ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

ইসলাম কি সত্যিই একই সাথে একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি দিয়েছে? এক কথায় এ প্রশ্নের উত্তর হল – না।
সুবিধাবাদীরা নিজেদের অনৈতিক চাওয়া পূরণ করতে ভিন্ন ধারণার প্রচলন করেছে। তারা কুর্‌আনের আসল নির্দেশের অপব্যাখ্যা দিয়ে ইসলামের মর্যাদাহানি করেছে। ইসলামই বরং একমাত্র ধর্ম যা এক বিয়ের উপর আনুষ্ঠানিক গুরুত্ব আরোপ করেছে।

আল্লাহ্‌ বলেছেন,
“আর তোমরা যদি আশংকা করো যে, এতিম মেয়েদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে সেসব মেয়েদের মধ্য থেকে যাদের ভালো লাগে তাদের বিবাহ করে নাও দুই, তিন কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর যদি এরূপ আশংকা করো যে, সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে একটিই অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদের, এতেই পক্ষপাতিত্বে জড়িত না হওয়ার সম্ভাবনা অধিকতর। (সূরা নিসাঃ আয়াত ৩)।

একাধিক বিয়ের কাঙ্গালরা এ আয়াতকেই নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করে, তারা এর বাইরে যায় না। হ্যাঁ, সুবিচার করতে পারলে ৪ টি পর্যন্ত বিয়ে করা যাবে বলে এ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রথমতঃ এ আয়াতে অনেকগুলি প্রধান শর্ত বিদ্যমান, শুধু সুবিচারের শর্ত নয়। তবে সুবিচারকে একমাত্র শর্ত মনে করেও কোনো মুসলমানের পক্ষে একই সাথে একাধিক স্ত্রী রাখা সম্ভব নয়, মানে বহুবিবাহ করা জায়েজ নয়। কারণ আল্লাহ্ এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য কথা বলেছেন একই সূরার অন্য আয়াতে।

আল্লাহ্‌ বলেছেন,
“তোমরা যতই চাও না কেন কখনোই তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার করতে পারবে না। অতএব সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়ো না যে, একজনকে ফেলে রাখো দোদুল্যমান অবস্থায়।” (সূরা নিসাঃ আয়াত ১২৯)।

আল্লাহ্‌ উপরের আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, কারো পক্ষেই একাধিক স্ত্রীর প্রতি সমান ব্যবহার করা অর্থাৎ সুবিচার করা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। আল্লাহ্‌ এখানে “যতই চাও না কেন” শব্দসমূহ যোগ করেছেন। আবার সব স্ত্রীর প্রতি সুবিচার করাকে বহুবিবাহের অলংঘনীয় শর্ত করা হয়েছে। তাহলে কী দাঁড়ালো? ইসলাম একই সাথে একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি দিয়েছে? মোটেই না। মানুষ বহুবিয়ে করা থেকে বিরত থাকুক – এটাই যে ইসলামের চাওয়া এ আয়াতই তার প্রমাণ।

যেখানে আল্লাহ্‌ নিজে জানিয়েছেন যে, কোনো মানুষই তার সব স্ত্রীর সাথে সমান ব্যবহার করতে সক্ষম হবে না সেখানে সমান ব্যবহার করতে পারার কথা আর উঠে কি করে? আল্লার ফায়সালার বিপরীত কিছু দাবী করা তো শিরক। সমান ব্যবহারের প্রতিশ্রুতিতে একাধিক স্ত্রী রাখার অর্থ আল্লার মহান প্রজ্ঞাকে অস্বীকার করে নিজের ইচ্ছা প্রয়োগ করা। কোনো মুসলমান তা করতে পারে না।

আল্লাহ্‌ এক এবং তিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞানী ও শ্রেষ্ঠতম বিচারক – এটা বিশ্বাস করা মুসলমান হিসেবে মানুষের প্রথম ফরয দায়িত্ব। নিজেদের কর্মেও এ বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটাতে হবে। তাহলে কীভাবে কেউ নিজেকে মুসলমান হিসেবে দাবী করবে আবার আল্লাহ্‌ যা অসম্ভব বলে উল্লেখ করেছেন তা সম্ভব বলে মনে করবে? সুতরাং ঈমান রক্ষা করতে হলে একই সাথে একাধিক স্ত্রী রাখা যাবে না।

কেন সুবিচার করা সম্ভব নয়? সুবিচার করা শুধু একই মানের খাদ্য, পোশাক ও বাসস্থান নিশ্চিত করা বা সমপরিমান সময় ও অর্থ খরচ করাতে সীমাবদ্ধ নয়। সব স্ত্রীর প্রতি সবসময় সমান ভালোবাসা ও ইতিবাচক অনুভুতি থাকতে হবে। এটা অসম্ভব। কারণ সময়ে কোনো এক স্ত্রীর জন্য একটু বেশী ভালো লাগা তৈরী হয়ে যাবে। তাছাড়া চারজন মানুষ একই স্বভাবের হবে না। এজন্য তাদের প্রতি অনুভুতিও ভিন্ন হবে।

জানার ইচ্ছে হতে পারে যে, সূরা নিসার ৩ নাম্বার আয়াতে তাহলে কী বলা হয়েছে? এর উত্তর ঐ আয়াতেই আছে। ঐ সূরার ২ নাম্বার আয়াতটিও এখানে প্রাসঙ্গিক। ২ নাম্বার আয়াতে এতিমদের অর্থ-সম্পদ হেফাজত করতে এবং তা অন্যায়ভাবে গ্রাস না করতে আদেশ করা হয়েছে। আর এতিমদের বৈবাহিক অধিকার রক্ষা করার নির্দেশ রয়েছে ৩ নাম্বার আয়াতে। একাধিক বিয়ের কথা এতিমদের হক প্রসঙ্গেই এসেছে।

যুদ্ধ পরবর্তী বিশেষ অবস্থায় কিছু লোক সুন্দরী ও সম্পদশালী একাধিক এতিম মেয়ের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করতো। পরে তারা ঐ মেয়েদের নামকাওয়াস্তে বিয়ে করে নিতো নিজেদের ইচ্ছেমাফিক, বৈবাহিক হক আদায় না করেই, শুধু সম্পদ ও সৌন্দর্য ভোগের আশায়। এ অনাচার বন্ধ করতেই আল্লাহ্‌ সূরা নিসার ৩ নাম্বার আয়াতটি নাযিল করেন এবং জানিয়ে দেন এতিম মেয়েদের বিয়ে করার শর্তসমূহ।

সূরা নিসার ৩ নাম্বার আয়াত বিশেষ পরিস্থিতিতে একাধিক বিয়ে করার ক্ষেত্রে যেসব শর্ত আরোপ করেছে তা হল; ১. এতিম মেয়েদের লালন-পালনের দায়িত্বে থাকা, ২. শুধুমাত্র তাদের সঠিকভাবে লালনের প্রয়োজনে বিয়ে করা, ৩. সব বৈবাহিক অধিকার পরিপূর্ণভাবে প্রদান করা, ৪. অনুমতি সাপেক্ষে শুধু ঐ এতিম মেয়েদের বা যুদ্ধবন্দী নারীদের বিয়ে করা এবং ৫. সব স্ত্রীর প্রতি সুবিচার করা বা সমান ব্যবহার করা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে এতিমদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে তারা যদি নাবালক ও সংখ্যায় বেশী হয় এবং তার পক্ষে তাদেরকে সুস্থভাবে লালন-পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে তাহলে শুধু ঐ এতিম শিশুদেরকে মায়ের আদর ও সেবা লাভের সুযোগ দেয়ার জন্য শর্ত পুরণ সাপেক্ষে সে একাধিক বিয়ে করতে পারবে। এর সংখ্যা নির্ভর করে এতিম শিশুদের সংখ্যার উপর। এজন্যই আলাদাভাবে ২, ৩ ও সর্বোচ্চ ৪ টির কথা বলা হয়েছে।

কেউ যদি এতিমদের অভিভাবকত্বের দায়িত্বে না থাকে তবে সে একাধিক স্ত্রী রাখতে পারবে না। আবার কাদের বিয়ে করা যাবে তাও সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ্‌ বলেছেন, “সেসব মেয়েদের মধ্য থেকে।” অর্থাৎ শুধু ঐ এতিম মেয়েদের যারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায়িত্বে রয়েছে। তাই যাকে খুশি তাকে. দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ বউ বানানো সম্পূর্ণ নাজায়েজ।

ঐ আয়াতে বিশেষ পরিস্থিতিতে শর্ত পুরণ সাপেক্ষে একাধিক বিয়ের অনুমতি দেয়া হলেও শর্ত পুরণ করা যেহেতু কখনোই সম্ভব নয় সেহেতু একাধিক স্ত্রী রাখাও কখনোই অনুমোদিত নয়।

কুর্‌আন একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যা একটিমাত্র বিয়ের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ এক দম্পতির ম্যাধ্যমে মানব জাতির বিকাশ ঘটিয়েছেন, সমহারে নারী-পুরুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছেন। এক পুরুষের জন্য একাধিক নারী তৈরী করেন নি। হযরত আলী (রাঃ) যখন পুনরায় বিয়ে করতে চাইলেন তখন ফাতিমা (রাঃ) এতে কষ্ট পেয়ে মহানবী (সাঃ) এর কাছে অভিযোগ করেন। মহানবী (সাঃ) আলীকে নির্দেশ দেন যেন তিনি ফাতিমার জীবিত অবস্থায় কোনো বিয়ে না করেন।

বলা বাহুল্য, ইসলামবিরোধীদের অবিকশিত মস্তিস্ক উদ্দেশ্যমুলকভাবে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। ইসলামের আদেশ সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়। পৃথিবীতে ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা বিয়ে সম্পর্কে পরিষ্কার ও ন্যায্য অবস্থান নিয়েছে। অন্য অনেক ধর্ম বিয়েঘটিত বিষয়াদিতে নারীর অবমাননার ধারক।

ইহুদিরা মাত্র সেদিন বহুবিবাহ প্রথা নিষিদ্ধ করেছে। তাদের ধর্মগ্রন্থ বলেছে, “একজন পুরুষ যতজন ইচ্ছে নারীকে কোনো বাধা ছাড়াই এক সাথে বিয়ে করতে পারবে।” (এক্সোডাস ২১:১০)। আব্রাহাম, জ্যাকব, এলকানাহ, ডেভিড প্রমুখের একাধিক স্ত্রী ছিল।
খৃস্টানরা দীর্ঘদিন বহুবিবাহের চর্চা করেছে। বাইবেলে বর্ণিত মহাপুরুষদের অনেকে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেছেন। নিজের স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও মৃত ভাইয়ের সন্তানহীন স্ত্রীকে পুরুষরা বিয়ে করতে পারবে বলে যিশু অনুমতি দিয়েছেন। (ম্যাথু ২২:৩০)।

হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বহুবিবাহকে উৎসবের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। কৃষ্ণের ১৬,১০৮ জন স্ত্রী ছিল। রামের পিতা দশরথের ছিল ৩ জন। দ্রৌপদীর তো একাধিক স্বামীই ছিল। হিন্দুরা একাধিক বিয়ে করাকে সামাজিক প্রভাব বিস্তারের উপায় বলে মনে করতো। শিবাজি, আদিত্য, অরিঞ্জয়, উত্তম, গনকা, কারিকালা, পুগাল, রাজেন্দ্রের একাধিক স্ত্রী ছিল। ভারত সরকার ১৯৫৪ সালে আইন করে নিষিদ্ধ করার আগ পর্যন্ত হিন্দুদের মাঝে ব্যাপক হারে বহুবিবাহ চালু ছিল।

কিছু সুযোগসন্ধানী বলে, মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির জন্য একাধিক বিয়ে প্রয়োজনীয়। ইসলাম এমন কিছু সমর্থন করে নি। প্রথম মানব আদমের জন্য আল্লাহ্‌ মাত্র একজন স্ত্রীই তৈরী করেছিলেন, একাধিক নয়। সেই আদিকালে মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি অতি জরুরী ছিল। তবুও একাধিক স্ত্রী নয়, এক হাওয়ার মাধ্যমেই মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

সূরা নিসার ৩ ও ১২৯ নাম্বার আয়াত এক সঙ্গে পড়লে স্পষ্টভাবেই জানা যায় যে, এক সাথে একাধিক স্ত্রী রাখার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। যারা এর অন্যথা করে তারা কুর্‌আনের অনুসারী নয়।