ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

আপনি কি জানেন, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি ডলারের সমরাস্ত্র কেনা-বেচা হয়এবং যেসব দেশ সব সময় বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার শ্লোগান দেয়, সেসব দেশই সমরাস্ত্রের তথা মারণাস্ত্র ছড়িয়ে দেয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে? বিশ্বের সমরাস্ত্র ব্যবসায়ী দেশগুলোর তালিকার প্রথম দিকে যেসব দেশের নাম রয়েছে, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি,বৃটেন ও রাশিয়া অন্যতম।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় আরব দেশগুলোই এসব সমরাস্ত্রের মূল ক্রেতা। আরব দেশগুলো প্রতি বছর সমরাস্ত্র কেনার জন্য শত শত কোটি ডলার ব্যয় করে। বৃটিশ দৈনিক ফিনান্সিয়াল টাইমস সম্প্রতি আমেরিকার সঙ্গে চারটি আরব দেশের বিশাল অংকের অস্ত্র ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরের খবর ফাঁস করে দিয়েছে। আগামি চার বছরে সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বারো হাজার তিনশ’ কোটি ডলার মূল্যের সমরাস্ত্র কিনবে। এর মধ্যে সৌদি আরব ছয় হাজার কোটি ডলার, আরব আমিরাত প্রায় চার হাজার কোটি ডলার, কুয়েত এক হাজার দুই’শ কোটি ডলার এবং ওমান সাত’শ কোটি ডলারের অস্ত্র কিনবে।

আমেরিকা নানা ধরনের ভীতি ছড়িয়ে সমরাস্ত্র কিনতে আরব দেশগুলোকে উৎসাহিত করছে। বিশেষ করে তারা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ভীতি ছড়িয়ে সমরাস্ত্র ব্যবসাকে জমজমাট রাখার পথ বেছে নিয়েছে। (এর আগেও অস্ত্র বিক্রি বাড়াতে সাদ্দামকেও অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। কুয়েত দখলের পর সেই সাদ্দামকে তারা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে তুলে ধরে যাতে পারস্য উপসাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রি করা যায়।)

পাশ্চাত্যের এ পরিকল্পনার ভিত্তিতে এ চেষ্টা চালানো হচ্ছে যে, আরবরা যাতে ইসরাইলের সব অন্যায়-অপরাধ ভুলে গিয়ে ইরানকে শত্রু হিসেবে গণ্য করে। ইসরাইলের যুদ্ধমন্ত্রী ইহুদ বারাক ইরানের মোকাবেলায় আরবদের নিয়ে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠনেরও আহ্বান জানিয়েছেন। এটা যদিও ঠিক যে, আরব জনগণ ইসরাইলের গত ছয় দশকের অপরাধ কখনোই ভুলতে পারবে না, তবুও সার্বিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, আরব দেশগুলোর গুটি কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ইসলামী ইরানকে শত্রু বলে গণ্য করছে এবং এ অজুহাতে যুদ্ধাস্ত্র কেনা বাড়িয়ে দিয়েছে।

আরব দেশগুলোর কাছে যেসব অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে, তা যে ইসরাইলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে না সে নিশ্চয়তা ওয়াশিংটন, তেল আবিবকে দিয়ে রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় যে নীতিটি অবলম্বন করে তাহলো, যত অস্ত্রই আরব দেশগুলো কিনুক না কেন, তাদেরকে ইসরাইলের চেয়ে বেশি শক্তির অধিকারী হতে দেয়া হবে না। ইহুদ বারাক সম্প্রতি নিজেও এ কথা স্বীকার করেছেন।

আমেরিকা অস্ত্র ক্রয়কারী আরব দেশগুলোর কাছে এ প্রতিশ্রুতি নিয়েছে যে, অস্ত্রগুলো মার্কিন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে থাকবে এবং কখনোই ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না। ওয়াশিংটন এ বিষয়ে শতভাগ নিশ্চয়তার জন্য অধিকৃত ফিলিস্তিনের সীমান্ত থেকে দূরবর্তী স্থানে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মোতায়েন রাখতে বলেছে। বৃটেনের প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশ্লেষক জনাথন কুক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লিখেছেন, সৌদি আরবের কাছে যেসব এফ-সিক্সটিন জঙ্গী বিমান বিক্রি করা হচ্ছে,তাতে উন্নত অস্ত্র ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম নেই। ইসরাইলকে আরব দেশগুলোর চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রাখতেই এটা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। অন্যদিকে, আমেরিকা ইসরাইলকে অত্যাধুনিক জঙ্গী বিমান এফ-থার্টি ফাইভ দিতে প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছে। এ ধরনের জঙ্গী বিমানের প্রতিটির মুল্য পনের কোটি ডলার এবং এই জঙ্গী বিমানে রাডার ফাকি দেয়ার প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে।

পারস্য উপসাগরের দক্ষিণের আরব দেশগুলোতে মার্কিন সমরাস্ত্র বিক্রির একটি বড় লক্ষ্য হলো, অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মার্কিন অস্ত্র শিল্পের যে ক্ষতি হয়েছে,তা পুষিয়ে নেয়া। সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে,আরব দেশগুলোর কাছে আমেরিকার অস্ত্র বিক্রির একটি বড় লক্ষ্য হলো,নতুন নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে বেকারত্ব হ্রাস করা। যদিও আরব দেশগুলোকে এসব অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ক্রয়-মূল্যের চেয়ে চার গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। এসব অস্ত্রের সংরক্ষণ এবং পরিচালনার জন্য আরব দেশগুলোতে শত শত মার্কিন বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ দেয়া হবে। আর এসব বিশেষজ্ঞের জীবনযাপনের ব্যয়ও বহন করতে হবে আরব দেশগুলোকে। পাশাপাশি এসব বিশেষজ্ঞের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে আরব দেশগুলোতে মার্কিন প্রভাব আরো বাড়বে।

আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর নামে অস্ত্র কিনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো জনগণের সম্পদ নষ্ট করছে, এবং এর মাধ্যমে আমেরিকা ও ইসরাইলের সেবা করছে।