ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ছোট বেলা থেকে একটি আতঙ্কিত শব্দ শুনে আসছি। শব্দটি ‘ছেলেধরা’ বা ‘শিশুধরা’ দল। এখনও এ শব্দটি শুনছি। খবরের কাগজ বা টেলিভিশনের খবরেও আসেঃ ‘…জায়গায় গণপিটুনিতে ছেলেধরা বা শিশুধরা চক্রের সদস্য গণপিটুনির শিকার।’ তবে যে খবরটি থাকেনা, তা হলো-যে শিশুটি ধরার সময় বা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় দলের সদস্য গণপিটুনি খেল, সেই শিশুটির খবর। থাকবে কি করে, আদৌ কি ছেলেধরা দলের কোন অস্থিত্ব আছে? বারবার এমন গুজব শুনলেও অন্ত আমি এর অস্তিত্ব পাইনি।

ইদানিং রাজধানীতেও ‘ছেলেধরা’ চক্র তৎপর হয়ে ওঠেছে নজরে পড়েছে। গত দুই মাসে অন্তত ছেলেধরা চক্রের সদস্য অজুহাতে গণপিটুনিতে মারা গেছে এক নারী। পৃথক ঘটনায় একই অজুহাতে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন আরও ৬ নারী। সর্বশেষ ১৩ অক্টোবর খোদ রাজধানীর খিলগাঁওয়ে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে নিজের শিশু ছেলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকার সময় ছেলেধরা সদস্য সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন এক মা। সঙ্গে তার আরও দুই নারী সঙ্গী।

রাজধানীতে এমন উদ্বেগজনক ঘটনায় চোখ-কান খোলা রাখলাম। খোঁজ নিতে থাকলাম-আসলেই এসব নারীরা ছেলেধরা চক্রের সদস্য কিনা? এজন্য ১৩ অক্টোবর খিলগাঁওয়ের ঘটনায় তীক্ষ্ম নজরদারী শুরু করলাম।

১৩ অক্টোবর, শনিবার। রাজধানীর খিলগাঁওয়ের পশ্চিম নন্দীপাড়ায় সকাল থেকেই গুজব ছড়িয়ে পড়ে দুই শিশুর খণ্ডিত মাথাসহ ‘ছেলেধরা’ দলের তিন নারী সদস্যকে আটক করা হয়েছে। তুলে নেওয়ার সময় তাদের হাত থেকে অপর একটি শিশুকেও উদ্ধার করা হয়েছে। এমন খবরে ঘটনাস্থল নন্দীপাড়ার ফজলুর রহমান কিন্ডারগার্টেনের সামনে ছুটে যায় পুলিশ। গণমাধ্যমের একজন কর্মী হিসেবে নিজেও খোঁজ নেওয়া শুরু করলাম। ঘটনাস্থলে সবাই বলছেন, ‘তারা শুনেছেন ওই তিন নারীর ব্যাগে দুই শিশুর খণ্ডিত মাথা ছিল।’ উপস্থিত অনেকেই এমন তথ্য দিলেন। তবে ওই মাথা কেউই দেখেননি। সবাই শুনেছেন। শুনেই তারা উত্তেজিত। পুলিশও কথিত মাথা পেল না। তবু মারধর করা হলো ওই তিন নারীকে। তাদের একজনের কোলে থাকা নিজের সন্তানকে দেখিয়ে বলা হলো-এই শিশুটাকেই ওরা নিয়ে যাচ্ছিল। ওরা ছেলেধরা দল।

খটকা বেঁধে যায়। আবার খোঁজ নেওয়া শুরু করলাম। উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ওই শিশুটি জনতার হাতে আটক এক নারীকে মা বলে ডাকছে। লোকজনের ভিড়ে সে আতঙ্কিত হয়ে কাঁদছিল। ছেলেধরা দলের এক নারীর কোলে দিতেই শিশুটির কান্না থেমে গেছে! ছেলেধরা অপবাদ পাওয়া ওই মা তার সন্তানকে বুকের দুধও খাওয়ালেন। এতেই শিশুটি শান্ত! তবে শতশত মানুষের এমন আচরণে তিন নারী আতঙ্কিত। পুলিশ তাদের উদ্ধার করে ছেড়ে দিল। এতেই ক্ষেপে যায় জনতা! শুরু হয় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। শেষ পর্যন্ত থানায় পুলিশ হেফাজতেই তিন নারীর রক্ষা।

কথা হয় খিলগাঁও থানার অফিসার ওসি সিরাজুল ইসলামের সাথে। তিনি জানালেন, নিছক গুজব থেকেই এমন ঘটনা ঘটেছে। ওই তিন নারী মিরপুর থেকে ব্যক্তিগত কাজে খিলগাঁও এসেছিলেন। তারা কেউই ছেলেধরা দলের সদস্য নন। মনে প্রশ্ন জাগে, এ গুজব কে বা কারা ছড়ালো? যার জন্য তিন নারীকে মার খেতে হলো? এটা শুধুই গুজব, নাকি পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির পায়তাঁরা?

শুধু খিলগাঁও নয়, এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কদমতলীতে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে দুই নারীকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে জনতা। তাদের এমনভাবে পিটিয়ে আহত করা হয় একটু কথা পর্যন্ত বলতে পারছিলেন না তারা। পরে জানা গেল, ওই দুই নারীর পেশা ভিক্ষাবৃত্তি। একটু ভিক্ষার আশায় তারা কদমতলীর একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর সেখানে তারা হয়ে গেলেন ছেলেধরা দলের সদস্য! আরও মর্মান্তিক ঘটনা হলো গত ২০ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ীতে ছেলেধরা সন্দেহে জনতা এক নারীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে জানা যায়, নিহত নারী মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন।

মূল কথা হচ্ছে, ছেলেধরা বা শিশুধরা আছে কি নাই-সেটা বড় প্রশ্ন নয়। যদি থাকে তাহলে- তাদের নির্বৃত্তের নামে আমরা কী আইন হাতে তুলে নিচ্ছি না? এ অধিকার সাধারণ মানুষের আছে কি? যদি না থাকে এ হত্যাকাণ্ডের, এ নারী নির্যাতনের দায় কার?

১৫ অক্টোবর, ২০১২