ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

index

মালালার নোবেল পুরস্কার পাওয়া নিয়ে যারা অসন্তুষ্ট তারা একটি বিষয় বুঝতে পারছেন না। নোবেল পুরস্কার যে বছরের পর বছর আমেরিকার ইচ্ছায় শুধু তার সেবাদাসদেরই দেয়া হচ্ছে, আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছাকে পায়ে দলে এর যে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে মালালা নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ায় এখন তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এতে করে নোবেল কমিটি নিজেরাই নিজেদের দাসসুলভ চেহারা প্রকাশ করে দিয়েছে। ভালই তো হলো।

সর্বকালের সেরা সাহিত্যিক বলে অধিকাংশের কাছে বিবেচিত কালজয়ী লেখক টলস্টয়কে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় নি। নোবেল পুরস্কার পান নি চেখভ, গোর্কি, ইবসেন, জোলা, কাফকা, রিলকে, ব্রেখ্ট্, হার্ডি, হেনরি জেমস, মার্ক টোয়েন, জেমস জয়েস, ডি জে লরেন্স ও গার্সিয়া লোরকা এর মতো দিকপাল অমর লেখকরা। অথচ কতো যদু মধুই না সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছে! টলস্টয় বলেছেন, “আমাকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় নি – এতে আমি আনন্দিত। এতো টাকা খরচ করা আমার জন্য এক সমস্যা হয়ে যেতো।”

প্রভাবহীন অখ্যাত লেখকেরা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কারণ তারা সাম্রাজ্যবাদীদের কায়েমী স্বার্থের বিপক্ষে কিছু লিখেন নি। যাঁরা পান নি তাঁরা ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণ বিরোধী মানবতাবাদী লেখক। লেখার মাধ্যমে তাঁরা সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি ব্রিটিশ আমেরিকান শোষকদের মেরুদণ্ডে আঘাত করেছেন। এজন্য তাঁরা পুঁজিবাদীদের আয়ত্তাধীন নোবেল পুরস্কার পান নি।

ভারতবর্ষের কোটি কোটি খেঁটে খাওয়া নির্যাতিত মানুষ যখন ইংরেজ বেনিয়াদের চরম দুঃশাসনের বিপক্ষে লড়ে যাচ্ছিলো রবীন্দ্রনাথ তখন শংখ নৌকায় চড়ে নৌবিহারে গিয়ে লিখছিলেন ‘সখী ভালোবাসা কারে কয়।’ তিনি ব্রিটিশ শাসকদের স্বার্থে আঘাত করে কখনো কিছু লিখেন নি। তাই তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিলো সিপাহী বিদ্রোহ পরবর্তী চরম ব্রিটিশ বিরোধী পরিবেশে। সূদুর ইউরোপে বসে কার্ল মার্ক্স এই বিদ্রোহ দমনে ইংরেজরা ভারতীয়দের উপর যে অমানবিক নির্যাতন করেছিলো তার প্রতিবাদ করে লিখেছেন কিন্তু রবীন্দ্রনাথ দেশী লেখক হয়েও ইংরেজদের বিরূদ্ধে লিখার জন্য কিছুই খুজে পান নি।

আর নজরুল অগ্নিবীনায় বিদ্রোহের ঝঙ্কার তোলে বিষের বাঁশি বাজিয়েছেন, কবিতা দিয়ে ইংরেজদের বিষদাঁত ভেঙ্গে দিতে চেয়েছেন। তাই নজরুলের কপালে নোবেল পুরস্কার দূরের কথা, কোনো ব্রিটিশ রাজকীয় পুরস্কারও জোটে নি, জোটেছে জেলদন্ড।

আমেরিকার তল্পিবাহক নয় এমন কোনো শান্তিকামী মানুষকে আজ পর্যন্ত নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয় নি। আলফ্রেড নোবেল কিন্তু বলে যান নি যে, আমেরিকা বিরোধীরা নোবেল পুরস্কার পাবে না। তিনি বলে গিয়েছেন, নোবেল পুরস্কার তাঁরাই পাবেন যাঁরা মানবতার সর্বোচ্চ উপকারের জন্য, সত্যিকারের বিশ্ব শান্তির জন্য কাজ করবেন।

অথচ নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়েছে গর্বাচেভকে যিনি আমেরিকার পরিকল্পনায় রাশিয়াকে ভেঙ্গে পৃথিবীতে স্থায়ী অশান্তির জন্ম দিয়েছেন। দেয়া হয়েছে আনোয়ার সাদাতকে যিনি ইসরাইলের সাথে অপমানজনক মৈত্রী চুক্তি করে আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করেছেন। দেয়া হয়েছে শিরিন এবাদিকে আমেরিকার শত্রু ইরানের বিপক্ষে রঙ চড়িয়ে কথা বলাই যার একমাত্র কীর্তি। দেয়া হয়েছে দালাইলামাকে যিনি আমেরিকার আরেক শত্রু চীনকে ভাঙ্গার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দেয়া হয়েছে সুদ ব্যবসায়ী ইউনুসকে যিনি আমেরিকার শোষক পুঁজির ফেরিওয়ালা হয়ে দুনিয়া ঘুরে বেড়ান, যিনি যেনতেন উপায়ে নিজের সামান্য এক চাকুরী ফিরে পাবার জন্য নিজ দেশের কোটি মানুষের স্বপ্নের এক সেতুর নির্মাণ কাজ ঝুলিয়ে দেন।
এবার দেয়া হলো মালালা নামের এক নাবালিকাকে, যাকে কেন্দ্রীয় চরিত্র বানিয়ে আমেরিকা এমন এক নাটকীয় কাহিনীর জন্ম দিয়েছে যাতে আমেরিকা তার পাশবিক আগ্রাসনের পক্ষে সাফাই গাইতে পারে। আমেরিকার এই সুচতুর ফাঁদে জড়িয়ে পড়ার জন্য আমি মালালাকে দায়ী করবো না। সে যেভাবেই হোক সমাজ বদলের কাজে অংশ নিয়েছে, গুলিও খেয়েছে। এটা তো বাস্তবতা।

মালালা যে গুলি খেয়েছিলো সেটা যে তার বর্তমান আশ্রয়দাতাদের বন্দুকেরই তা না বুঝার যথেষ্ট কারণ ছিলো তার। বাসের ভিতর ৩ ফুট দূর থেকে রাইফেল দিয়ে কাউকে গুলি করলে, সেই গুলি মাথায় আঘাত করলে আর আততায়ী তালেবান জঙ্গি হলে গুলি খাওয়া মানুষের বেচেঁ থাকার সম্ভাবনা যে একেবারেই থাকে না তা ঐ মেয়ের বুঝার দরকার কি? এতো সহজে এতো সুযোগ, অর্থ ও পরিচিতি পাওয়ার পর কেনো সে কাহিনীর এই ফাঁক নিয়ে ভাববে বা সত্যটা প্রকাশ করবে?

মালালা নির্মমভাবে খুন হওয়া শত শত ফিলিস্তিনী শিশুদের পক্ষে একটি শব্দও উচ্চারণ করে নি। আর কিছু না হোক, প্রতিবাদ তো করা যেতো। ‘বিবেকবান’ সমাজকর্মীর বিবেক চুপ হয়ে ছিলো কেনো? কোটি কোটি মানুষ ফিলিস্তানে গনহত্যার বিরূদ্ধে আওয়াজ তোলেছে। তখন কোথায় ছিলো বিশ্ব শান্তির ‘দুত’ মালালার কণ্ঠ? কে তা চেপে ধরে রেখেছিলো? প্রকৃত শান্তিবাদীরা কি কারো মুখাপেক্ষী হয়?

আমরা আমেরিকার অনুগত মিত্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি আমেরিকার শত্রু রাশিয়ার সাহায্য নিয়ে। তাই আমাদের খুন করতে আমেরিকা যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়েছিলো। যদি আমরা রাশিয়ার কোনো বন্ধু রাষ্ট্রের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করতাম তাহলে আমেরিকা আমাদের শুধু সাহায্যই করতো না, নির্যাতিত মানুষদের মুক্ত করায় বঙ্গবন্ধুকে নোবেল শান্তি পুরস্কারও দিতো নিশ্চিতভাবে।

আমেরিকার কুটকৌশল ও অপকর্মের বিপক্ষে বলা মানে জঙ্গিবাদের পক্ষ নেয়া নয়। আমি আমার সচেতনতা ও আন্তরিকতার সবটুকু দিয়ে জঙ্গিবাদের বিরোধিতা করি। জঙ্গিবাদ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ভিত্তি তৈরী করে দেয়। কে না জানে যে, আমেরিকা নিজেই জঙ্গিবাদের প্রধান রক্ষাকারী? আর জঙ্গিবাদ দমনের নামে আমেরিকার আগ্রাসন অব্যাহত রাখতেই মালালাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া।

তাই প্রতিবাদ দরকার, নোবেল পুরস্কারের অপব্যবহারের প্রতিবাদ।