ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

১. বিষয়ঃ সদ্য প্রয়াত মরহুম হুমায়ূন আহমেদের পারিবারিক বিতর্ক ও তাঁর মহত্তম সৃষ্টির ব্যাপকতার ওপর প্রভাবঃ
সমগ্র বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির বাংলাদেশীয় অভিনব ও বিশিষ্ট তর ধারার কালজয়ী “আইকন” সদ্য প্রয়াত মরহুম হুমায়ূন আহমেদের মহাপ্রয়ানত্তোর তার পারিবারিক কিছু বিষয় নিয়ে বেশ কিছু বিতর্ক ও খবর মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের কানে পৌছেছে! আর খুব স্বাভাবিক ভাবেই তা নিয়ে বিভিন্ন বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর কিছু অংশের ভেতর ইদানিং সৃষ্টি হয়েছে দুর্ভাবনার, কারন তারা ভাবছেন পারিবারিক সেই সব বিতর্কিত বিষয় হুমায়ুনের চির মহতী সৃষ্টির ওপরে কোন বিরূপ প্রভাব ফেবে কিনা? এই লেখাটিতে এ প্রসঙ্গে আমি আমার মতামত তুলে ধরছি, আমি জানি অন্য কেউ ভিন্ন মতাবলম্বী থাকে পারেন এবং তাই স্বাভাবিক! তারা প্রয়োজনে তাদের মতামতও তুলে ধরতে পারেন প্রসঙ্গটিতে!

১.১. বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরঃ বাংলাদেশ অঞ্চলের বাঙ্গালী মানস ধারার শ্রেষ্ঠ রূপকার সদ্য প্রয়াতঃ লোকনন্দিত হুমায়ুন আহমেদের কালজয়ী সৃষ্টির ব্যাপকতা এতোই বেশী ব্যাপক,বিশাল ও কালজয়ী যে তাতে সাময়িক ও কোন কোন ক্ষেত্রে স্বভাবিক পারিবারিক কলহ, বিতর্ক বা ঘটনা স্থায়ী কোন প্রভাব ফেলতে অসমর্থ! এ ক্ষেত্রে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব জমিদারিতে (শিলাইদহ ইত্যাদি) উগ্র প্রজা-শোষন, লালন ফকির ও গগনচন্দ্র হরকরার সাথে আচরন, কবি জীবনানন্দ দাসের মতো যুগ স্রষ্টাকে সরাসরি অপমান, শিবাজী উতসব নামে সাম্প্রদায়িক কবিতা সংকলন, জমিদারির স্বত্ব নিয়ে বিধবা বউদির সাথের স্বার্থপর আচরন ও কাদম্বিনী পর্ব তো ইত্যাদি তো ছিলই! তখন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া তো ছিলই না, প্রিন্ট মিডিয়ার ব্যাপ্তিও আজকের তূলনায় ছিল প্রস্তরযুগের প্রায়! কিন্তু তারপরও আমাদের মনে রাখতে হবে যে সে সময় পাঠক-কুল ও সামাজিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার প্রাগ্রসর জনগোষ্ঠী ছিল কোলকাতা কেন্দ্রিক মূলতঃ হিন্দু মধ্যবিত্ত ও তাদের সামান্য কিছু মুসলমান বাঙ্গালী, বিশেষ করে পুর্ব বঙ্গীয় অনুসারী (এদের ভেতর সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কবি কায়কোবাদ, সৈয়দ ইমদাদুল হক, কবি কাজী নজরুল ইসলাম,মৌলানা আকরম খাঁ, কবি গোলাম মোস্তফা, কবি কাদের নওয়াজ প্রমূখ সাহিত্যানূরাগীরা!) যাদের কাছে কিন্তু বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের প্রাগুক্ত ব্যাক্তি-বিতর্কিত বিষয় সমূহ অজানা ছিল না!

কিন্তু সে সবই যে অতি সাময়িক আর অতি বিশাল ব্যাপ্তির রবীন্দ্র মনন আর সৃষ্টির কাছে নিতান্ত অকিঞ্চিতকর ব্যাপার ছিল, তা পরবর্তীতে সন্দেহাতীত ভাবে প্রমানিত হয়েছে!

তাই হুমায়ুন আহমেদের অভিনব ও অতি বিশাল ব্যাপ্তির কালজয়ী সৃষ্টির কাছে এসব বিষয় এতোই নগন্য যে দ্রুতই একদিন আমরা এসব যে হয়েছিল, তাই ভুলে যাব, কিন্তু স্মরনের মনিকোঠায় বার বার শুকতারার মতো জ্বলে আমাদের পথ দেখাবে স্বসৃস্ট সৃষ্টির ব্যাপকতা নিয়ে বাংলাদেশের হুমায়ুন! তাই আমাদের চিন্তার কিছু আছে বলে আমি মনে করিনা!

১.২ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামঃ আমাদের অতি প্রিয় গনমানুষের কবি কাজী নজরুল ইসলাম কিন্তু বর্ধমান-বাকুড়া-আসানসোল সন্নিহিত রাঢ়ীয় এলাকার চুরুলিয়ায় জন্ম গ্রহন করেছিলেন এবং তার অতি দরদী মানবতাবাদী মানসিকতাও তার উত্থান সমাজের সামাজিক সাংস্কৃতিক স্তরবিন্যাসের দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত আর তাই স্বাভাবিক! ১৯৭১ সালের মূক্তি সংগ্রামের পর তাঁকে অতি সঙ্গত কারনেই স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষনা করা হয়! ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির জনক, ততকালীন পুর্ববাংলার সন্দ্বীপে জন্ম গ্রহণকারী আরেক মহতী ব্যক্তিত্ব কমরেড মোজাফফর আহমেদের “ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ও আমার জীবন” শীর্ষক অতি উপভোগ্য বইটি (যেটিকে নজরুল সম্পর্কিত তথ্যের একটি শুদ্ধতম আঁকর গ্রন্থ বলে মনে করা হয়!) পড়লে পাঠক কবি নজরুলের জীবনের অনেক নাজানা বিষয় জানতে পারবেন! স্বপ্রণোদিত গুরু কবি মোহিতলাল মজুমদারের “হাত থেকে ছুটে যাওয়া” নজরুলের “শনিবারের চিঠি” গোষ্ঠীর কুলীন হিন্দু আঁতেল লেখকদের দ্বারা পর্যাপ্ত শাস্তি বিধানের উদ্যোগ, ধান্দাবাজ আলী আকবর খান ও চরম অপমানের নার্গিস এপিসোড, কুমিল্লাতে কোন মহলের প্ররোচনায় বালিকা প্রমীলাকে হঠাতই বিয়ে করে ফেলা আর নিজের মার সাথে কোন দিন ছেলেবেলার পর একটি বারের জন্যেও দেখা না করে (কবি নজরুলের বৃদ্ধা মা কয়েকবার ছেলের কোলকাতায় সাথে দেখা করতে এসেও বিফল হয়ে ফিরে যান!) স্ত্রী প্রমীলার মা বিরজা সুন্দরী দেবীকে “মা” বলে সারা বাংলায় প্রচার করে বেড়ানো ও তাকে উদ্দেশ্য করে কবিতা ও গান লেখা, মহাকালের মহাযাত্রায় নজরুল মানসের অসীম ও বিশাল ব্যাপকতায় কিন্তু কোন প্রভাব কোন কালেই ফেলেনি! গনিত ও অংক শাস্ত্রে স্বর্নপদক প্রাপ্তিতে ও বিলেত যাবার স্কলারশিপে মনোনিত হওয়া ফজিলাতুন্নেসাকে নিয়ে লেখা কবিতা পাঠিয়ে ঢাকার বুকে কবি নজরুলের সেই চরম অপমানের কাহিনী তো কেউই মনে রাখেনি, কিন্তু “সাত ভাই চম্পা জাগো, পারুল তোদের ডাকে” গানটি অমর করে রেখেছে সেই কিয়তকালের আত্মুরম্ভী ফজিলাতুন্নেসাকে!

এই সব ঘটনা উল্লেখ করে কিন্তু আমি একথা কখনই বলি নি যে নজরুল ঘোর অন্যায় করেছেন!সমস্ত কাজের কিছু কারন বিদ্যমান থাকে, কখনও তা সময়ের সাথে যূক্তিগ্রাহ্য, কখনও তা হয়ত বা আপাতঃ দৃষ্টিতে যুক্তিহীন!

১.৩ হুমায়ূন আহমেদঃ তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও এখনকার বাংলাদেশের বাংগালী সাহিত্য -সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের তিলে তিলে বহুকাল যাবত গড়ে তোলা সমৃদ্ধ আবহমান সাহিত্য -সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব, কালজয়ী মহত্তম চারন পুরুষ হুমায়ুন আহমেদও একজন মানুষ ছিলেন, অতিমানবিক কোন “আ্যলিয়েন” নন! স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মেই তার পৈত্রিক, মাতৃক ও নিজের পরিবার ও আত্মীয় স্বজন ছিলেন ও আছেন, আছেন বন্ধু-বান্ধব ও হিতাকাঙ্ক্ষী, সাথে স্বাভাবিক নিয়মেই হয়ত বহু মানুষ আছেন যাদের কাছে হুমায়ুন ও তার সৃষ্টি ব্রাত্য!

কিন্তু তাতে তো ভাবনার কিম্বা টেনশনের কিছু দেখিনে, বহু উদাহরন-মূলক ব্যক্তিত্বের ওপরের দুইটি মাত্র দেখলেই বোঝা যাবে হুমায়ুনকে নিয়ে বর্তমান মিডিয়া বিস্ফোরনের যুগে ও কদর্য রাজনৈতিকতার সময়ে তাকে ঘিরে যে বিতর্ক চলছে বা চলেছে, তা নিতান্তই সাময়িক, তা অবশ্যই কোন সময়ে কোন ক্ষেত্রে তার মহত্তম সৃষ্টিকে নিয়েও কিঞ্চিত টানা হেচড়া যে করবে না, তা বলা যায় না!

কিন্তু তার পরও যেমন শ্রাবন মেঘের দিনের সাথেই কোন এক স্বর্ণালী প্রভাতে যেমন সোনার থালায় সূর্য্য আর অতলান্ত সঘন বর্ষনের আধার মানিক রাত্রিতে হঠাত কোটি নক্ষত্রের ঝালর নিয়ে জেগে ওঠে বাংলার আকাশ, হুমায়ুনের মহত্তম সৃষ্টি নিজস্ব ঘরানার শ্রেষ্ঠ আর অত্যুজ্জ্বল ধ্রুবতারার মত সে ভাবেই আমাদের পথ দেখাবে, সেখানে তার স্বপ্ন দেখানো ছায়া কক্ষপথে মিসির আলী, হিমি আর শুভ্রদের দাপটে সাজানো প্রকৃতির ফিবোনিক্কি রাশিমালায় এসব ক্ষনিকের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনার স্থান কোথায়? আমদের ভবিষ্যত প্রজন্ম হিমু রূপা-ইয়াদ আলী-হাত কাটা জগলু, এমন কি জ্বিন কফিল আর নীলুর চোখে নূপুর নিক্কনের দেবী! আমাদের আসল ভাবনা আমরা এই বিপূল হুমায়ুনীয় রত্নকে কি ভাবে কোথায় কতটা ধারন করে আশ্বস্ত হব, কোথায়, কোন নীল বেদনায় অসীম হাওরের বাঁধ ভাঙ্গা পানির তোড়ে একটু একটু করে পরিমিত খরচ করবো আমাদের এই সূবর্ণ ফসল, ভবিষ্যতের মহত্তম বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির “চাঁদনী পশর রাতে”!

আর একটা কথা, সৃষ্টি করেছেন হুমায়ুন আহমেদ, কিন্তু সেই বিশাল ও মহত্তম অর্জন আমাদের সকলেরই, তাই তা কোন ভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হবার নয় এ কথাটি আমাদের অবশ্যই সুদৃঢ় চিত্তে স্মরণ রাখতে হবে!