ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

 

১. তাকে প্রথম পড়াঃ
১৯৮৪ সালের কোন মার্চ-এপ্রিল সম্ভবতঃ, দুপুরে কমিটি করার জন্যে জসীমুদ্দিন হলে আমাকে (এক বিব্রতকর সমস্যায় পড়ে তখন আমাকে ওই সব করতে হচ্ছিল, প্রাসঙ্গিক নয় বিধায় তা অনূল্লেখ্য!) ও জনাব রফিকুল হক হাফিজকে উপস্থিত হতে হল। ডাকসু নির্বাচনে হলের নির্বাচিত জিএস বা ভিপি মাসুম (ঠিক মনে নেই), এফ রহমান হলের নির্বাচিত জি এস সোহেল রানা, মহসীন হলের জি এস জামাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আহবায়ক শেখ নজরুল, নোমান, জহির, ভুলু, তৃপ্তি, জসিম, জনী, জয়নাল ও ইলিয়াস এবং মহানগরী শাখার ইকবাল ভাই ও ফয়সল চিস্তি (এরা প্রায় সবাই পরে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত) ইত্যাদি দুপুরের বিশ্রামের পরে সভার সময় ও খাবার পর আমাকে একটি রুমে বিশ্রাম নেবার ব্যাবস্থা করে দিল!

অন্যস্থান বিধায় ঘুম এলনা, দেখলাম ওই রুমের থাকা ছাত্রদের পড়ার টেবিলের ওপর একটি বই, নাম “নন্দিত নরকে”! হতাশ হলাম, জানতাম বেশ কিছু দিন ধরে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের, বিশেষ করে প্রেমিক প্রেমিকা বা ওই ধরনের “রোমান্টিক” ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে হাতে কেমেষ্ট্রি/বায়ো-কেমেস্ট্রি ডিপার্মেন্টের কোন এক কম বয়সী শিক্ষকের লেখা এই বইটি বাহিত হওয়া মোটামুটি একটি “ফ্যাশনে” পরিনত হয়েছে, আর এখানেও এই বই!

আমি তারাশঙ্করের পঞ্চগ্রাম গনদেবতার দেবু মাস্টারকে অনুসরন করার চেষ্টায় তখন রত, রবীন্দ্রনাথের “ক্ষুধিত পাষানে” পাই অতীন্দ্রিয়তার স্বপ্নালু স্বাদ, চর্য্যাপদের কানহুপা ডোম্বীপা আর ভুসুকূরা আমার সাহিত্য মননের আঁকর,ময়ূরাক্ষী, অজয় আর দামোদরের ত্রিবেনী সঙ্গমের লেখকেরা রবীন্দ্রনাথ, তারাশংকর, শৈলজানন্দ আর নজরুল আমার ঐতিহ্য, অন্যদিকে ভবঘুরে শ্রীকান্তের শরতচন্দ্র, “চৌরঙ্গীর” শংকর, “কড়ি দিয়ে কিনলাম” এর বিমল মিত্র, “পথের পাচাঁলী” আর “আরন্যকের” বিভূতিভূষন, কল্লোল যুগের মনিলাল, মানিক ও অন্যান্যদের, বোলপুরী বোল বোলাওয়ের মুজতবা আলী, আর ততকালীন চলমান লেখক নীহারঞ্জন, সঞ্জীব, মহাশ্বেতা দেবী, সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, শীর্ষেন্দু, দুই সমরেষ, আশুতোষ, নিমাই, দুই বুদ্ধদেব- প্রয়াত বসু ও চলমান গুহ ইত্যাদি দিয়ে আমার চলন বলন ও সাহিত্যিক মনন চন্দ্র সুর্য্যে পরিপুর্ন!

তার সাথে লেরমন্তভ, পূশকিন, টলস্তয়, গোর্কি, বরিস লাভ্রেনিয়ভ, দস্তয়ভস্কি, আন্তন শেখভ, নিকোলাই গোগল আর আ্যডগার অ্যালেন পো, চার্লস ডিকেন্স, সমারসেট মম, মোপাসা দ্য গাই ইত্যাদিদের নিয়ে ভেবে ভেবে আত্মশ্লাঘা বোধ করতাম এমন কি ওরিয়েন্টাল সাহিত্যও আমার কাছে ছিল এবং আছে অতূলনীয় যেমন ফরিদ উদ্দিন আত্তারের “পাখীর খেলাঘর” আর ওমর খৈয়াম বা হাফিজের দিওয়ান নিয়ে রাতের পর রাত জাগতাম!

এর কয়েক বছর আগ পর্যন্তও বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বিতর্ক অনুষ্ঠানে মাতব্বর সেজে “কমিউনিস্ট পার্টির ইশ্তেহার” থেকে তারাশংকরের “কবি” ইস্তক টাইফুন বইয়ে দেওয়া আমি নিজকে সাহিত্যের বিরাট বোদ্ধা ভাবতাম!কিছু পত্রপত্রিকায় ছাপা হতো আমার লেখা, সবাই বেশ মনযোগের সাথে তা পড়তো দেখতাম!

“গনদেবতার” “দেবু মাষ্টার” আমি সেই দুপুরটিতে শুধু সময় কাটানোর জন্যে “পদ্ম”কে সরিয়ে রেখে, আর “ওরা কি ঘোড়ার ডিম পড়ে” জাতীয় অবহেলার সাথে “চ্যাংড়া” শিক্ষক হুমায়ুন আহমেদের “নন্দিত নরকে” বইটি্র প্রথম পৃষ্ঠায় চোখ রাখলাম!

কি ভেবেছিলাম? গোর্কির “আমার ছেলেবেলার নির্মোহ বর্ননা, লেরমন্তভের অতিমানবিক বীরত্ব ব্যাঞ্জনার “আমাদের কালের নায়ক” আর চসারের “ক্যান্টারবারী টেলস” এর চারনতার সাথে অ্যাডগার অ্যালেন পো’র আটপৌরে সাদামাটা কিন্তু নিউরোটিক নিঁখুত পরিমিতির বিশ্লেষনাত্মক এক অভূত পুর্ব ছকে যাওয়া নব অবধুতীয় সু-সমাচার! দুলে উঠলো আমার স্মৃতির রত্ন সাগরে টলায়মান তরনীর মতোই নাকি হোমারের অলঙ্কৃত “ই্লিয়ড-ওডিসি”, ভার্জিলের “ইনিড” আর দান্তে-গোথের “ডিভাইন কমেডি” আর “ফাউষ্ট”! এমন কি গাই দ্য মোঁপাসার আটসাট বাঁধা মাদাম “ক” বা “খ” ও নেই, কিন্তু অতি স্বাচ্ছন্দ্য আর অবলীলায় হুমায়ুনের প্রবাহমান লেখার স্রোতস্বিনীতে বেগ ও আবেগের ঘুর্নি যেন চলমান জীবনের সাধারন হাসিকান্না আর স্বপ্নের নির্মম মৃত্যুর দুরন্ত অপার্থিব আনন্দ, যাতনা আর বেদনার মুক্ত শিশির ছড়া!আমার যেন আনন্দে বা বেদনায় তখন মরে যেতে সাধ হলো!পরবর্তীতে দেখেছি হুমায়ুনের লেখায় পরতে পরতে ঝলসে ওঠা সুররিয়ালিজম, কিউবিজম, মর্ডানিজম আর পোষ্ট-মর্ডানিজমের সাথে রিকন্সট্রঙ্কটিভিজমের অপূর্ব অপার্থিব সমন্বয়!কোথাও কোথাও তিনি ইউজিন ইউনেস্কির নৈর্বক্তিক সুররিয়ালিজমকেও অতিক্রম করে গেছেন মিসির আলী আর হিমুকে নিয়ে! একি কান্ড!

আমি বইটি শেষ না করে রুম থেকে বেরুতে অস্বীকার করলাম, হাফিজ ভাইকে একাই সাংগঠনিক কাজটি সারতে হলো!
সেইটিই আমার লেখক হুমায়ুন আহমেদের লেখার সাথে প্রথম যুযুধান “এনকাউন্টার”!

আমি মোহিত, বিমোহিত, মুগ্ধ, স্থবির! সেই থেকে এই লেখককে আমি “ঐশ্বর্গিক ডেমোনেষ্ট্রাশন” মনে করতাম যিনি বাংলার অতি নিভৃত পল্লীর মাটির কুটিরের উপকথাদের নানান ঐন্দ্রজালিক সৌকর্য্যে অতীন্দ্রিয় মনোলোভা রূপে অবহেলে বিলিয়ে দিতে পারেন!

ব্যাস, ওই হয়ে গেল আমার!আমি হুমায়ুনময় হয়ে বেঁচে থেকে ধন্য হবো কি ভাবে তাই ভাবতে শুরু করলাম!সে ভাবা আমার এখনও অক্ষুন্ন!

২.অবশিষ্টঃ
“চাঁদনী পশর রাতে”র গাতকের স্রস্টা হুমায়ুন আহমেদ যখন ছবি বানাতে গেলেন, আমরা অনেকে একটু আশ্চর্য্যই হয়েছিলাম, ভেবেছিলাম এ ভদ্রলোক কি নিজেকে সর্বজ্ঞ মনে করা শুরু করেছেন?

দ্রুত পালটাতে থাকলো আমার চিন্তা ভাবনা আর ধারনা! “আগুনের পরশমনি” চলচিত্রে সর্বপ্রথম সত্যিকারভাবে পেলাম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কালীন পরিবেশ আর কাহিনী! পরিমিতি বোধ আর স্বাভাবিক দৃশ্যের ভেতর সেই সময়ের আনন্দ বেদনা হুমায়ুনের নিজস্ব সৌকর্য্যে উজ্জ্বল হয়ে ডকুমেন্টেড হইয়ে জন্ম দিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের গরীয়সী সেলুলয়েড!

আমার মনে পড়লো সত্যজিত রায় তাঁর “ঘরে বাইরে” আর রিচার্ড অ্যাটেনবোরো তার “গান্ধী” ছবি একই বছরে মুক্তি দিয়েছিলেন! রিচার্ড অ্যাটেনবোরোর গান্ধী ছবি ছিল সেই সময়ের ব্যায়বহুল ছবির অন্যতম, সত্যজিতের ছবিটি ছিল অতি পরিমিত বাজেটের একটি ছবি! অস্কারে “গান্ধী” ছবি নানা ধরনের পুরস্কার জিতে এল!কিন্তু চলচিত্র বোদ্ধারা যারাই দেখেছেন ভিক্টর ব্যানার্জি আর সৌমিত্র অভিনীত সত্যজিতের সেই মহত্তম সৃষ্টি “ঘরে বাইরে” ছবিটি, তাদের অনেকেরই ধারনা ছিল অস্কারে পাঠানো হলে সেটি হতো সেখানকার “মাষ্টারপিস” ছবি!

ঠিক যেন তারি ধারাবাহিকতায় এবার বাংলাদেশে তৈরী হল বাংলা ছায়াছবি “শ্যামল ছায়া”!তৈরী করলেন মানব সভ্যতা-সৌকর্য্যের অন্যতম প্রতিনিধি হুমায়ুন আহমেদ!পরিমিত ব্যায়ে অতিদক্ষ মুন্সীয়ানায় বাঙ্গালী সমাজের বিভিন্ন সেগমেন্টের মুক্তিযুদ্ধ কালীন মনস্তাত্বিক টানা-পোড়ন, দ্বিধা-দন্ধ আর মাইক্রো-মাক্রো প্রোজেকশনের ভেতর বের করে আমাদের হাতে তুলে দিলেন যা আমরা পারছিলাম না, সেই অনিন্দ্য সুন্দর মুক্তির চিরন্তন দেবশিশুটিকে!

শত্রুর মেশিন গানের সামনে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখেও “সোহাগ চাঁদ বদনী ধনী নাচো তো দেখি” গানের ও নাচের সাথে শুধু শাওন নয়, নেচে উঠলো সারা বাংলাদেশ, কাঙ্ক্ষিত নিরন্তর মূক্তি প্রত্যাশায়!

১৯২৫ সালে তৈরী হওয়া শতাব্দী সেরা সার্গেই আইজেনষ্টাইনের “ব্যাটেলশিপ পটেমকিন” এর “ফ্রিজ শট” কৌলিন্যকেও বুঝিবা খানিকটে ম্লান করে একবিংশ শতাব্দীতে তৈরী হলো প্রিয় হুমায়ুন আহমেদের সুদক্ষ কারিগরের দরদী আর স্বর্নপ্রসবা হাতে আমাদের “শ্যামল ছায়া”! আমরা তার সামান্য যন্ত্রপাতিতে করা দুরন্ত ক্লাসিক দক্ষতা দেখে অভিভূত হলাম!

আমি আবারও সর্বাঙ্গে মনে ও প্রানে হুমায়ুনময় হয়ে ভাবতে রয়ে গেলাম, কিন্তু দেবার সময়ের বেলাটিতে সদর্পে তার মিসির আলী আর হিমুর দলে ভীড়ে হুমায়ুন নিরন্তর চলে গেলেন তারই পছন্দের কোন স্থানে, যেখানে তিনি গিয়ে নিওলিথিক টপোগ্রাফি দেখে তার কাজ সাজাবেন হয়তো নতুন করে কোন “ন্যু” এর সাথে একযোগে, গ্রহানুপুঞ্জে পুঞ্জে ছায়াপথে আমরা হয়তো তার নিত্যি আভাষ পাব তারই দেহ আর মনে সর্বদা বিরাজিত “চাদনী পশর রাতে” !

প্রিয় হুমায়ুন আহমেদ, তোমার বাংলাদেশের “ভাটি অঞ্চলের দেশের” মতো ওই ছায়াপথের আকাশেও কি বকপক্ষীর দল ফিবোনক্কি রাশিমালায় নিজেদের সাজিয়ে উড়ে যায় সুদুর কোন পলল মাটির সন্ধানে?