ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

মোস্তফা সারওয়ার ফারুকির পাকিস্তানফোবিয়া, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের গল্প শিরোনামের বিডিনিউজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখাটির নিচে ফেসবুকে আমার আইডিতে Syed Mahmud Husain নামের একজন ভদ্রলোক ফারুকির পাকিস্তানফোবিয়ার আত্নপক্ষ সমর্থনে নিম্মোক্ত মন্তব্য করেন,

Faruki

আস সালামু আলাইকুম,
ভাইয়া, তোমার বেশ কয়েকটি লেখা আমি পড়েছি। তোমার লেখনীর দক্ষতা আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে। যে বিষয়ে তুমি সবচেয়ে বেশী পারদর্শী, সেটা হলো যুক্তি। তবে এই লিখাটিতে কিন্তু আবেগের ঠেলায়, যুক্তি কাছে ভিড়তে পারছে না।

Hope friends in Afghanistan and Pakistan are safe! Feeling sad for the lost souls!
উপরের দুটি লাইন লিখেছিল ফারুকী। এর মধ্যে পাকিস্তান প্রেম বলে কিছু নেই। তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করতে বলেনি। বলেছে ভুমিকম্পে দুর্গতদের প্রতি সমবেদনা জানানোর কথা। আজকে ঘটনাক্রমে, সেই দুর্গত অবস্থা আফগানিস্থান ও পাকিস্থানের। অন্যদিন, অন্য কোনো দেশের দুর্গতদের প্রতি সমবেদনা ছিলো, থাকবে। কিন্তু আমাদের এই দেশে, পাকিস্থানের নাম দেখে, না বুঝেই মানুষ তাকে বাজে কথা শোনানো শুরু করেছে। এজন্য, পরের পোস্টে সে তার ভীতির কথা জানিয়েছে। এই ভীতি তোমাদের প্রজন্মকে নিয়ে, যারা পাকিস্থান ও ভারতের প্রতি অন্ধ প্রেম অথবা অন্ধ ঘৃনা নিয়ে বসে আছে। তার কথাটি তুমি প্রমানও করে দিলে!

বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে ইসরাইলে যাওয়া যায় না। কারন ওই দেশটি আমাদেরকে এখনো স্বাধিন দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দেয় না। পাকিস্থানের প্রতি যদি আমাদের এতই ঘৃনা থাকে, তাহলে আমাদের সাথে পাকিস্থানের সম্পর্কটা তেমন হতে পারতো। কিন্তু পরিস্থিতি তেমন নয়। এই দুই দেশের এক দেশ থেকে অন্য দেশে বৈধ ভিসায় যাওয়া যায়। দুই দেশের নেতারা হাত মিলিয়ে, কোলাকুলি করে, গালে চুমা দিয়ে, বৈঠক করেন। দুই দেশের খেলোয়াড়েরা মাঠে খেলেন। এমনকি পাকিস্থানী গায়ক পর্যন্ত আমাদের দেশে এসে অনুষ্ঠান করে। লক্ষ লোক সেই অনুষ্ঠান দেখে। তখন আমাদের চেতনায় আঘাত লাগে না। ওদিকে একজন লোক পাকিস্থানের ভূমিকম্প দুর্গতদের কুশল কামনা করেই বিরাট অন্যায় করে ফেলেছে।

তাছাড়া, বীরশ্রেস্ট মতিউর রহমানের ইতিহাসের সাথে ফারুকীর কথার কোন সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশের প্রতি মমতা থেকে বিমান চুরি করার চেস্টা করেছিলেন তিনি। চুরি একটি জঘন্ন কাজ হলেও আমরা তাকে হিরো বানিয়েছি। এটা আমাদের জন্য ঠিক আছে। আবার পাকিস্তানীরা তার কবরে গাদ্দার লিখে রেখেছে, এটাও তাদের জন্য ঠিক আছে। কারন মতিউর রহমান আমাদের দেশের জন্য দেশপ্রেমিক হলেও পাকিস্তানের জন্য চোরই ছিলো। তারা কেনো মতিউর রহমানকে সন্মান করবে? আমি নিজেও টুকটাক দুই কলম লেখার চেস্টা করেছি। তাই এই লেখার জগত কিছুটা হলেও চিনি। এই ধরনের আবেগী লেখার ভালো ডিমান্ড আছে, এবং এসব দিয়ে সরাসরি কর্তা ব্যাক্তিদের নজরও কাড়া যায়। কিন্তু সত্যি বলতে কি, এমন আবেগে তোমাকে মানায় না, তোমাকে যুক্তিতেই বেশী মানায়। আমি তোমার ভাই বলেই সরাসরি কথাটা বললাম। কিছু মনে করোনা, প্লিজ। যুক্তিপুর্ন লেখা চালিয়ে যাও – তোমাকে চিনবে বাংলাদেশ।

তার এ মন্তব্যের জবাবে আমার প্রতিমন্তব্য,

ধন্যবাদ, পরামর্শের জন্য। ‘তবে এই লিখাটিতে কিন্তু আবেগের ঠেলায়, যুক্তি কাছে ভিড়তে পারছে না’, এর সঙ্গে সহমত না। মি. ফারুকি তার লেখায় পাকিস্তানের বিরোধিতার বিষয়ে এখনকার তরুণ সমাজের প্রতি যে বিরুপ মন্তব্য করেছেন, তার জন্য তার ক্ষমা চাওয়া উচিত। কারণ, পাকিস্তানের সরকার এখনো মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যা, ধর্ষণ, মৃতদেহের চরম অসম্মানপূর্বক গণকবর দেয়া ইত্যাদির জন্য ক্ষমা চায়নি। পাকিস্তানের ভেতর থেকে কয়জন তাদের কৃতকর্মের জন্য সরকারকে ক্ষমা চাইতে বলে? বরং এ ঘটনায় তারা এখনো পুলকিত হয়। আপনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইতে বাধ্য করান, আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আর কেউ করুক আর না করুক, আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দেবো। এটা না হলে তাদেরকে ক্ষমা না করাটা কী পাকিস্তানের অন্ধবিরোধিতা? আর পাকিস্তানের সঙ্গে তখন হাত মেলানোটা হয়তো তখন দরকার ছিলো, আটকে পড়া মানুষদেরকে নিরাপদে দেশে নিয়ে আসার জন্য। এখন এটার কোনো প্রয়োজন নেই। ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষে আমি, এটাকে আপনি অন্ধবিরোধিতা বলবেন?

আপনি বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের কথা বলেছেন। জানিয়েছেন, আমাদের দেশের পাসপোর্ট নিয়ে সেখানে যাওয়া যায় না। তবে, এটাও জানবেন, তাদের পাসপোর্ট নিয়েও বাংলাদেশে আসা যায় না। আর ওই দেশটি আমাদেরকে এখনো স্বাধিন দেশ হিসাবে স্বীকৃতি না দেয়ার কারণ হলো, আমরাও তাদেরকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেইনি।

এদেশে এসে পাকিস্তানি গায়কের অনুষ্ঠান, ক্রিকেটারদের আগমন, আর ‘লক্ষ মানুষ’র উপভোগের কারণ হলো তাদেরকে নিজেদের ইতিহাস থেকে যুগের পর যুগ দূরে রাখা হয়েছে। যারা সেটা উপভোগ করে, তাদের প্রায় ৯৮ শতাংশই ব্রেইন ওয়াশড। তবে এই লাখের বিপরীতে কোটিরও একটা হিসাব আছে, যারা সে প্রোগ্রাম দেখতে যায় না। তবে, অবাধ তথ্য প্রবাহের এ যুগে তরুণ এ প্রজন্মকে ব্রেইন ওয়াশড করাটা দূরুহ। এ কারণেই বাঙ্গালিয়ানা তারুণ্যের সংখ্যাই বাড়ছে, কোনো দেশের প্রতিই অহেতুক ঘৃণা, বা প্রীতির প্রজন্ম নয়। আর তারা এটা ভালো করেই স্বীকার করে, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গেই অহেতুক শত্রুতা নয়।’ তার মানে এটা না যে, আরেকজন মা, বাবাকে অহেতুক গালি দেবে, বেয়াদবি করবে আর এ প্রজন্ম দুই কান পেতে দিয়ে তা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনবে! জেনে রাখবেন, এ প্রজন্ম এতোটা ভদ্র না। এমন ভদ্র আমি নিজেও না!

আপনি বলেছেন, ‘বীরশ্রেস্ট মতিউর রহমানের ইতিহাসের সঙ্গে ফারুকির কথার কোনো সম্পর্ক নেই।’ এটা ঠিক না। এটা প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, ‘এমনকি ভূমিকম্পে ধ্বসে যাওয়া দালানের নীচে আটকা পড়া লাশের জন্যেও বরাদ্দ থাকবে সেই ঘৃণা?’ বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের মৃতদেহের সঙ্গে তারা কী করেছিলো, সেই ঘটনা এর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক না? জেনে রাখবেন, পাকিস্তানীরা ফারুকির যতোই বন্ধু হোক এখনো তারা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হোলসেল ঘৃণা বরাদ্দ রেখেছে। বিশ্বাস না হলে যে কোনো পাকিস্তানীর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিরোধি কথা বলে দেখবেন!

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের বিমান নিয়ে আসাকে আপনি ‘চুরি’ আখ্যায়িত করে তার কবরে পাকিস্তানীদের ‘গাদ্দার’ লিখে রাখার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। এর তীব্র প্রতিবাদ করছি। নিজের অধিকার ছিনিয়ে আনাকে যদি চুরি বলে, তবে ডিকশনারি থেকে চুরির সজ্ঞাই পাল্টে দিতে হবে। আরে ভাই, চোরতো ছিলো পাকিস্তান। তারা এ দেশের জনগনের ন্যায্য অধিকার চুরি করেছিলো। এবার আপনিই বলুন, ৭১’এ এতো বড় গণহত্যার পরেও যারা হত্যাকারীদের পক্ষ নেয়, মজলুমকে যারা ‘চোর’ আখ্যা দিয়ে তাদের কবরে ‘জাতীয় গাদ্দার’ লিখে রাখে, তাদেরকে ঘৃণা করাকে আপনি অন্ধ ঘৃণা বলবেন? এটাকে আপনি অন্ধ ঘৃণা বলতে পারেন, এখনকার প্রজন্ম যারা এ ইতিহাস জানে তারা এটাকে অন্ধ ঘৃণা বলবে না। এ ঘটনা শুনলে বিবেকবান যে কারো অন্তরে তাদের জন্য ঘৃণা জন্মাবে।

এটা কোনো ধরণের ‘অন্ধ আবেগ’র লেখা না। আল্লাহর কসম করে বলছি, গত কয়েকদিন থেকে মতিউরের এ বীরত্বগাথা মনে পড়লেই গায়ের লোম দাড়িয়ে যায়, শরীর হিম হয়ে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়। জানি, ফারুকিরা এটা বোঝবেন না, আর তাদের বুঝার দরকারও নেই।

আহসান কামরুল
৩১.১০.২০১৫ খ্রি.
ঢাকা।