ষপ্রিয়াদের কাছে আমার নামটি তুমি একটি বারের জন্যেও বলতে পার না?

কালিদাসের মেঘদূতে তুমি সেই চিরন্তন ছবি দেখাও নিরন্তরঃ
যেমন করে চাতক চতুর পান করে ওই বৃষ্টি ধারা-
সখার সাথে দেখবে চেয়ে সিদ্ধ বালা আপন হারা!

আষাঢ়, বজ্র মানিক দিয়ে তুমিই পার সেই কাঙ্ক্ষিত মালাটি গাথতে, যা তোমার শ্যামল শোভার বুকে বিদ্যুতের জ্বালা দিয়ে যায়, তাও তো বেশ তুমি সয়ে যাও!
আমি নীপ বনে ছায়াবিথি তলে ডাক তে ডাক তে মরি, কেউ কি এল আর বললো “কেন এমন ও হল গো আমার এ নব যৌবনে-সহসা কি পশিল কোথা কার কোন পবনে”?

তোমার হৃদয় হরন রিমঝিম ধারাতে আমার প্রাগলভতা যদি কিঞ্চিত বৃদ্ধি পায়, তো সে দ্বায় তোমার আষাঢ়, আমার বা প্রকৃতির বোধ হয় নয়! বরং তোমার ভেজা বাতাসে আমার মনকে করে ভ্রমর বিবাগী কোন নিভৃত নীল পদ্মের সন্ধানে, কে জানে আর তার সাথে বা কোন রাতের পাখীর উদাসী গান গাওয়াও আমার শ্রান্ত ক্লান্ত কন্ঠে এই অন্তবিহীন অন্ধকারে!

তাই তুমি আমায় নিত্যি ভাবাও, এমনও দিনে তারে বলা যায়, আর তা এমনও ঘন ঘোর বরিষায়! হায় আষাঢ়, তোমার কারনেই আমার হৃদয় যমুনা আজ কূল জানেনা, কিন্তু তুমি কি শুধু তোমার ওই শ্যামল সজল স্নিগ্ধতা দিয়েই আমার মনের ময়ূরকে নিত্যি পেখম খোলা নাচ নাচিয়ে যাবে?

তবে তাই হোক, তোমার প্রথম কদম ফুলের ঘ্রান যে আমি পেলাম, তাই আমার হয়ে থাক, তুমি মেতে ওঠো তোমার বজ্র মানিক দিয়ে গাথা মালার স্বয়ংবরে নিত্যি উদাসীনতার আবডালে এক বিরহী যক্ষপ্রিয়া হয়ে!
আর বারে বারে আমার কন্ঠে শোনাও তোমার সেই পুর্ব মেঘের আকাশ চেরা হৃদয় কাড়া বিদ্যুত চমকবাহী ভালবাসার বাউরী বাতাস কে!
প্রেমের বাদল নামল, তুমি জানো না হায় তাও কি?
আজ মেঘের ডাকে তোমার মনের ময়ূরকে নাচাও কি?