ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

সারা বার্গম্যান্ বা সারা হোসেন।
উনি নাকি রাজাকারদের বিচারের দাবীতে ২০ বছর সংগ্রাম করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণে উনি নাকি কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই। তাই বুঝি উনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা এক ভিনদেশীর পক্ষে কথা বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণের কি উজ্জ্বল নমুনা!

জনপ্রিয় প্রবণতা হল, রাজনীতিবিদদের অপকর্ম মনের মাধুরী মিশিয়ে ফুটিয়ে তুলা। কিন্তু আমাদের দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যে অনেক স্বার্থান্ধ দুরাচার রয়েছে তা সহজে ভুলে যাওয়া হয়। কামাল হোসেনের মেয়ে সারা হোসেনের স্বার্থপরতাও তেমনি আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

কোনো অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হল, অভিযুক্ত ব্যক্তি আসলেই ঐ অপরাধ করেছে কি না তা নির্ণয় করা। প্রমাণ যদি হয় যে, সে সত্যিই অপরাধী তবে তাকে শাস্তি দেয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট। অপরাধীর পরিচয়, অর্জন, অতীত, জীবনসঙ্গীর অবস্থান বা অন্য কোনো কিছুই তার শাস্তিকে রুখতে পারে না।

ডেভিড বার্গম্যান্ একাধিকবার তার লিখা ব্লগে রাজাকারদের বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, বিচার বন্ধ করতে বলেছেন। এমনকি লিখেছেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ নয়, ৩ লাখ লোক খুন হয়েছে। অর্থাৎ তিনি পরিকল্পিতভাবে ইতিহাস বিকৃত করেছেন। ফলে অভিযুক্ত হয়ে শাস্তি পেয়েছেন।

আদালতে বার্গম্যান্ যেমন প্রমাণ করতে পারেন নি যে, তিনি নির্দোষ তেমনি তার স্ত্রী সারা বার্গম্যান্ও স্বীকার না করে পারেন নি যে, তার স্বামী অপরাধী। তাহলে কেনো তিনি বার্গম্যানের শাস্তির বিরোধিতা করলেন? উনি তার স্বামী, তাই? আইন সবার জন্য সমান – এ নীতির প্রয়োগ তিনি দেখতে চান না?

৭১ এ অনেক মুক্তিযোদ্ধা নিজেদের রাজাকার স্বজনকে নিজ হাতে গুলি করে মেরেছেন। তাদের এ মহান ত্যাগকে ভুলে যেতে হবে? মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে নিজের দন্ডিত স্বামীকে বেশী গুরত্ব দেয়া সারা বার্গম্যানকে আপন করে নিতে হবে?

আদালতের রায়ের বিরূদ্ধে লিখার জন্য সাংবাদিকদের উস্কানি দিয়েছেন সারা। নিজের স্বামীর পক্ষে উনার যুক্তি হল, আদালত অবমাননা ও ইতিহাস বিকৃত করলেও বার্গম্যানকে শাস্তি দেয়া ঠিক হয় নি। কারণ বার্গম্যানের স্ত্রী ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী’। তার আরেক যুক্তি হল, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে ব্রিটিশ পত্রিকা ইকনমিস্ট ও এক ভারতীয় অধ্যাপকও মিথ্যাচার করেছেন। তাদের বিচার হয় নি। তাই বার্গম্যানের বিচারও নাকি হতে পারে না।

‘যোগ্য’ আইনজীবির যুক্তি বটে। বাপ ধার্মিক হলে কি ছেলের পাপের বিচার হয় না? তাহলে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী’র স্বামী ইতিহাস বিকৃতির অপরাধ করলে তার শাস্তি হবে না কেনো? অন্য যারা ইতিহাস বিকৃত করেছে তাদের বিচার হওয়ার উপর বার্গম্যানের বিচার নির্ভর করে – এটাই বা কোন্ আইন বলেছে? এক অপরাধের বিচার পাওয়া না গেলে কি আরেক অপরাধের বিচার বন্ধ থাকে?

আর সত্য হল ইকনমিস্ট এর বাংলাদেশ প্রতিনিধিকে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। ভারতীয় অধ্যাপকের বিরূদ্ধে কেউ আদালতে অভিযোগ করে নি। বার্গম্যান্ ও ইকনমিস্ট এর বিরূদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। আদালত নিজে তো আর খোঁজে খোঁজে অপরাধীদের ধরে আনবে না।

সারা বার্গম্যানের দুঃখের শেষ নেই। এদেশের কিছু নাগরিক নাকি বিদেশীদের বিয়ে করে দিব্যি আছে। অথচ তার প্রাণের স্বামীকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে। উনি যাদের ইঙ্গিত করেছেন তাদের বিদেশী জীবনসঙ্গীরা কি এদেশের ইতিহাস বিকৃত করেছেন? তারা কি মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসা নিয়ে এদেশে বাস করছেন? না। কিন্তু উনার স্বামী এসব দোষে দোষী প্রমাণিত হয়েছেন। তাহলে অন্যদের টেনে আনা কেনো?

চাপায় যত জোরই থাকুক, তা অপরাধকে ঢেকে রাখতে পারে না।