ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

একটা গল্প দিয়ে শুরু করছি। গল্পটা এমন, কয়েকজন চোর আসলো নারকেল চুরি করতে। সেই গাছের মালিকানা ছিলো তিন ভাইয়ের। তারা চোরদেরকে দেখে ফেললেন। চোররা চিন্তা করলো, তিন ভাইয়ের সঙ্গেতো পারা যাবে না। যদি তারা ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা করে, চিৎকার করে তবে তাদেরকে আম, ছালা দু’টোই হারাতে হবে। সঙ্গে মাইর ফ্রি! তাই তারা প্রথমে দুই ভাইকে ডেকে বললো, দেখো তোমাদের দুই ভাইকে তো বড় ভাই ঠকাচ্ছে। এটা সহ্য করতে না পেরেই আমরা তোমাদেরকে সহযোগিতা করতে এসেছি, যাতে তোমরা তোমাদের ভাগ পাও। আমরা এ নারকেল তোমাদেরকে দেবা। এরপর চোররাসহ দুই ভাই মিলে বড় ভাইকে মারধর করে তাকে সরালো।’ চোররা এবার ছোট ভাইকে আলাদা করে বললো, ‘তোমার বড় ভাই যেভাবে তোমাদেরকে ঠকিয়েছিলো, মেঝ ভাইও তোমায় সেভাবে ঠকাবে। কেননা, সে তোমার বড়। তুমি চাইলে সব নারকেলই তোমার হবে।’ এ বুদ্ধি পেয়ে ছোট ভাইসহ চোররা মিলে এবার মেঝ ভাইকে মেরে তাড়ালো। ছোট ভাই এবার সব নারকেল দাবি করলে চোররা মিলে ছোট ভাইকে মেরে তাড়িয়ে সব নারকেল তারা নিয়ে গেলো।

চোররা এবার ছোট ভাইকে আলাদা করে বললো, ‘তোমার বড় ভাই যেভাবে তোমাদেরকে ঠকিয়েছিলো, মেঝ ভাইও তোমায় সেভাবে ঠকাবে। কেননা, সে তোমার বড়। তুমি চাইলে সব নারকেলই তোমার হবে।’ এ বুদ্ধি পেয়ে ছোট ভাইসহ চোররা মিলে এবার মেঝ ভাইকে মেরে তাড়ালো। ছোট ভাই এবার সব নারকেল দাবি করলে চোররা মিলে ছোট ভাইকে মেরে তাড়িয়ে সব নারকেল তারা নিয়ে গেলো।’

এ গল্পটি ইদানিং খুব মনে পড়ছে। কারণ, গত চার মাসে কয়েকজন মানুষ, ব্লগারকে নাস্তিক ট্যাগ দিয়ে ইচ্ছেমতো খুন করছে। এর সবশেষ শিকার হলেন নিলয় নীল। এর আগে রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, বাবু, অনন্ত বিজয়কে খুন করেছে। খুনিদের কৌশল গল্পটার মতো। তারা এ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরকে বোঝাচ্ছে, আমরা ‘নাস্তিক’ মারছি, ‘ধর্মপ্রাণ মুসলমান’তো মারছি না। আর এতে ‘ধর্মপ্রাণ মুসলমান’রাও আনন্দিত! কোনো প্রতিবাদ নেই! কারন, যারা মরছে তারা তো তাদের শত্রু, ‘নাস্তিক’, কিন্তু মানুষ না!

তবে তাদের জানা উচিৎ, ‘নাস্তিক’ ট্যাগ খাওয়া এ ব্লগার নামের তরুণ বুদ্ধিজীবিদের হত্যা শেষ হলে এখনকার ‘ধর্মপ্রাণ’ মুসলমানদেরকে ‘সহি মুসলমান’ না বলে ফতোয়া দিয়ে কতল করা হবে। আর তখন তাদের বিরুদ্ধে বলা বা যৌক্তিক কোনো লেখার লোক থাকবে না। এখন এ কৌশল প্রয়োগের কারণ হলো, সাধারণ মানুষ যদি এ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, তবে তাদের স্বপ্নের ‘বাঙ্গিস্তান’ প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হবে।

রাজীব হায়দারকে হত্যার পরে প্রধানমন্ত্রী তাকে দেখতে গিয়েছেন। বিবৃতি দিয়েছেন। জনমতের বিপক্ষে যাওয়ার ভয়ে ‘বাঙ্গিস্তান’র স্বপ্নদ্রষ্টাদের মুখপত্র দৈনিক আমার দেশ বিষয়টি নিয়ে নোংরামি শুরু করে। পত্রিকায় সিরিজ আকারে ব্লগারদের বিষয়ে নাস্তিকতার কলিমা লেপার চেষ্টা করে। এতে ‘বাঙ্গিস্তানের অন্ধ মুজাহিদ’রা ব্লগার শব্দটাকে নাস্তিকতার সমার্থক হিসেবে ধরে নেয়! তালিকা করে তাদেরকে মারার জন্য ঝাপিয়ে পড়ে! আর দেশের অনেক মানুষ তাদের এ অপপ্রচারের শিকার হয়ে তাদেরকে নাস্তিক ভাবতে শুরু করে! যদিও ব্লগিংয়ের সঙ্গে নাস্তিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। আর হ্যাঁ, কোনো ব্লগার নাস্তিক হলেও তাদের লেখা, কথা, আর যুক্তির জবাব লেখা, কথা, বা যুক্তি দিয়েই দিতে হবে। চাপাতি দিয়ে না।

এখানে দেখতে হবে, বেশীরভাগ ব্লগার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে কাজ করায় স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভক্ত। আজ থেকে সাত, আট বছর আগেও অনলাইনে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর ‘একচেটিয়া রাজত্ব’ ছিলো। বিভিন্ন বিষয়ে গুজব ছড়াতো। এখন কিন্তু তেমনটা নেই। আওয়ামী লীগের পক্ষের শক্তিকে কিন্তু এই ব্লগাররাই অনলাইনে নিয়ে এসেছিলেন। তাও আবার নিজের পকেটের টাকা খরচ করে। রাতের পর রাত নির্ঘুম থেকে, দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে প্রচারণা চালিয়ে এ ব্লগাররাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থকদেরকে এ বিষয়ে সচেতন করেছিলেন। ব্লগারদের ওপরে এ খুনি চক্রটির টার্গেট’র মূল কারণটি কিন্তু এখানেই। কেননা, তাদের কারণেই অনলাইনে একচেটিয়া রাজত্ব হারাতে হয়েছে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে।

উল্লেখযোগ্য আরেকটি বিষয় হলো, যারা নাস্তিকতার অভিযোগে লিস্ট করে ব্লগারদেরকে হত্যা করছে তাদের দৃষ্টিতে কিন্তু আওয়ামী লীগও নাস্তিক। তারা এর আগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নাস্তিকতার অভিযোগ তুলেছিলো। এখনো তারা আওয়ামী লীগকে নাস্তিকদের দল মনে করে। ধর্মনিরপেক্ষতাকে তারা এখনো সাধারণ মানুষের কাছে ধর্মহীনতা বলে প্রচার করে। এ নাস্তিকতার প্রচারণা চালিয়েই তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখের বেশি মানুষকে হত্যা করেছিলো।

‘গণীমতের মাল’ মনে করে ‘নাস্তিক মহিলা’দেরকে তারা ধর্ষণ করে ‘পুরুষ নাস্তিক’দের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে! মুক্তিযুদ্ধে তারা ফতোয়াও দিয়েছিলো, ‘যারা পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করতে চায় হিন্দুরাষ্ট্র ভারতের সহায়তায়, তারা কাফের, বিধর্মী, নাস্তিক।’ এজন্যই তারা এ বিধর্মী, আর নাস্তিকদের সঙ্গে ‘জিহাদ’ করার জন্য আল বদর বাহিনী তৈরি করেছিলো! আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল অনেক সংগঠনের নেতা কর্মীও এসব খুনিদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছেন। নিজেদের পরাজয় ত্বরান্বিত জেনে সবশেষে তারা বুদ্ধিজীবিদের হত্যায় মেতে ওঠেছিলো।

১৯৭১’র বুদ্ধিজীবি হত্যার পর মেধার সেই ঘাটতি এখনো পূরণ হয়নি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে আস্তে আস্তে এই তরুণ সমাজ সেই ঘাটতি পূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেখে একাত্তরের পরাজিত শক্তি আবার রক্তের সেই হোলি খেলায় মেতে উঠেছে। ৭১’র মতো এবারো তারা ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে! তরুণ বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করে খুনিচক্র প্রথমে মুক্তচিন্তার লেখকদেরকে নাস্তিক হিসেবে ফতোয়া দিচ্ছে। ফতোয়ার স্পর্শকাতর দিক, ভোটের চিন্তা করে আওয়ামী লীগ এসব লেখকদের কাছ থেকে প্রকাশ্যেই দূরে থাকছে। আর আমরাও এ ফতোয়া বিনা বাক্যে বিশ্বাস করে যাচ্ছি!

কিন্তু ওপরের গল্পের মতো এসব হত্যাকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুক্তমনের এ তরুণ লেখক ও আওয়ামী লীগকে এভাবে আলাদা করতে পারলে তাতে সাফল্য খুনিচক্রেরই হয়। আর এতে সাফল্য আসলেই শুরু হবে আওয়ামী লীগ নিধন। তখন তারা আওয়ামী লীগকে আবার নাস্তিকদের দল হিসেবে আখ্যায়িত করার পাশাপাশি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী, জনগণের ভোটাধিকার হরণকারী ফতোয়া দিয়ে ‘জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা’য় আওয়ামী লীগের নেতাদেরকে একের পর এক হত্যার মিশনে নামলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। তখন তাদেরকে নিয়ে অনলাইনে জনমত গড়ার মতো কেউ থাকবে না। কারণ, তরুণ এ ব্লগারদের হত্যার মাধ্যমে শেষ করতে পারলেই অনলাইন জগতটা খুনিদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। বর্তমান বাস্তবতায় অনলাইনের দখল ছাড়া অফলাইনের বিজয় একপ্রকার অসম্ভব। সুতরাং এমন অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির জন্য আমরা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে দায়ী করতে পারবো না।

 

Blogger-Niloy-Neel Niloy-neel-wiki

 

নিলয়কে হত্যার পরে দেখেছি, আওয়ামী লীগের অনেক ‘সেলিব্রেটি ফেসবুকার’ নিলয়ের লেখার ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, ‘মুসলমানদের পবিত্র স্থান মসজিদকে অবমাননা করে নিলয় কেনো লিখেছেন?’ তাদের এমন গুরুতর অভিযোগের পরে নিলয়ের টাইমলাইন আমি চেক করি। সেখানে লেখা ছিলো, ‘মসজিদ আল্লাহর ঘর, এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে সাধারণ মানুষ। মসজিদ কোনো আরাম, আয়েশের বা এলাকার গৌরবের স্থাপনা নয়। মসজিদ প্রয়োজন অনুযায়ি নির্মিত হবে এটাই স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো, মসজিদকে আলিশান হতে হবে কেনো?’

‘একটি মসজিদ স্থাপিত হবে, সেখানে ইবাদতের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু তাকে সুসজ্জিত করতে হবে কেনো? আপনি আল্লাহর কাছে হাজিরা দিতে মসজিদে উপস্থিত হচ্ছেন। দীনহীন, অসহায়, পাপী একজন বান্দা। সেখানে আপনাকে এত আরাম আয়েশের দিকে লক্ষ রাখতে হবে কেনো? আল্লাহ কি তাগিদ দিয়েছেন মসজিদকে সুসসজ্জিত করার?’…এই কথাগুলো এজন্যেই বলছি, যখন দেখি একটি আলিশান মসজিদের পাশের ফুটপাতেই গৃহহীন মানুষ খোলা আকাশের নিচে শুয়ে আছে, তখন মনে হয় ধর্মের নামে মানুষ যেন অসহায় মানুষগুলোর সাথে নির্মম উপহাস করছে। মসজিদকে কেন্দ্র করে সারা দেশব্যাপি চাঁদার নামে একধরনের ভিক্ষাবৃত্তি চালু হয়েছে।’

‘যেখানে চাঁদা গ্রহিতারা যদি শতভাগ সততার সাথেও আদায়কৃত চাঁদার টাকা মসজিদের তহবিলে জমা করেন, সে ক্ষেত্রেও মসজিদ পায় ৩০ ভাগ, বাকি ৭০ ভাগ নেয় চাঁদা আদায়কারীরা। অর্থাৎ এটাকেই তারা অবলীলায় পেশা হিসেবে গ্রহণ করছেন। আর যদি চাঁদা গ্রহিতা পুরো টাকাটাই মেরে দেন সে ক্ষেত্রেও তাদের বাধা দেয়ার কেউ নেই। এ সবই সম্ভব হচ্ছে মসজিদকে দৃষ্টিনন্দন আলীশান করে গড়ে তোলার মানসে। এখানে কতটা পার্থিব স্বার্থ জড়িত আর কতটা মহান আল্লাহকে খুশি করতে সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ।’

এখন প্রশ্ন এটা কি মসজিদকে অবমাননা করে লেখা? নাকি মসজিদকে ঘিরে যে ব্যবসা, লোক দেখানোর সংস্কৃতি তার বিরুদ্ধে লেখা? তর্কের খাতিরে যদি ধরি এটা মসজিদকে অবমাননা করে লেখা, তবে মসজিদকে কেনো দৃষ্টিনন্দন করা প্রয়োজন, কেনো মসজিদে এয়ারকন্ডিশন লাগানো দরকার, তার জবাব লেখার মাধ্যমে দিলেইতো হয়। এ লেখার কারণে তো কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগার কথা না? তিনি মসজিদের দৃষ্টিনন্দনের বিরোধিতা করেছেন, মসজিদ নির্মাণের বিরোধিতা করেননি।

সেই ‘সেলিব্রেটি’দের বোঝা উচিত, ব্লগারদের খুন করার জন্য খুনীরা ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু ইসলামের কোথায় ভিন্নমতের মানুষকে খুন করার কথা বলা বা লেখা আছে? ইসলাম ধর্ম এত ঠুনকো নয় যে, কোথায় কোন ব্লগার তার ব্লগে মসজিদের দৃষ্টিনন্দনের বিরোধিতা করে কী লিখলো, আর তাতেই মসজিদের দেয়াল, ইসলাম হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে।

ভারতের মতো হিন্দু প্রধান দেশে হিন্দু ধর্মের বাড়াবাড়ি নিয়ে পিকে সিনেমায় হিন্দু ধর্মের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ ভারতের সেনাবাহিনীর সমালোচনা করে। ইসরাইলের বুদ্ধিজীবীরা গাজায় তাদের সেনা দ্বারা মানুষ হত্যার প্রতিবাদ করে। রোমের নাস্তিকরা খ্রিষ্টান ধর্মকে তুলোধুনা করে। কারণ, যেখানের যেটা সমস্যা, সেখানকার এক্টিভিস্টরা সেই বিষয় নিয়ে কথা বলবেন এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ। তাই এখানের ব্লগারদের লেখা, সমালোচনাও সেই সাধারণ নীতি অনুসরণ করবে।

সবশেষে বলবো, ব্লগারসহ দেশের সব মানুষের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। সেই দায়িত্ব পালনে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতেও যে সরকার ব্যর্থ হবে, তা বিশ্বাস করতে আমি রাজি না। আমি আশাবাদী থাকতে চাই। আমি এখনো আশা করি, এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারের বিষয়ে সরকারের বোধোদয় হবে। যেসব খুনি ধরা পড়েছে তাদের বিচার হবে।

আহসান কামরুল
১১.০৮.২০১৫ খ্রি.
ঢাকা।