ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

 

bkash

 

টাকা লেনদেনে ‘জনপ্রিয়’ হওয়ায় দেশে একচেটিয়া ব্যবসা করছে বিকাশ। তবে মানুষের এ ‘জনপ্রিয়তা’কে কাজে লাগিয়ে bkash এর নামে সাধারণ মানুষের মোবাইলে ‘ক্যাশইন’ এর মেসেজ পাঠিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন বিকাশের কর্মকর্তারা। অভিনব এ প্রতারণার মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। কোনো ধরনের সঠিক পরিচয় ছাড়াই নিজেদের কর্মকর্তাদের একাউন্ট খোলার কারণে তারা প্রতারণার আশ্রয় নিলেও স্বাভাবিকভাবে তাদেরকে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়া যায় না। এক্ষেত্রে ভূক্তভোগী কেউ অভিযোগ করলেও অসহযোগিতার মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রতারক কর্মকর্তাদেরকে বাঁচানোর জন্য উঠেপড়ে লাগেন। বিকাশের মাধ্যমে কত মানুষ, কত কোটি টাকার প্রতারণার শিকার হয়েছেন তার শেষ নেই। দিনের পর দিন নতুন, নতুন প্রতারণার ফাঁদ বের করছে বিকাশ। নানা কৌশলে তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি, কোটি টাকা।

তেমনি একটি প্রতারণার শিকার হলাম গতকাল সোমবার। টোটাল লাইফে এই প্রথম প্রতারণার শিকার হলাম। যদিও মাত্র ৫৪০ টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে আমার থেকে, তারপরেও আসন্ন ঈদের মওসুমের গুরুত্বের বিষয়টি চিন্তা করে প্রতারণার সিস্টেমটি আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করা, যাতে ঈদের সময় প্রতারণার শিকার হয়ে কারো ঈদের আনন্দ যেনো বিষাদে পরিণত না হয়।

গতকাল সোমবার ১৪.০৯.২০১৫ইং তারিখ দুপুর ১২টা ২৭ মিনিটে আমার পারসোনাল বিকাশ একাউন্ট নম্বরে আমার একজন সহকর্মীর স্বজন তাকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার একটি দোকানের এজেন্ট নম্বর ০১৭৪১৮৫৮৩৮২ থেকে তাকে ৫১০ টাকা পাঠান। যার ট্র্যানজেকশন আইডি নং- ৩২৭৬২৩২৫৮৪।  এই টাকা আসার পরে আমার এ্যাকাউন্টে মোট ব্যালেন্স ছিলো ৫৫০.৩৪ টাকা। আমার নম্বরে টাকা আসার ৩ থেকে ৪ মিনিট পরে ০১৮২৮২৪৬২৬৯ নম্বর থেকে কল আসে। সেই নম্বর থেকে কল করে বলা হয়, ‘ভাই, আপনার নম্বরেতো ৫১০ টাকা পাঠানো হয়েছিলো, এরপরে আরেকটি নম্বরের বদলে আপনার এই নম্বরে আরো ৫৪০ টাকা পাঠানো হয়েছে। দয়া করে টাকাটা রিটার্ণ করেন।’ আমি বললাম, আমি আমার ব্যালেন্স দেখে নেই, যদি ৫৪০ টাকা এসে থাকে, তবে আমি আপনাকে টাকা রিটার্ন করবো। আমি ব্যালেন্স চেক করে টাকা আমার মূল ব্যালেন্সে যোগ হয়নি বলে জানালাম। তিনি বললেন, ‘বিকাশের মেসেজ আসতে তো মাঝেমধ্যে লেট হয়, তো যদি আপনার মোবাইলে মেসেজ আসে তবে দয়া করে আপনি ৫৩৫ টাকা ০১৭৯০২৪৫৩০২ পার্সোনাল নম্বরে সেন্ড করবেন।’

এর কিছুক্ষণ পরে ‘বিকাশ’ লেখা একটি আইডি থেকে আমার নম্বরে ৫৪০ টাকা ক্যাশইন এর একটি কনফার্মেশন মেসেজ আসে, যাতে লেখা ছিলো-‘Cash In Tk 540.00 from 01961116866 successful. Fee Tk 0.00. Balance Tk 1,090.78. TrxID 3277235345 at 14/09/2015  12:38’। এরপরে আমাকে ফোন  করে ০১৭৯০২৪৫৩০২ নম্বরে সেন্ড মানির চার্জ ৫ টাকা বাদে ৫৩৫ টাকা রিটার্ন দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। বিকাশ থেকে আসা মেসেজ দেখে ভাবলাম, যেহেতু তিনি টাকাটা ভুলক্রমে দিয়েছেন তাই তার টাকাটা রিটার্ন করাই সমীচিন। তাছাড়া, বিকাশের ব্যবসা করে একজন দোকানদার আর দিনে কতো টাকা ব্যবসা করেন, তার ওপরে যদি ৫৪০ টাকা গচ্ছা যায়! আমি সরল বিশ্বাসে ৫ মিনিটের মধ্যে দুপুর ১২.৪০ মিনিটে উক্ত ০১৭৯০২৪৫৩০২ নম্বরে ৫৩৫ টাকা সেন্ড করি। যার ট্র্যানজেকশন আইডি নম্বর:- ৩২৭৬৩১৩২৯৩। টাকা সেন্ড হওয়ার পরে বিকাশ থেকে আসা কনফার্মেশন মেসেজে আমার মূল ব্যালেন্স দেখায় মাত্র ১০ টাকা ৩৪ পয়সা। এ মেসেজ দেখে আমি বুঝতে পারলাম যে, আমার সঙ্গে অনলাইনের ‘বাল্ক এস.এম.এস’ সার্ভিসের মাধ্যমে বিকাশের নাম ব্যবহার করে কৌশলে প্রতারণা করা হয়েছে। এবার বুঝলাম, মোবাইলে ভুলে ২০ টাকা আসলেও মানুষ কেনো সেটা রিটার্ণ দেয় না!

বিশ্বাসকে তখন রাগে পরিণত করে আমি তাকে তার প্রতারণার কথা জানিয়ে আমার টাকা ফেরত চাই। তখন তারা আমাকে টাকা ফিরিয়ে দেয়ার প্রলোভন দিয়ে আবার ১০০০ টাকা ক্যাশইন এর অফার দিয়ে আমার বিকাশ নম্বরের পাসওয়ার্ড চায়। আমি তাদেরকে প্রতারণার বিষয়টি আবারো বললে তারা বলে, ‘যেহেতু আপনি বিশ্বাস করছেন না, তাই আমাদেরকে বিকাশের একটি এজেন্ট নম্বর দেন। আমরা সেই নম্বরে আপনার ৫৪০ টাকা পাঠিয়ে দেবো।’ এবার তাদেরকে আমার অফিসের নিচের একটি দোকানের এজেন্ট নম্বর দেই। যার নম্বর ০১৮৫৫৫৬৭৬৭৭।

কিছুক্ষণ পরে তারা বলে, ‘আপনার দেয়া এজেন্ট নম্বরে আমরা টাকা পাঠিয়েছি।’ বিষয়টি ওই দোকানে গিয়ে এজন্টকে জানালে তিনি বলেন, ‘আমার নম্বরে নতুন করে কোনো টাকা আসেনি।’ কিছুক্ষণ পরে দেখেন তাকেও ‘বাল্ক এসএমএস’ এর মাধ্যমে বিকাশ নামের সেন্ডার থেকে ১৯,৫০০/- টাকা ক্যাশআউটের মেসেজ দেয়া হয়। এতে বিষয়টি আবারো ধরা পড়ে, এবং প্রতারকচক্রের প্রতারণার বিষয়টি জানিয়ে ওই এজেন্টকে ব্যালেন্স না দেখে কাউকে টাকা ট্রান্সফার করতে নিষেধ করি। এরপর ওই এজেন্ট বললেন, ‘গত কয়েকমাস আগে তিনিও হুবহু একই প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন। ওই সময় তার এজেন্ট নম্বরেও বিকাশ লেখা আইডি থেকে এমন একটি মেসেজ আসে এবং ব্যস্ততার মধ্যে তার নম্বর থেকে একই কায়দায় ৬,০০০/- ছয় হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলো। তিনিও বিকাশের থেকে এস.এম.এস আসায় সরল বিশ্বাসে ব্যালেন্স চেক না করেই ৬,০০০/- ছয় হাজার টাকা প্রতারকদের ফাঁদে পড়ে সেন্ড করেছিলেন।’

পরবর্তীতে আমার নম্বরে ৫১০ টাকা সেন্ডকারি এজেন্টকে ফোন দিলাম। বিষয়টি তাকে জানালে তিনি বলেন, ‘আমার নম্বরে টাকা পাঠানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার এজেন্ট নম্বরে ০১৭৯০২৪৫৩০২ নম্বর থেকে কল করে বলা হয়, আপনি কিছুক্ষণ আগে ৫১০ টাকা সেন্ড করেছেন সেই নম্বরে টাকা যায়নি। আমি মেসেজ চেক করে বললাম টাকা গেছে। তারা বললো, আপনি সঠিক নম্বরে পাঠিয়েছেন কি না আমরা শিউর হবো, আপনি নম্বরটা বলুন। আমি আপনার নম্বরটা বললাম।’ তখনি আমার ধারণা হয়, এই এজেন্টও প্রতারকচক্রের হয়ে কাজ করছেন। না হলে তিনি আমার নম্বর প্রতারকচক্রকে সরবরাহ করবেন কেনো? আর তার এজেন্ট নম্বরে যে গ্রামীনফোন নম্বর থেকে কল আসে বলে আমাকে জানিয়েছেন, সেই নম্বরেই প্রতারকচক্র টাকা নিয়েছেন।

এরপর অফিসে এসে বিকাশের কাস্টমার কেয়ারের ইমেল support@bkash.com এ প্রতারণার বিষয়টির বর্ণনা দিয়ে একটি লিখিত অভিযোগ করি। ওই লিখিত অভিযোগপত্রে ০১৭৯০২৪৫৩০২ পার্সোনাল নম্বরটি ব্লক করে উক্ত নম্বরের মালিককে সনাক্ত করে প্রতারক চক্রকে শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহন, প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ০১৮২৮২৪৬২৬৯, ০১৯৬১১১৬৮৬৬ নম্বরগুলো বিকাশ রেজিস্ট্রেশন করা থাকলে উক্ত নম্বরগুলো ট্রেস করে ওই নম্বরের মালিকদেরকে শাস্তির আওতায় আনা, ০১৭৪১৮৫৮৩৮২ নম্বরের এজেন্ট এই প্রতারকচক্রের সঙ্গে জড়িত আছেন কি না, তা তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করি। যাতে আসন্ন ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে ভবিষ্যতে জনসাধারণের এই প্রতারকচক্র সাধারণ মানুষের সর্বস্ব হাতিয়ে নিতে না পারে। অনলাইনে বাল্ক এস.এম.এস ব্যবহার করে বিকাশের নামে কেউ যাতে কারো মোবাইলে এস.এম.এস পাঠাতে না পারে, বিটিসিএলসহ টেলিযোগাযোগের যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে তা বন্ধ করার অনুরোধ জানাই। নতুবা বিকাশের অসহযোগিতার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক, র‌্যাব, ডিবি পুলিশসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এবং গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করবো বলে তাদেরকে অবহিত করি। কারণ, বিকাশের নামে মোবাইলে মেসেজ আসায় জীবনে প্রথমবার আমার মতো একজন শহুরে পেশাজীবি পর্যন্ত প্রতারণার ফাঁদে পড়েছি, সেখানে গ্রামীণ সাধারণ মানুষের বিষয়টি সহজেই অনুমেয়।

বিষয়টি তদন্তের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে জানিয়ে কিছুক্ষণ পর তারা ফিরতি ইমেলে আমাকে জানায়। পাঠক, তবে সেই তদন্তের আগে আপনি যাতে নতুন করে প্রতারণার শিকার না হন, সেজন্যই মূলত: এ লেখা। আশা করছি, বিকাশের এমন অভিনব প্রতারণার হাত থেকে মুক্ত থাকবেন সবাই। সেই সঙ্গে বিকাশের ‘তদন্ত’ আলোর মুখ দেখুক, আইনের আওতায় আসুক প্রতারকরা, সেই কামনায়…।

আহসান কামরুল
১৫.৯.২০১৫ খ্রি.
ঢাকা।