ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 
kader_sidiqi-570x330

সময় কিছু মানুষকে হাস্যকর বানিয়ে ফেলে। অতীত অতুলনীয় হলেও বর্তমান তাদের কাছে বিভীষিকা, নিজেদের বর্তমান অপকর্মের জন্য। কাদের সিদ্দিকী এমনই একজন।

মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনকারী কাদের সিদ্দিকী ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রিয় এক কর্মী। যারা বঙ্গবন্ধুর নির্মম খুনের প্রতিবাদ করে খুনী জিয়ার রোষের শিকার হয়েছিলেন কাদের সিদ্দিকী ছিলেন তাদের একজন।
কিন্তু এসব কোনো কিছুই কাউকে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাতক রাজাকারদের পক্ষে সাফাই গাইবার অধিকার দেয় না। মুক্তিযোদ্ধা সনদ কি মুক্তিযুদ্ধের শত্রুদের বাঁচাতে ব্যবহার করার জন্য? এই সনদ কি পাকিস্তানের দালালদের পক্ষে কথা বলে ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ানোর জন্য?

গত কয়েক বছর ধরে কাদের সিদ্দিকী কথা ও কাজ দিয়ে রাজাকারদের জোরালোভাবে সাহায্য করে যাচ্ছেন। এটা কি কোনো প্রকৃত দেশপ্রেমিকের কাজ? উনি আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। যে কেউই এমনকি স্বেচ্ছায় আওয়ামীলীগ ছেড়ে এসে আওয়ামীলীগের চরম শত্রু হতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এটা অন্যায় কিছু নয়।

কিন্তু আওয়ামীলীগের বিরোধিতা করা মানে কি পাকি দালাল, চিহ্নিত নরঘাতক, রাজাকার শিরোমণিদের পক্ষ নেয়া? এদের বিরূদ্ধে নীরব থেকে খোঁজে খোঁজে বের করা কোন সরকারী চাকুরীজীবি পাকিদের চাকুরী করেছে? আওয়ামীলীগ বিরোধিতা মানে কি নিজের সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধাদের খুনী রাজাকারদের বুকে টেনে নেয়া? রাজাকারদের পুনর্বাসনকারী জিয়ার রাজাকার রক্ষক বউকে ভালোবেসে পাশে টানা?

যে বুকে নিষ্কলুষ দেশপ্রেম থাকে, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভালোবাসা থাকে সেই বুক কি স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীদের বুক আলিঙ্গন করতে পারে? আওয়ামীলীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বলে কি উনি জাতীয় চেতনার বিপক্ষে কাজ করতে পারেন? উনি কি তার মুক্তিযোদ্ধা সনদকে পুঁজি বানিয়ে ব্যবসা করতে পারেন? কখনো নয়।

প্রসঙ্গক্রমে একটি রিপোর্টের দিকে নজর দেয়া যায়। ২০০৮ সালে প্রথম আলো একটি সচিত্র রিপোর্ট প্রকাশ করেছিলো। এতে বলা হয়েছিলো, কাদের সিদ্দিকী জামাত-বিএনপি সরকারের আমলে টাঙ্গাইলের ৩টি ব্রীজ নির্মাণের কাজ পান এবং মাত্র ১/৩ কাজ করে প্রকল্পের পুরো টাকা তুলে নেন। সেটা শতাধিক কোটি টাকা। তিনি সেই ব্রীজগুলির বাকী কাজ আর শেষ করেন নি। এটাই কি বলে দেয় না কাদের সিদ্দিকীর রাজাকারমুখী ও আওয়ামী লীগ বিরোধী হওয়ার কারণ?

শুধুই ব্যক্তিস্বার্থের চর্চা। তাই মূল্যহীন হয়ে পড়েছে তার কথা। যখন রাজাকারদের বিচার শুরু হলো তখন থেকেই তিনি উঠে পড়ে লেগেছেন তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে রাজাকার বানাতে। অথচ এই সময়ে তিনি একটা শব্দও উচ্চারণ করেন নি গো আজম, নিজামী, সাকাদের বিপক্ষে। উনার কাছে এদের চেয়ে মারাত্মক রাজাকার মহিউদ্দিন খান আলমগীর।

মহিউদ্দিন খান আলমগীর ১৯৭১ এ পাকিস্তান সরকারের চাকুরী করেছেন। তার মতো আরো কয়েক হাজার বাংলাদেশী ঐ সময়ে এই কাজ করেছেন, প্রাণের মায়ায়। বাধ্য হয়ে সরকারী চাকুরী করা যদি মানবতাবিরোধী অপরাধ হয় তবে তো এই কয়েক হাজার লোকেরও বিচার করতে হবে। শুধু মহিউদ্দিন খান আলমগীরের বিচার করা জরুরী হয়ে গেলো কেনো? তিনি কাদের সিদ্দিকীর ব্যক্তিস্বার্থের ক্ষতি করেছেন বলে?

তা না হলে কেন কাদের সিদ্দিকী তৎকালিন পশ্চিম পাকিস্তানের পেয়ারের আমলা এম কে আনোয়ারের বিচার চাননি? কেন এম কে আনোয়ারকে রাজাকার বলেননি? এম কে আনোয়ার ১৯৭১ এ পাকিস্তানিদের চাকুরী করেছে, তার আগে আইয়ুবের পদলেহী হয়ে ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনে বাঙ্গালীদের উপর গুলি চালানোর হুকুম দিয়েছে ঢাকার ডিসি হিসেবে। ১৯৭১ এ পশ্চিম পাকিস্তানের হয়ে চাকুরী করা এমন আরো অনেকে এখন বিএনপির নেতা। তাদের কেউই কেন কাদের সিদ্দিকীর কাছে রাজাকার নয়?

কাদের সিদ্দিকী বলেননি, মহিউদ্দিন খান আলমগীর ১৯৭১ এ কোথায় কী মানবতাবিরোধী কাজ করেছেন? যে আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হচ্ছে সে আইনের আওতাভুক্ত অপরাধসমূহ হলো – হত্যা, ধর্ষন, লুট ও আগুন লাগানো। মহিউদ্দিন খান আলমগীর এগুলির কোনটি করেছেন ১৯৭১ এ? কাদের সিদ্দিকী গো আজম, নিজামী, মুজাহিদদের বিচারের আগে মহিউদ্দিন খান আলমগীরের বিচার দেখতে চেয়েছেন। যেনো গো আজম নয়, মহিউদ্দিন খান আলমগীরই ছিলেন রাজাকারদের নেতা। কাদের সিদ্দিকীর এই রাজাকার-প্রেম মোটেও অপরিকল্পিত নয়।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ কি তাদের খুনীদের সাথে প্রেম করতে কাদের সিদ্দিকীকে অনুমতি দিয়ে গিয়েছেন? মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ চিরকালীন ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য উপাদান। এগুলির বিরূদ্ধে অবস্থান নেয়া রাজাকারদের পুনর্বাসনকারী জিয়া যতোটা পরিত্যক্ত কাদের সিদ্দিকীও ততোটা অবাঞ্চিত।