ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

২০০৩ সালের ২৭ এপ্রিল। বসন্তের সকাল। আমাদের গ্রামের পাশেই ভ্রমনে এসেছিলেন উপ মহাদেশের বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাকে দেখা ও তার কাছ থেকে একটি অটোগ্রাফ নেওয়ার আগ্রহে আগের রাতে ঘুমোতে পারিনি। সেদিন অনেক ভিড় ঠেলে বিখ্যাত এই মানুষটির দেখা পেয়েছিলাম। সামনে দাঁড়িয়ে তার অটোগ্রাফ নিয়েছিলাম।
গত ২৩ অক্টোবর সকালে টেলিভিশনে তার মৃত্যুর খবর শুনে মনে পড়লো সেই অটোগ্রাফের কথা। বইয়ের স্তুপ ঘেটে সুনীলের অটোগ্রাফ দেওয়া সেই ডায়েরিটি বের করলাম। আর বারবার মনে পড়ছিল তারই সেই বিখ্যাত কবিতা-‘কেউ কথা রাখেনি।’

সময়টা ২০০৩ সালের ২৭ এপ্রিল। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মগর গ্রামে এসেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এই গ্রামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পঞ্চপল্লী গুরুরাম উচ্চ বিদ্যালয়। আরেক লেখক গীতিকার ‘মোদের গর্ব, মোদের আশা-আমরি বাংলাভাষা’ গানের লেখন অতুল প্রসাদ সেনের বাবার নামে এই স্কুলটা। অতুল প্রসাদের জন্মও এই গ্রামে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচিত জন, বন্ধু ছিলেন তিনি। পঞ্চপল্লীর মতো অজপাড়া গাঁয়ে সুনীলের মতো বিখ্যাত মানুষের আগমনের হেতুও এই অতুল প্রসাদ সেন। আর সেই সুযোগে খুব কাছ থেকে দেখা এই প্রিয় মানুষটাকে।

পঞ্চপল্লীতে সুনীলের আগমনের কারণ সম্পর্কে শুনেছিলাম-কলকাতায় মারা যাওয়ার আগে অতুল প্রসাদ সেন মগর গ্রামে তাদের বিশাল সম্পতি তার বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটিতে দান করে গেছেন। সেই সম্পতির দলিল নিয়েই অতুলের জন্ম ভিটায় এসেছিলেন সুনীল। এমন মানুষের আগমনে স্কুল কর্তৃপক্ষ সেদিন এক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করেছিল। পাশের শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর এলাকার শতশত সাহিত্য পিপাসু লোকজনও অংশ নিয়েছিল ওই অনুষ্ঠানে।

অটোগ্রাফের কথায় ফিরে আসি- আমরা দুই বন্ধু-আমি আর মাসুদ। আগের দিনই দুজনে ঠিক করি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অটোগ্রাফ নেব। সেই মতো ২৭ এপ্রিল সকাল-সকালই উপস্থিত হই অনুষ্ঠানস্থলে। যদ্দুর মনে পড়ে দুপুরের দিকে পৌঁছেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হলো তাকে। শতশত মানুষের ভীড় ঠেলে বিশ্রামের জন্য তাকে নিয়ে যাওয়া হলো স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে। তিনি সেখানেই বসলেন। ভীড় ঠেলে ডায়েরি হাতে আমরা দুই বন্ধু তার সামনে হাজির। আরও অনেকেই তার অটোগ্রাফের অপেক্ষায়। অবশেষে সেই কাঙ্খিত সময় এলো। দুই বাংলায় সমান জনপ্রিয় এই মানুষটার হাতে তুলে দিলাম আমার ডায়েরিটা। সোনালী রংয়ের কালিতে ডায়রির একটি পাতায় তিনি অটোগ্রাফ দিলেন। এরপর বন্ধু মাসুদের ডায়েরিতে।

ভুবন জয় করা হসি দিয়ে ভীড় ঠেলে বেরিয়ে এসেছিলাম দুই বন্ধু। বাইরে বেরিয়ে তার হাতের লেখাটি দেখলাম। প্যাঁচানো লেখা- ‘সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়’ নিচে তারিখ ২৭/০৮/২০৩। মনে হলো তিনি যদি আরও কিছু লিখতেন ডায়েরির পাতাটায়। সেদিন হয়নি। আশায় ছিলাম, আর কোনদিন সুযোগ এলে এ আশা পূরণ করার চেষ্টা করবো। কিন্তু আমার প্রিয় এই মানুষটা ২২ অক্টোবর দিনগত রাতে না ফেরার দেশে চলে গেলেন! আর দেখা হবে না। আর অতুল প্রসাদ সেনের ভিটায় যাবেন না তিনি। তবু প্রার্থনা, ভালো থাকবেন হে লেখক।

২৪ অক্টোবর, ২০১২

***
ফিচার ছবি: এবিপি আনন্দ থেকে সংগৃহিত