ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

স্বাধীনতাবিরোধীদের সাম্প্রতিক এক অপপ্রচারের ব্যাপারে লিখছি। বঙ্গবন্ধু নাকি স্বাধীনতার ঘোষনা দেন নি। তাহলে ১৯৭১ এর ৭ই মার্চ কে বজ্রকণ্ঠে ঘোষনা করেছিল, “এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম?” এটা স্বাধীনতার ঘোষনা নয়?

১০ লক্ষাধিক মানুষের সামনে ৭ই মার্চের ঐ ভাষণে বঙ্গবন্ধু আরো বলেছিলেন, “তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকবা….এদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ্।” বাঙ্গালিরা সেভাবেই প্রস্তুত হয়ে যুদ্ধ করে হানাদার পাকিস্তানিদের পরাজিত করেছে।

কাপুরুষ খুনী জিয়া নিজেই তো স্বীকার করে লিখে গেছে যে, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐ ঘোষনা ছিল মুক্তিযুদ্ধের গ্রীণ সিগনাল। (সুত্রঃ সাপ্তাহিক বিচিত্রা, মার্চ ১৯৭৫)।

আবার গ্রেফতার হবার পূর্বে ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ দিবাগত মধ্য রাতে অর্থাৎ ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র বলে ঘোষনা করেন এবং ওয়ারলেস মারফৎ সেই ঘোষনা বার্তা তিনি সেই রাতেই চট্রগ্রামে আওয়ামীলীগ নেতাদের কাছে পাঠান। লিফলেট আকারে ছাপিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐ ঘোষনা পরদিন ২৬শে মার্চ সাধারণ মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সেই ওয়ারলেস বার্তা বিদেশীরাও জেনে যায়।

২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐ ঘোষনা চট্রগ্রামের কালুরঘাটের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কিছুক্ষণ পরপর প্রচার করা হতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বেতারে স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ করেন আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগ নেতারা, এদের একজন ছিলেন চট্রগ্রাম জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এম এ হান্নান। পরদিন ২৭শে মার্চও বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি একাধিকবার বেতারে প্রচার করা হয়। (সুত্রঃ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পরিচালক বেলাল চৌধুরীর স্মৃতিকথা)।

২৫শে মার্চ দিবাগত মধ্য রাতে অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে দেয়া বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি অনুসরণ করে আমেরিকাসহ সারা দুনিয়ার মিডিয়া ২৬শে মার্চ “মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেছেন” শিরোনামে সংবাদ প্রচার করে। (সুত্রঃ ওয়াশিংটন পোস্ট, দি গার্ডিয়ান, বিবিসি, আনন্দবাজার – ২৬ হতে ৩০শে মার্চ ১৯৭১)। ইন্টারনেটে পড়ে নিন ২৬শে মার্চ ১৯৭১ এর ওয়াশিংটন পোস্ট। বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন সেই প্রমাণ আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলিও ধরে রেখেছে।

জিয়া ২৭শে মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষনাটি অন্য অনেকের মতো পড়েছে মাত্র। তার আগেই ২৬ ও ২৭শে মার্চ আরো অনেকে এটা পড়েছেন অনেকবার। যদি অন্য কারোর পক্ষে ঘোষনা পাঠ করলেই কিছু হয়ে যায় তাহলে তো জিয়ার আগে-পরে আরো যারা ওটা পাঠ করেছেন তারা সবাইও তা। শুধু চালবাজ জিয়া কেন? আর জিয়ার ঐ ঘোষনা পাঠের যদি সত্যি আলাদা কোনো মূল্য থাকতো তবে তো ২৭শে মার্চই স্বাধীনতা দিবস হত, ২৬শে মার্চ নয়।

বঙ্গবন্ধুকে মহান নেতা বলে উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বেতারে স্বাধীনতার ঘোষনাটি পাঠ করার সময় জিয়া যা পড়েছিল তা হল, “I major Zia declare the independence of Bangladesh on behalf of our great leader Bangobandhu Sheikh Mujibur Rahman. ” একইভাবে অন্যরাও নিজেদের নাম উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষনাটি পড়েছেন জিয়া পড়ার আগেই। (সুত্রঃ ভয়েস রেকর্ড ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রামাণিক দলিলসমূহ)।

লক্ষণীয় ব্যাপার হল, জিয়া স্বেচ্ছায় ঐ ঘোষনা পাঠ করে নি, এমনকি সে স্বেচ্ছায় ঐ বেতার কেন্দ্রে যায়ও নি। জিয়া তখন চট্রগ্রামে কালুরঘাটের কাছাকাছি ছিল। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের সংগঠকরা তাড়াহুড়া করে স্থাপিত ঐ বেতার কেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য সৈন্য চেয়ে খবর পাঠান। সেই সুত্রে জিয়া গার্ড হিসেবে কাজ করার জন্য অন্য সৈন্যদের সাথে ঐ বেতার কেন্দ্রে এসেছিল।

রাজনৈতিক নেতা, সংস্কৃতি কর্মী ও বেতার কেন্দ্রের সংগঠকরা বঙ্গবন্ধুর ঐ ঘোষনা পাঠের পর ভাবলেন, যেহেতু এখানে সৈন্যরাও আছে সেহেতু একবার কোনো সৈনিককে দিয়ে ঘোষনাটি পাঠ করালে সৈন্যরাও যে যুদ্ধে যোগ দিয়েছে সেটা জানানো যাবে। এরপরই তারা জিয়াকে বঙ্গবন্ধুর ঐ ঘোষনাটি পাঠ করতে বলেন। অন্যদের মতো জিয়াও সেটি বঙ্গবন্ধুর নামে তাঁর পক্ষে পাঠ করে। জীবিত অবস্থায় ধুরন্ধর জিয়া নিজে কখনো এটাকে আলাদা কিছু বলে প্রচার করে নি।

ধরুন, কোনো মন্ত্রী বহুদিন সংগ্রাম করে নতুন এক আইন প্রণয়ন করলেন, ঘোষনা করলেন যে, এখন থেকে অপরাধীদের একদিনের ভিতর গ্রেপ্তার করা হবে। এরপর মন্ত্রীর এই ঘোষনাটি টিভির কোনো ঘোষক আমাদের পড়ে শুনাল। এখন তাহলে নতুন ঐ আইন প্রণয়ন ও ঘোষনার কৃতিত্ব কি টিভির ঐ ঘোষকের? কাকে আইনটির ঘোষক হিসেবে ফুলের মালায় বরণ করা হবে? ঐ মন্ত্রীকে না টিভির ঐ ঘোষককে?

পাকিস্তানের সেবাদাসদের আরেক নতুন অপপ্রচার হল, জিয়ার ঐ ঘোষণায় নাকি মানুষ যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। সত্য হল, জিয়া নিজেই যুদ্ধ করতে চায় নি। ২১শে মার্চ থেকে চট্রগ্রামের বাঙ্গালি সৈনিকরা মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম বীরোত্তমের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। অন্যদিকে ২৪শে মার্চ জিয়া চট্রগ্রাম বন্দরে গিয়েছিল পাকিস্তানি জাহাজ সোয়াত থেকে বাঙ্গালিদের মারার জন্য নিয়ে আসা পাকিস্তানি অস্ত্র খালাস করতে। বন্দরে উপস্থিত জনতার দৌড়ানি খেয়ে জিয়া পালিয়ে আসে। পরে নিজের ধূর্ততা দিয়ে বাস্তবতা ও জনমত উপলব্ধি করে যুদ্ধে যোগ দেয় জিয়া। (সুত্র: “লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে” – মেজর রফিকুল ইসলাম বীরোত্তম)।

পাকিস্তানিরা ২৫শে মার্চ মধ্য রাতে আক্রমণ শুরু করে। ঐ রাতেই বিভিন্ন জায়গায় বাঙ্গালিরা প্রতিরোধ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। পরদিন ২৬শে মার্চ মুক্তিযোদ্ধারা সারা দেশে যুদ্ধ শুরু করে। এদিকে জিয়া ঘোষনাটি পাঠ করে ২৭শে মার্চ সন্ধ্যায়। দুই দিন দেড় রাত আগে শুরু হওয়া যুদ্ধ দুই দিন দেড় রাত পরের কোনো এক ঘোষনায় শুরু হয়েছিল এটা বলা আর সন্ধ্যার মাগরিবের নামাযের আযানে ভোরের ফজরের নামায পড়া হয়েছিল বলা কি এক কথা নয়?

শুধু মুক্তিযুদ্ধের জন্য অস্থায়ীভাবে স্থাপিত কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটির পরিসর ছিল অত্যন্ত সীমিত, বিশেষ করে প্রথম দিকে। স্বল্পক্ষমতার একটা ট্রান্সমিটারই ছিল এর সম্বল। তাই এর সম্প্রচার এলাকাও ছিল খুব ছোট, মাত্র কয়েক কিলোমিটার। তাহলে জিয়া কীভাবে ১৪৩৯৯৮ বর্গ কিলোমিটারে ছড়িয়ে থাকা সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে ঘোষনাটি শুনাল?

তাছাড়া ঐ সময়ে সারা দেশে রেডিওই বা ছিল কয়টা? ঐ অস্থায়ী বেতার কেন্দ্রের কথা ঐ মূহুর্তে কয়জন মানুষের জানা ছিল? হাতে গুণা কয়েকজনের। আবার ঘোষনাটি যারা শুনেছিল তাদের কয়জন ইংরেজীতে পড়া একটা ঘোষনার বক্তব্য বুঝতে পেরেছিল? আর কোথাকার কোন্ জিয়া কী বলেছে সেটা বিশ্বাস করে নিজের জান হাতে নিয়ে যুদ্ধে চলে যাবে এমন লোকই বা কয়জন ছিল তখন?

অসংখ্য মিডিয়া হাউসে ভরপুর এই তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ যুগেও কয়জন মানুষ বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধানের নাম জানে? অখ্যাত কোনো আর্মি অফিসারের নাম জানা তো দূরের কথা। তাই ১৯৭১ এর ঐ কঠিন সময়ে, যখন ঢাকা থেকে সিলেট যেতে ২ দিন লাগতো তখন, সাধারণ মানুষের কেউই যে জিয়াকে চিনত না আর তার পড়া ঘোষনাটি যে কয়জন শুনেছে তারাও যে এটাকে আলাদা করে দেখে নি সেতো বুঝাই যায়।

সবচেয়ে বড়ো কথা, জিয়ার কি স্বাধীনতার ঘোষনা দেয়ার রাজনৈতিক যোগ্যতা ও ম্যান্ডেট ছিল? জনগন কি তাকে স্বাধীনতার ঘোষনা দেয়ার অনুমতি দিয়েছিল? কখনোই না। সেই যোগ্যতা, ম্যান্ডেট ও অনুমতি বঙ্গবন্ধুর ছিল। তাই বঙ্গবন্ধু সেই ঘোষনা দিয়েছেন, ৭ই মার্চ একবার এবং ২৬শে মার্চ আরেকবার। ৭ই মার্চ থেকে এদেশের সবকিছু বঙ্গবন্ধুর অঙ্গুলি হেলনে চলছিল। বঙ্গবন্ধুর অধীনে একজন চাকরীজীবি কর্মচারী হিসেবে জিয়া বঙ্গবন্ধুর ঘোষনাটি আরো অনেকের মতো পাঠ করেছে মাত্র।

সর্বোপরি ঐ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রটি স্থাপন ও এর ব্যবহার ছিল বঙ্গবন্ধু ও তার দলের নেতাদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য পূর্বপরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং দূরদর্শিতার আরেক প্রমাণ।

এই ব্যাপারগুলিই বলে দেয়, এদেশের কোটি কোটি মানুষকে যুদ্ধের জন্য, স্বাধীনতার জন্য আগেই কেউ একজন সম্পূর্ণভাবে তৈরী করে নিয়েছিলেন। পাকিস্তানিদের আক্রমণের সাথে সাথে মানুষ তাই প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আর সেই একজন যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে?

পাকিস্তানিদের শোষণ-নির্যাতন থেকে মুক্তিলাভের জন্য বাঙ্গালিরা যে সংগ্রাম করেছে তা দীর্ঘ ২৩ বছরের রক্তাক্ত পথ অতিক্রম করেছে। সেই ১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষাবিরোধী জিন্নার বক্তব্যের প্রতিবাদ করা থেকে শুরু। তারপর একে একে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের বিজয়, শিক্ষা আন্দোলন, গোপনে মুক্তিযুদ্ধের নিউক্লিয়াস – বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট গঠন, ৬ দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রতিবাদ, ফাঁসির কাষ্ঠ থেকে বঙ্গবন্ধুকে ফিরিয়ে আনা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান আর ৭০ এর নির্বাচন হয়ে ১৯৭১ এর মার্চে বঙ্গবন্ধুর ডাকা সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন সফল করার মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের জন্য তৈরী হয়েছে।

কিন্তু মিথ্যার ধারক দেশদ্রোহীরা এই চিরন্তন ইতিহাসকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। যেমন পাকিস্তানিরা এখনো তাদের শিশুদেরকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে মিথ্যা ও বিকৃত ইতিহাস শিখায়। রাতের আঁধারে কাপুরুষের মতো আক্রমণ করা, ৩০ লাখ নিরীহ বাঙ্গালিকে খুন করা, বাঙ্গালিদের বিজয় মেনে না নেয়া আর সীমাহীন শোষণের কথা তাদের ইতিহাস বইয়ে লিখা থাকে না। এবার বুঝে নিন, আমাদের দেশে যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে তারা কাদের উদ্দেশ্য পূরণে তা করে।

হৃদয় মাতানো যে মেধাবী কিশোর রুমি নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে ভুলে যুদ্ধে গিয়ে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে সেই শহীদ রুমির মাকেই রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার আসামী বানিয়েছে ইতিহাস বিকৃতির কারিগর খালেদা, রুমির মা নিজের ছেলের খুনীদের বিচার চেয়েছিলেন বলে। খালেদা মন্ত্রী বানিয়েছে রুমির খুনী নিজামীকে।
লাখো রুমির রক্তে ভেজা এই মাটিতে স্বাধীনতাবিরোধীদের এমন অপকর্ম করতে দেয়া কি অন্যায় নয়?