ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 
05_National+Flag_051213

শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে চলা ২৩ বছরের লাগাতার আন্দোলন-সংগ্রামের ফলে ১৯৭১ এ যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, ৯ মাসের সে যুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্তই ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক যোদ্ধার যুদ্ধ, প্রত্যেক স্বাধীনতাকামীর নিরন্তর প্রার্থনা ছিল স্বাধীনতার পথে একেকটি সিঁড়ি। আমাদের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের চমকপ্রদ বীরত্ব বিজয়কে করে তুলেছিল অনিবার্য। তথাপি তখন কিছু দিন ছিল দিকনির্দেশক, স্বাধীনতার নিয়ামক যখন মুহুর্তের ভুল সিদ্ধান্তে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন সুদূরপরাহত হয়ে যেতো। ১৯৭১ এর ৩রা ডিসেম্বর থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত দিনগুলি ছিল তেমনি মহাগুরুত্বপূর্ণ কিছু দিন।

ঐ সময়কালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় নাটকীয় উত্থান-পতন ঘটে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র বলে ঘোষনা করেন। ভারত এ ঘোষনা অনুসরন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপক প্রচারণা চালায়।

ইন্দিরা গান্ধী বিভিন্ন দেশ সফরে যান এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের উপর পাকিস্তানীদের চালানো নির্মম হত্যাযজ্ঞের বাপারে সচেতনতা তৈরী করেন। তিনি বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক মহলের রাজনৈতিক ও মানবিক সমর্থন আদায়ে প্রচুর খাটেন। অন্যদিকে জাতিসংঘ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করে।

এগিয়ে আসে নভেম্বর মাস। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড আক্রমনে যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানীদের একের পর এক পরাজয় ঘটতে থাকে, তাদের সামগ্রিক পরাজয়ও সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তানীরা তখন কুট-কৌশল অবলম্বন করে। তারা ৩রা ডিসেম্বর ভারত আক্রমন করে, যাতে যুদ্ধটাকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে রূপ দিয়ে যুদ্ধবিরতির আশ্রয় নিয়ে পরাজয় ঠেকাতে পারে।

ভারতও পাকিস্তান আক্রমন করে। বাংলাদেশে যুদ্ধরত পাকিস্তানী সৈন্যদের উপর বিমান থেকে বোমা ফেলা ছাড়াও ভারত পশ্চিম পাকিস্তানে আক্রমন করে এর অনেকাংশ দখল করে নেয়। নিজেদের কৌশল বুমেরাং হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানীরা ভীত হয়ে পড়ে।

পরাজয় অত্যাসন্ন জেনে পাকিস্তান জাতিসংঘের কাছে আকুল আবেদন করে, জাতিসংঘ যেনো যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে ভারতকে বাধ্য করে। পাকিস্তানীদের প্রভু আমেরিকাও এর জন্য উঠে-পড়ে লাগে।

৪ঠা ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন বসে। দীর্ঘ আলোচনা শেষে ৭ই ডিসেম্বর আমেরিকার চাপে পরিষদ সৈন্য প্রত্যাহার ও তাৎক্ষনিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনে।
নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দিয়ে এ প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। আমেরিকা আবারো প্রস্তাবটি তুলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন আবারো ভেটো দেয়। ফলে পাকিস্তানীরা যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিতে পারে নি।

মজার ব্যাপার, নিরাপত্তা পরিষদের অধিকাংশ সদস্য আমেরিকার পক্ষ নেয় কিন্তু আমেরিকার চিরকালীন মিত্র হয়েও ব্রিটেন ও ফ্রান্স ঐ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সমর্থন করে নি, তারা ভোটদানে বিরত থাকে, নিরীহ নারী-পুরুষের উপর পাকিস্তানীরা বর্বর হামলা চালিয়েছে বলে।

আমেরিকার তল্পিবাহক জাতিসংঘ নিজেই পরে এর নিরাপত্তা পরিষদকে পুনরায় আলোচনায় বসার অনুরোধ জানায়। পরাজয়ের মুখে থাকা পাকিস্তানও যেকোনোভাবে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাশ করাতে মরিয়া হয়ে উঠে। পাকিস্তানের মন্ত্রী কসাই ভুট্টো বেহুঁশের মতো জাতিসংঘে উপস্থিত হয়ে সবাইকে অনুরোধ করে প্রস্তাবটি সমর্থন করতে। ১২ই ডিসেম্বর তাই নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন ফের বসে, আবারো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনা হয়।

পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত নিশ্চিত হয়ে যায় যে, কয়েক ঘন্টার ভিতরেই পাকিস্তানের পরাজয় ঘটবে। তাই তারা যুদ্ধবিরতির তুমুল বিরোধিতা করে, আলোচনাকে দীর্ঘায়িত করার কৌশল গ্রহন করে। আলোচনা চলতে চলতেই ১৬ই ডিসেম্বর এসে পড়ে। নিরাপত্তা পরিষদ কোনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার আগেই ১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্তানীরা ঢাকায় আত্মসমর্পণ করে ফেলে। জয় হয় বাঙালির।

সেই দিনগুলিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে বারবার ভেটো না দিতো তবে আমেরিকা পাকিস্তানের পরাজয় ঠেকিয়ে দিতো, ফলে বাংলাদেশ অন্ততঃ তখন বিজয়ী হতে পারতো না। আর আমেরিকা যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পর পাল্টা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নও তাদের যুদ্ধজাহাজ না পাঠালে আমাদের মহাবিপদ হতো।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত এত করেছে বঙ্গবন্ধুর খাতিরে। সেই বঙ্গবন্ধুর মহান দেশপ্রেম ও সাহসিকতাকে কি করে ভুলে যাবো?

পাকিস্তান তাদের এদেশীয় দালালদের কয়েকজনকে জাতিসংঘে পাঠায় যারা সেখানে গিয়ে বলে, ”বাংলাদেশে কোনো গণহত্যা হয় নি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক।” এ দালালদের নেতা শাহ আজিজকেই কাপুরুষ খুনী জিয়া স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে।

স্বাধীনতার ইতিহাস ও স্বাধীনতার মহানায়ককে পৃথিবীর সব ভালো মানুষই পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে, ভুলে যায় না। আবার সব যুগেই সব দেশে কিছু মানবাকৃতির প্রাণী ভিন্ন চরিত্র নিয়ে জন্মায়। এরা মানবিক গুন অর্জন করতে পারে না, দেশকে ভালোবাসতে পারে না। এদের কাছে, “টিকিয়া থাকাই চরম স্বার্থকতা।” তাই এরা স্বার্থোদ্ধারের জন্য দেশের জন্ম-ইতিহাসকেও বদলিয়ে ফেলতে পারে।