ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

১. সদ্য প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদের সবচাইতে বড় কৃতিত্ব অনেকের মতে সম্ভবতঃ নদী মাতৃক পদ্মা-মেঘনা-যমুনা অববাহিকার গড়ে ওঠা পলল প্রাচীন পূর্ববঙ্গ বা এখনকার বাংলাদেশের স্বতন্ত্র ও নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতির হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ধারাকে মহত্তম ও সর্বাঙ্গ সফল চিরস্থায়ী রূপ দিয়ে যাওয়া!

২. হাজার বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাংলা সাহিত্যের চারন পুরুষ, বিশ্বের অন্যতম অনবদ্য অনিন্দ্য ও অতলস্পর্শী নিউরোটিক অ্যানালাইটিকাল জিনিয়াস, ক্ষনজন্মা বহুমাত্রিক সাহিত্য প্রতিভা, ভাটি অঞ্চলের চাঁদনী প্রহরের নিঝুম গাতক, প্রাকৃতিক অতিন্দ্রীয় রহস্যময়তার প্রকাশ ও সমাধানের ঐন্দ্রজালিক বার্তাবহ, মহাবিশ্বের কাল থেকে কালান্তরের সর্বস্তরে বিরাজমান বাঙ্গালীর অতিমানবিক প্রতিভু মহত্তম গণ ব্যাক্তিত্ব্যটিই হুমায়ুন আহমেদ!

৩. সম্ভবতঃ বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির এক উল্লেখ যোগ্য অংশ আগামী শত বর্ষে তাকে ঘিরেই অনুরণিত হবে!
এই হুমায়ুন আহমেদই সেই ব্যাক্তি যে বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তার গনমানুষের চিরচেনা ছন্দে ও ভাষায় তৈরী করেছেন অভূতপর্ব মহত্তম চারন সাহিত্য, গাতক হয়ে তার কন্ঠে শুনিয়েছেন সাধারন ছিটে ফোটা আনন্দ আর দুঃখের সঙ্গীত!

৪. বাংলা ভাষায় “সাইন্স ফিকশন” সাহিত্যকে “চন্ডালের” স্তর থেকে উন্নীত করেছেন, কৌলিন্য প্রদান করেছেন তাকে পূর্নতা দিয়ে অনবদ্য প্রথম শ্রেনীর সাহিত্যে!
হুমায়ুনের রয়েছে আরেক মহত্তম কর্মকান্ড, প্রতিটি বিষয়ে বিজ্ঞান মনস্কতার চরমে তিনি বিশেষ করে সোশ্যাল সাইকোলোজী ও প্যারা-সাইকোলোজীর একটি নতুন কিন্তু অতি প্রয়োজনীয় স্কুল অফ থট বিশ্বকে দিয়ে গিয়েছেন!

৫. রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বোধগম্য কারনে এক কালীন পুর্ববাংলা (যা এখনকার বাংলাদেশ), স্মরনাতীত কাল থেকেই পশ্চিমবঙ্গের তূলনায় অনগ্রসর থাকায় সারা বৃহত্তর বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি আবর্তিত হত কোলকাতাকে কেন্দ্র করে! সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক রীতিও ছিল মূলতঃ বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য রীতির দুর্বল অনুকরন কারন কোলকাতা কেন্দ্রিক পশ্চিম বঙ্গের সাহিত্যে উপস্থাপিত সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক স্তর বিন্যাসের সাথে পুর্ব বাংলার সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক স্তর বিন্যাসের ছিল লক্ষ্যনীয় এবং বিস্তর পার্থক্য! তাই দ্বিধান্বিত চিত্তে বাধ্য হয়ে হলেও পুর্ববঙ্গীয়দের পড়তে ও জানতে হয়েছে পশ্চিমবঙ্গীয় ও রাঢ় এলাকার লোকাচার ও সামাজিক রীতিনীতি যা কোন কোন ক্ষেত্রে রীতিমত একে অপরের সাথে বিস্তর পার্থক্যের ও সাঙ্ঘর্ষিক!

৬. ১৯৪৭ সালের বহু পুর্ব থেকেই স্বকীয় নিজস্ব সাহিত্য রীতির সৃষ্টির লক্ষ্যে ততকালীন পুর্ব বাংলার বাঙ্গালী মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপদের লেখকেরা নিরন্তর চেস্টা চালাতে থাকেন, আর সেই প্রয়াসের সফল ফসলই একদিন চিরস্থায়ী আঙ্গিকে গর্বিত ও বৈচিত্রময়তায় মাথা তুলে দাঁড়ায় অসামান্য রূপকার হুমায়ুন আহমেদের মাধ্যমে!ঠিক এইটিই বোধ করি হুমায়ুনের জন্মের “মিশন” ছিল আর তিনি চিরবিদায়ের আগেই বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন “মিশন অ্যাকমপ্লিশড”!

অতিপার্থিব হুমায়ুনের মিসির আলির সমতুল্য অ্যানালাইটিক প্যারাসাইকিক স্কুল সৃষ্টি, হিমু নামের “হিউম্যান রিলিফ” চরিত্র ইত্যাদি শুধু বাঙ্গালী নয়, মানব জাতির জন্যে নতুন একটি গ্যালাক্সীতে পৌছানোর মতই সাফল্য!

ওপরোক্ত কারন গুলো ছাড়াও আরও বহু কারন দেখানো যেতে পারে যাতে আমরা বলতে পারি বাংলাদেশের “বাঙ্গাল”দের জন্যে হুমায়ুন আহমেদের জন্ম ছিল একটি বহুল প্রতিক্ষিত প্রাকৃতিক কর্মকান্ড!

৭. সেই কারনেই হুমায়ুন আহমেদের রেখে যাওয়া মনিকাঞ্চনের রত্ন-ভান্ডারকে ঘিরে বাংলাদেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যে নিয়মিত তা চর্চ্চার, গবেষনার ও অনূশীলনের ব্যাপক সুযোগ থাকা বাঞ্ছনীয় যাতে তার মাধ্যমে বাংলাদেশের গন-সংস্কৃতির কষ্টার্জিত এই মূল ধারাটি উত্তরোত্তর বিকাশিত হতে ও সম্বৃদ্ধ হতে থাকে!কোনই সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশের মুল ধারার সাহিত্য ও সংস্কৃতির আত্মসসন্ধিতসু এই ধরনের চর্চ্চা, গবেষনা ও অনুশীলন বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মননকে বিশ্বের দরবারে সন্মান জনক ভাবে উপস্থাপনে সমর্থ হবে ও সর্বগ্রাসী অপসংস্কৃতির হাত থেকে রক্ষা করার উপায় বাতলে দিতে থাকবে বাংলাদেশের ভবিষ্যত প্রজন্মকে!

এই প্রসঙ্গে আমি দাবী উত্থাপন করছি যে অনতি বিলম্বে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশ সরকার যেন নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহন করেনঃ

৭.১. নুহাশ পল্লী নিয়ে হুমায়ুন আহমেদের ভবিষ্যত চিন্তা ভাবনা যা ছিল তা করার জন্যে সরকার যেন প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় করে

৭.২. হুমায়ুনের প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি যেন সরকার তার পরিকল্পনা অনূযায়ী গড়ে তোলে এবং এই স্কুল ও নুহাশ পল্লী ঘিরে যেন সরকার “চাঁদনী পশর রাত” নামের হুমায়ুন একাডেমী স্থাপন করে সেখানে তাঁর উল্লিখিত মানব, বৃক্ষ ও অন্যান্য চরিত্র ও তার লেখা নিয়ে গবেষনা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তৈরী করা হয়! হুমায়ুনের বইগুলি বিভিন্ন ভাষায় অনূবাদ করে তা বিশ্ব ব্যাপী বিতরন ও তার সব সৃষ্টি আর্কাইভে সংরক্ষিত করা হোক, খোলা জায়গায় হুমা্যুন মিউজিয়াম তৈরী করা হোক যেখানে মিসির আলী, হিমু সহ হুমায়ুনের অন্যান্য চরিত্রের ভাষ্কর্য স্থাপন করা হোক!

৭.৩. ঢাকা ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন হুমায়ুন চেয়ার স্থাপন করা হয় ও দেশী/বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যে হুমায়ুন বৃত্তি চালু করা হোক!

৭.৪. হুমায়ুন আহমেদের নামে যেন একটি ফিল্ম ইন্সটিটিউট স্থাপন করা হয় যার থেকে তৈরী হয়ে আসা জনশক্তি অপসংস্কৃতি রুখতে বড় ধরনের ভুমিকা পালন করতে পারে!

৭.৫. সব কিছু যেন একটি কমপ্লেক্সের আওতায় রেখে সচল করা হয় যেখানে ইচ্ছুক বিদেশিরা এসেও বাংলাদেশের আঁকর সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে লেখা পড়া করতে পারে ও সেই জ্ঞান নিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়!

৮. হুমায়ুন একাডেমী, সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স ও ফিল্ম ইন্সটিটিউট হুমায়ুনের প্রিয় ভাটি অঞ্চলের কোন হাওর অধ্যুষিত এলাকায় হলে আরও ভাল হয়!

আমার এই প্রস্তাবনা অতি প্রাথমিক ও এখনও নিতান্ত ব্যাক্তিগত, ইচ্ছুক ব্যাক্তিরা এর সাথে তাদের বিস্তারিত ভাবনা বা পরিকল্পনা যোগ করবেন সেটাই আশা করছি!

***
হুমায়ূন আহমেদ: ‘ভাটি অঞ্চলের’ দেশের অচিন গাতক!