ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

পৃথিবীতে মানুষের আগমন সুত্র ধরেই লোভের যাত্রা শুরু। নিজেকে খাওয়াতে হবে, বাঁচাতে হবে, নিজের বংশধারা রক্ষা করতে হবে – এগুলি স্বার্থপরতা আর লোভের ভিত্তি নয়? তবে কথা হল, সব লোভই খারাপ নয়।

লোভ যেমন চরম খারাপ হয় তেমনি ভালো লোভও আছে। নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছা, অন্যের উপকার করার বাসনা – ভালো লোভের উদাহরণ। অবশ্য উপকার করার ইচ্ছা সবসময় নিঃস্বার্থ হয় না।

সেই হিসেবে মানুষের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো, সর্বাধিক নিঃস্বার্থ, সর্বাপেক্ষা ত্যাগী উপকার হচ্ছে সন্তানের প্রতি মা-বাবার ভালোবাসা। আগেও যেমন এটার তুল্য কিছু ছিল না পরেও কখনো হবে না। এরপর থাকবে মা-বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা। পরের জায়গাটি সম্ভবতঃ দেশপ্রেমের। খাঁটি দেশপ্রেম।

জন্মভূমিকে মায়ের মতো ভালোবাসতে পারা আর তার স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে নিজের জীবন দেয়া – এমন নির্লোভ আকাংখা কেবল মাববিকতার মহত্ততম চূঁড়ায় পৌছানো সেরা মানুষদেরই থাকে।

এদেশের লাখো মুক্তিযোদ্ধা আর ৩০ লাখ শহীদ সেই পর্যায়ের। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সঙ্গীদের বাঁচানোর জন্য নিজে একা শত্রুদের মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধ করেছেন, গুলি খেয়ে জীবন দিয়েছেন। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর যুদ্ধে যোগ দিতে বিমান নিয়ে পালিয়ে এসে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। বীরোত্তম খালেদ মোশাররফ গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা সেক্টরের কমান্ডার হয়ে যুদ্ধ করে কপালে গুলি খেয়ে আহত হয়েছেন। তাহের পা হারিয়েছেন। এসবই শুধু দেশকে ভালোবেসে।

এদেরকে এমন মহৎ কর্মে উৎসাহিত করা, তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলা নিশ্চিতভাবেই আরো মহৎ কাজ। এদের সবাইকে, এদেশের কোটি কোটি মানুষকে যুদ্ধ করার জন্য, দেশকে ভালোবাসার জন্য, স্বাধীনতার জন্য তৈরী করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ২৩ বছর সংগ্রাম করে, বছরের পর বছর জেল খেটে, বারবার ফাঁসিকাষ্ঠে গিয়ে আর শেষে স্বাধীনতার ডাক দিয়ে।

স্বাধীনতার পর বিধস্ত দেশকে পুনর্গঠন করা, যুদ্ধ-পরবর্তী দুর্বৃত্তপনা রোধ করা আর আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশকে প্রতিষ্ঠিত করাও বঙ্গবন্ধুর অবদান। পরাশক্তি আমেরিকা আর চীনের চরম বিরোধিতা মোকাবেলা করে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভ করা বঙ্গবন্ধুর আন্তর্জাতিক গ্রহনযোগ্যতার জন্যই সম্ভব হয়েছিল।

৩ মাসের ভিতর বঙ্গবন্ধু দেশকে দু’বার স্বাধীন করেছেন ভারতীয় সৈন্যদের ফেরত পাঠিয়ে।
অন্ধকারের জীবেরা আমাদের স্বাধীনতার শত্রু পাকিস্তানিদের মতোই এখনো সেই বঙ্গবন্ধুকে আড়াল করে রাখতে চায়। উপকারের প্রতিদান কৃতঘ্নতা দিয়েই দেয় এই দু’পেয়ে জংলিরা।

১৯৫৭ সাল। তরুন বঙ্গবন্ধু তাঁর অতুলনীয় সাংগঠনিক ক্ষমতা, দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ আর সাহসিকতা দিয়ে একই সাথে শেরেবাংলা-সোহরাওয়ার্দী-ভাসানীর যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভার মন্ত্রী হলেন আবার অনেক প্রবীণ ও সমবয়সী নেতাকে হারিয়ে কর্মীদের ভোটে দলের সাধারণ সম্পাদকও নির্বাচিত হলেন।
বঙ্গবন্ধুর এই সাফল্য দলের ভিতর থাকা কুচক্রী মহলের সহ্য হয় নি, এই কুচক্রীরা পরে স্বাধীনতাবিরোধী ও সামরিক শাসকদের সঙ্গী হয়েছিল।
তারা দলীয় ফোরামে দাবী তুললো, বঙ্গবন্ধুকে মন্ত্রিত্ব বা দলের পদ, যে কোনো একটি ছাড়তে হবে। বঙ্গবন্ধু সাথে সাথে রাজি হয়ে যান। হীনমন্যরা ভেবেছিল, বঙ্গবন্ধু দলের পদ ছেড়ে মন্ত্রিত্ব ধরে রাখবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু করলেন উল্টোটা। তিনি মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করলেন, দলের জন্য কাজ করাকে বড়ো মনে করলেন। এমন নির্লোভ হওয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব ছিল।

সেই নিঃসার্থপরতার পথ ধরে বঙ্গবন্ধু এদেশের বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে দিনের পর দিন আন্দোলন করেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, ৬ দফা দাবী তুলে বাঙ্গালিদের মনে স্বাধীনতার বীজ বপন করেছেন, আন্দোলন করতে গিয়ে মৃত্যুমুখে দাঁড়িয়েও বলেছেন, “আমি বাঙ্গালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলাদেশ আমার দেশ।”

পাকিস্তানিরা তখন বলে, মুজিব পাকিস্তান ভাংতে চাইছেন, মুজিবকে তাই ফাঁসিতে ঝুলতেই হবে। এদেশের মানুষ আন্দোলন করে মুজিবকে জেল থেকে বের করে এনেছে, ভালোবেসে তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছে ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে।
তিনি এদেশের ৯৮% মানুষের সমর্থন পেয়ে স্বাধীনতার মহানায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। ৭ই মার্চের বিখ্যাত ভাষনে তিনি ঘোষনা করেছেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্বে কতো অপপ্রচারই না করেছে ষড়যন্ত্রকারীরা। অথচ তার মৃত্যুর পর একটানা ২১ বছর ক্ষমতায় থেকেও খুনীরা কোনো অপপ্রচারকেই সত্য বলে প্রমাণ করতে পারে নি।
দেশে-বিদেশে বঙ্গবন্ধু বা তাঁর পরিবারের কারো কোনো অবৈধ সম্পদের খোঁজ্‌ মেলে নি, সিঙ্গাপুর-সুইজারল্যান্ডে তাদের কোনো ব্যাংক একাউন্ট পাওয়া যায় নি। সোহরাওয়ার্দীর দান করা ধানমণ্ডীর ঐ বাড়িটি ছাড়া তাঁর আর কিছুই ছিল না। সেই বাড়িতেও তিনি এত সরল, সাদামাঠা জীবন যাপন করেছেন যে আততায়ীরা সহজেই তাঁকে খুন করার সুযোগ পেয়েছে।

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু এই দেশের কিছু লোভী বিশ্বাসঘাতক নরাধমের নির্মমতার শিকার হয়েছেন তারই স্বাধীন করা দেশে।
ত্যাগী, দেশপ্রেমিক, নির্লোভ, সিংহপুরুষ বঙ্গবন্ধুকে আমরা হারিয়েছি কাপুরুষ খুনী, পাকিস্তানিদের সেবাদাস, লোভী জিয়া ও তার অমানুষ সহযোগীদের জাঙ্গলিক লিপ্সার কারণে।

আর মুনাফিক জিয়ার অপশাসনের অবসানকালে ছেঁড়া গেঞ্জির যে আষাঢ়ে গল্প শুনানো হয়েছিল তা এখন খাম্বা লিমিটেড, ডান্ডি ডায়িং আর কোকো লঞ্চের জাদুর পতাকা হয়ে সোনালী ব্যাংক এর ৮৪৯ কোটি টাকা হজম করে উড়ছে।
সিংগাপুরের মতো সুশাসিত দেশের সরকার এবং এফবিআই এর মতো বিশ্বজোড়া সুনামধারী সংস্থা জিয়ার বউ খালেদার কুপুত্রদের চুরি করা টাকার সন্ধান দিয়ে তা ফেরত পাঠানোর পরও কিছু বিপথগামী এখনো দেশের কলংক এই চোরদের পিছে রয়ে গেছে। এরাও যে একই প্রজাতির তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বঙ্গবন্ধু দেশে মদপান ও জুয়াখেলা নিষিদ্ধ করে রেখেছিলেন। তাকে খুন করে ক্ষমতায় এসে ধুরন্ধর জিয়া মদ ও জুয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, আবার এই জিয়াই ধর্মের নাম বেচে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। ক্ষমতার স্বার্থে আল্লার ধর্ম, জনগনের টাকা ও শয়তানের কুটচাল, সবই ব্যবহার করেছে দেশের প্রথম সামরিক স্বৈরাচার অভিশপ্ত জিয়া।

জিয়ার সেই অপকর্মের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে তার বউ আর ছেলেরা।
যে মহিলা ৭০ বছর বয়সেও ভ্রু প্লাক করার মতো হারাম কাজ করে নিয়মিত, বেগানা পুরুষ নিয়ে হজ্জে গিয়ে ইসলামকে উপহাস করে, পরপুরুষদের সামনে মাথার কাপড় ফেলে রাখে, জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করে, অবৈধভাবে সরকারী সম্পত্তি দখলে রেখে ভোগ করে, ছেলেকে দিয়ে ব্যাংক লুট করায়, সরকারী ভাতা নিয়েও ছেলেদের মূর্খ ও চোর বানায়, যুদ্ধকালে স্বেচ্ছায় পুরুষ শত্রুদের কাছে চলে যায় সেই অশিক্ষিত, লোভী, ভোগী খালেদা এদেশের তথাকথিত ‘ইসলামী আন্দোলনকারীদের’ নেত্রী।

ইসলামের কোথায় ইসলামের নীতি ও শরীয়াহ্ আইনের এমন লঙ্ঘনকে অনুমোদন করা হয়েছে? জেনে-শুনে এই অধার্মিক মহিলার এসব ভন্ডামিকে প্রশ্রয় দেয়ার কথা কোন্ ইসলামী আইনে বলা হয়েছে? ধর্ম ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ, বিলাসী খালেদা, তার নষ্ট ছেলে, ভ্রষ্ট দল ও বিভ্রান্ত সঙ্গীদের সমর্থন করা কোনো প্রকৃত মুসলমানের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ বিচারদিনে প্রত্যেককেই ব্যক্তিগতভাবে জবাবদিহি করতে হবে।

তাই স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে ভুলা যায় না। “এই বাংলার আকাশ-বাতাস, সাগর-গিরি ও নদী/ডাকিছে তোমারে বঙ্গবন্ধু, ফিরিয়া আসিতে যদি/”