ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

মি. মোস্তফা সারওয়ার ফারুকি, আপনাকে জানাচ্ছি, আজ ২৯ অক্টোবর। আপনি কী জানেন আজ বাংলাদেশের মানুষের খুশির অন্যতম একটি দিন? আপনি এটা জানবেন না, জানলেও মানবেন না জেনেই আপনাকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর, বুধবার দিবাগত রাতে ঢাকার আগাসাদেক রোডের ১০৯ নম্বর বাড়ীতে এ জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জন্ম হয়েছিলো। এমন একটি দিবাগত রাতে তার জন্মে আপনি খুশি না হলেও জাতির এ শ্রেষ্ঠ সন্তানের জন্মদিনে তাকে আমি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই, আপনার মতো ‘প্যান্টের ওপর আন্ডারওয়্যার পড়া সুপারম্যান’রা ছাড়া শ্রদ্ধায় নত সারা জাতি।

বলবেন, আপনার ওপর আমার এতো ‘ঘৃণা’ কেনো? আর আমার এ ‘ঘৃণা’ লইয়া আপনি কি করিবেন? তাই বলছি, গত ২৬ অক্টোবর ফেসবুকে আপনার স্ট্যাটাসে পাকিস্তানপ্রীতি ‘জায়েজ’র বিষয়ে ফতোয়া প্রসব করেছেন! পাকিস্তানকে ঘৃণার বিষয়ে আপনি বলেছেন, ‘মৃত মানুষদের ঘৃণায় অভ্যস্ত এ কোন আধুনিক দেশপ্রেমিক গোষ্ঠীর জন্ম দিচ্ছি আমরা?’

 

Faruki
আপনার এ প্রশ্নের জবাবে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের গল্পটিই বলছি। ১৯৭১ এর উত্তাল সময়ে মতিউর রহমান কর্মরত পাকিস্তানের বিমান বাহিনীতে। তখন ছুটিতে দেশে এসেছিলেন তিনি। খানসেনাদের অত্যাচার ও ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। আর সে ধ্বংসযজ্ঞ আপনার মতো প্যান্টের ওপর আন্ডারওয়্যার পড়া ‘সুপারম্যান নির্মাতা’র নির্মিত ‘বিজ্ঞাপন, টেলিফিল্ম, আর নাটক’র চেয়েও ভয়ংকর ছিলো! তা দেখে ভৈরব এলাকায় ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন। যে করেই হোক পাকিস্তান থেকে একটি বিমান ছিনতাই করে এনে স্বাধীন বাংলাদেশে বিমান বাহিনী গড়ে তোলার দৃঢ় অথচ গোপন পরিকল্পনা নেন। কয়েকবারের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। সবশেষে সফল হন ২০ আগষ্ট, শুক্রবার। রশীদ মিনহাজ নামে তার এক ছাত্রের একাকী প্রশিক্ষণ ছিলো সেদিন। প্রশিক্ষণের জন্য টি-৩৩ বিমানটি নিয়ে রশীদ মিনহাজ এগিয়ে এলো। রানওয়েতে দ্রুত সামনে এগিয়ে যান মতিউর। ইশারা দিয়ে বুঝালেন বিমানের পেছনের দিকে সমস্যা আছে। মিনহাজ বিমানের কেনোপি (উপরের ঢাকনা) খুলতেই দ্রুত লাফ দিয়ে বিমানের ভেতরে প্রবেশ করলেন তিনি। হাতের ক্লোরোফরম দেয়া রুমাল মিনহাজের নাকে ধরলেন। মিনহাজ অজ্ঞান হলে তাকে উঠিয়ে পেছনের সিটে রাখলেন। রাডার ফাঁকি দিয়ে বিমানটি নিয়ে পালাচ্ছিলেন মতিউর। একপর্যায়ে মিনহাজের হুশ আসে। ধস্তাধস্তি শুরু হয়। বিমানটি তবুও চালাছিলেন মতিউর। আর মাত্র মিনিট চারেক বাকী ছিলো ভারতের সীমান্ত ঘাটি। না, আর পারলেন না। পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের জিন্দাগ্রামে বালির এক পাহাড়ে আছড়ে পড়লো ‘ব্লু বার্ড-১৬৬’ নামের ‘টি-৩৩’ বিমানটি। মতিউরের সঙ্গে প্যারাসুট না থাকায় তিনি নিহত হন। তার মৃতদেহ ঘটনাস্থল হতে প্রায় আধ মাইল দূরে পাওয়া যায়। পাকিস্তানের ‘সরকার’ (কোট, আনকোট দিলাম। কারণ, তখন হানাদাররা পাকিস্তানের বৈধ সরকার ছিলো না।) তাকে করাচির মাসরুর বেসের চতুর্থশ্রেনীর কবরস্থানে সমাহিত করে। এমনকি তার কবরের বাউন্ডারি ওয়ালে ‘জাতীয় গাদ্দার’ লিখে রেখেছিলো ওই নরপিশাচরা। আর রশিদ মিনহাজকে জাতীয় বীরের সম্মান সূচক খেতাব দেয়।

এবার আপনাকে বলতে চাই, মতিউরের মৃতদেহকে চরম অপমান করে চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারিদের সঙ্গে সমাহিত করা হয়েছিলো, তাতে আপনার এ ‘বিবেক’ জেগে ওঠে না? যখন তার কবরে ‘জাতীয় গাদ্দার’ শব্দটি লিখে অপমানের চুড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেলো হায়েনারা, আপনি এটা জানলেন, তখনও এ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গল্পের কোনো প্লট মাথায় আসে না আপনার? জানি আসবে না।

 

P_O_Waleed_E_Karim_with_other_pilots_2
একজন বীরশ্রেষ্ঠ’র মৃতদেহকে এভাবে অপমানের পরেও এখনো ক্ষমা চায়নি আপনার ‘পেয়ারে পাকিস্তান’! আর ওই দেশের মানুষ এখনো বাধ্য করতে পারেনি মৃতদেহের এ অপমানের জন্য সরকারকে ক্ষমা চাওয়াতে। বরং তারাও এতে পুলকিত হয়। আরো বুঝিয়ে বলতে হবে আপনাকে, ইন্টারনেটের এ যুগে কেনো এ প্রজন্ম ঘৃণা করে পাকিস্তানের মানুষকে? কেনো তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সবধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বলে?

সবশেষে ফ্রি’তে একটা পরামর্শ দেবো, প্রতিদিন এ পরামর্শটা পড়ে এক গ্লাস পানি খাবেন, এতে আপনার পাকিস্তানফোবিয়াটা কেটে যাবে। পরামর্শটা হলো, ‘প্যান্টের ওপর আন্ডারওয়্যার পড়ে নিজেকে সুপারম্যান ভাবাটা যেমন বোকামি, ঠিক তেমনি কয়েকটা টিভিসি, ফুল, পাখি, লতা, পাতার দুয়েকটা টেলিফিল্ম, নাটক বানিয়ে নিজেকে জহির রায়হান ভাবাটাও ঠিক না। এ ভাবটা কমান।’

জাতির শ্রেষ্ঠ এ সন্তানের জন্মদিনে তার জন্য আবারো বিনম্র, ফুলেল শ্রদ্ধা, আর ভালোবাসা রইলো।

আহসান কামরুল
২৯.১০.২০১৫ খ্রি.
ঢাকা।