ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতার খবর। এ অস্থিরতা শিক্ষক কোন্দলে, ছাত্র সংগঠনের কোন্দলে-নানা দাবি দাওয়া নিয়ে। সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ আর বিরোধী দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের মারামারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরও অস্থির করে তুলেছে। ছাত্রদলের দাবি, সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন তাদের নেতাকর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোতে ঢুকতে দিচ্ছে না। ক্যাম্পাসে ঢুকতে গিয়ে ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলায় ছাত্রদলের অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছে। এখন পাল্টা প্রতিরোধে নানা হুঙ্কার ছাত্রদলের।

তবে ১৭ সেপ্টেম্বর শনিবার চীর বৈরী এ দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ঘটলো সুন্দর এবং শান্তির ঘটনা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন শান্তির ঘটনা ঘটলো। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতিতে যে ঘটনা ঘটলো- গত কয়েক যুগে এমন উদাহরণ বিরল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নব নির্বাচিত নেতারা বুক টান করে ক্যাম্পাসে গেলেন। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সেই চিরাচরিত ধাওয়া বা পিটিয়ে হটিয়ে দেওয়া তো দূরের কথা, ছাত্রলীগ তাদের বুকে টেনে নিল। শুধু কি বুকে টেনে নিল, ফুল দিয়ে, ছাত্রদল নেতাদের মুখে মিষ্টি তুলে দিয়ে তাদের বরণ করে নিল। সারাদেশে ছাত্রলীগ একটা চমৎকার উদাহরণ সৃষ্টি করলো। নব্বই দশকের পর ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে এটা একটা ইতিহাসও বলা যায়।

ছাত্রদলের নেতাদের বরণ করে ছাত্রলীগের নেতারা বলছেন, ছাত্রদল ক্যাম্পাসে না গেলে রাজনীতি করবে কাদের সঙ্গে। সত্যিই তো তাই। পুরনো ঢাকার এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে নানা বিষয়ে এক সময় দাঙ্গা হাঙ্গামা লেগেই থাকতো। ১২ সেপ্টেম্বরের এমন বিরল ঘটনার পর মনে হচ্ছে এর দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।

তবে ছাত্রলীগের নেতারা যাদের মুখে মিষ্টি তুলে দিলেন- তা দেখে কিঞ্চিত বিস্মিতও হয়েছি। যারা মিষ্টি মুখে নিলেন গত একযুগ আগেও তাদের জগন্নাথের ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের রাজনীতি করতে দেখেছি। আজও তারা ছাত্রনেতা! ২০০২ সালের কথা। যখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, তখন আজকের ছাত্রদলের এক নেতাকে দেখেছিলাম তিনি আমার বিভাগের বড় ভাই। আমি যখন সবে প্রথম বর্ষে, তিনি তখন ফাইনাল ইয়ারে। আমি ওই বিভাগ থেকে পাশ করে বেরিয়েছি চার বছর আগে। আর তিনি এখনও ছাত্র নেতা! জগন্নাথে ছাত্রদলের নবগঠিত নেতাদের প্রায় সবারই একই অবস্থা। সে তুলনায় জগন্নাথে এখন ছাত্রলীগের আহবায়ক কমিটির সাত নেতা একেবারেই জুনিয়র। সবাই নিয়মিত ছাত্র। তবে তাদের মেধাবী বলতে হবে। তা নাহলে জুনিয়রদের মাথায় এমন উদাহরণ সৃষ্টি করা সম্ভব হতো কিনা সন্দেহ রয়েছে। ছাত্র-অছাত্র যা হউক, ক্যাম্পাসে এমন সহাবস্থান কম কিসে। যেখানে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন ‘আদু ভাইদের’ মেনে না নেওয়ার অজুহাতে তাদের প্রতিরোধের নামে পেটাচ্ছে ছাত্রলীগের ‘সোনার ছেলেরা’।

এক সময় জগন্নাথে পড়ালেখার পাশাপাশি ক্যাম্পাস প্রতিবেদক ছিলাম। সে সুবাদে নিশ্চিত করেই বলছি, আগেও জগন্নাথে ছাত্রলীগ-ছাত্রদল সহঅবস্থান ছিল। সেটা তারা নিজেদের স্বার্থেই রেখেছে। অন্তত গত ১০ বছরে জগন্নাথে ছাত্রদল আর ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষ-মারামারি হয়েছে-এমনটা মনে পড়ছে না। টুকটাক দুই সংগঠনের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির মতো ঝামেলা হলেও তা সিনিয়র নেতারা মিটিয়ে ফেলেছেন দ্রুতই। বিপরীত দিকে এ দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে অভ্যন্তরীন কোন্দলে একাধিকবার সংঘর্ষ এমনকি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হতেও দেখেছি। আবার ক্যাম্পাস থেকে শিবির তাড়ানোর সময় ছাত্রলীগকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে নানা সহযোগীতার দৃশ্যও দেখেছি। কথিত আছে, সব সময়ের জন্য ‘সরকারী দল ৬০ ভাগ আর বিরোধী দল ৪০ ভাগ’- তা বজায় রাখতেই বৈরী দুই সংগঠনে এমন অন্তরঙ্গতা।

তবু ভালো। প্রতিদিন যেখানে নানা কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংঘর্ষ-সংঘাত লেগেই আছে, সেখানে জগন্নাথের ছাত্রলীগ আর ছাত্রদল বড় উদাহরণই সৃষ্টি করলো। তাদের এ মিষ্টি বিতরণ সব ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে অন্তত সাধারণ শিক্ষার্থীদের রক্ষা হবে আর শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা থাকবেন স্বস্তিতে।

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১২