ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

হাজারো বছর ধরে নারী-পুরুষের মধ্যে এক ধরণের সাম্যতা বিরাজ করছিল। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি ও প্রকৃতিগত কারণে নারীরা পুরুষের উপর প্রাধান্য লাভ করে।

সে সময়ে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা অনেক কম ছিল। টিকে থাকা ও শিকারের সুবিধার জন্য জনসংখ্যা বাড়ানো অতি জরুরী হয়ে পড়েছিল। নারীরা যেহেতু সন্তান জন্ম দিত সেহেতু ঐ সংগ্রামমুখর সময়ে নারীদের গুরুত্ব বেড়ে যায়। সমাজেও নারীরা লৈঙ্গিক প্রাধান্য বিস্তার করে। এমন নয় যে, নারীরা শুধু সন্তান জন্ম দিয়েই বসে থাকতো। বরং তারা অন্য সব কঠিন কাজেও অংশ নিত। তাদের এ প্রাধান্য দীর্ঘকাল বজায় ছিল।

এ সুবিধাটাই পরে নারীদের জন্য অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পৃথিবীর জনসংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়লো। বাড়তি মানুষের জন্য বাড়তি শিকারের প্রয়োজন হল। এতে পুরুষের গুরুত্ব বেড়ে যায়। সমাজেও পুরুষরা প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করে। এ বিশ্বাসও পোক্ত হতে থাকে যে, নারীরা শক্ত কাজের উপযোগী নয়। ফলে নারীরা গুরুত্ব হারাতে থাকে। যদিও সন্তান জন্মদান সহ অন্য কঠিন কাজগুলি নারীরা তখনো করে যাচ্ছিল।

কিন্তু পুরুষতন্ত্র তখন শিকড় গজিয়ে ফেলেছে। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পুরুষকে সব সময়ই প্ররোচিত করেছে নারীর উপর নিজের মেকি প্রাধান্য তুলে ধরে নিজেকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় উপস্থাপন করতে, দুই লিঙ্গের যুদ্ধে সর্বদা জয়ী হওয়ার চেষ্টা করতে। লৈঙ্গিক সাম্যের বিষয়টি পুরুষের চিন্তায় কখনো গুরুত্ব পায় নি। বিভিন্ন ঘটনায় তার প্রমাণ মেলে।

বন্দুক আবিস্কারের প্রথম ৬শত বছরের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, পুরুষ তার পুরানো শিকারি মানসিকতা ভুলে যায় নি যে শিকারকে ভিত্তি করে সে নারীর উপর আধিপত্য লাভ করেছিল। বন্দুক ব্যবহারের বাসনা যে কোনো পুরুষের অব্যাক্ত এক আকাংখা, শিকারি মানসিকতার অদম্য চাওয়া। নারী যোনিতে শুক্রাণু ছোঁড়ার আনন্দকেই স্মরণ করিয়ে দেয় বন্দুকের গুলি ছোঁড়ার আনন্দ। তাই সুযোগ পেলেই পুরুষ এটা করতে চায়।

যুদ্ধে অস্ত্র তথা বন্দুকের ব্যবহার এ আনন্দ উপভোগেরই চেষ্টা। বলা হয়, যুদ্ধ হচ্ছে বন্য রাগের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু যে তরুণেরা সৈন্য হিসেবে যুদ্ধে গুলি ছোড়ে তারা তো প্রতিপক্ষের সৈন্যটিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনে না। তাই ব্যক্তিগত রাগ থাকার প্রশ্নও উঠে না। হ্যাঁ, যুদ্ধের পরিকল্পকরা ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে বটে তবে তারা সংখ্যায় নগণ্য। যুদ্ধ ময়দানের পুরুষরা শিকারি মানসিকতারই শিকার, বন্ধুকে, দেশকে সাহায্য করার নামে সে মানসিকতায়ই চালিত হয় তারা।

এ মানসিকতা আদিম যুগ থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এটা কর্তৃত্বপরায়ণ হওয়ার দুর্নিবার আকর্ষনকে ধারণ করে, অন্যের জীবন নিয়ে খেলার লুকানো ইচ্ছেকে জাগিয়ে তুলে। প্রাচীন যুগ ও মধ্য যুগেই নারীরা বেশি নিগৃহীত হয়েছে। নারীদের অপদস্ত করার ঘটনা তখন অনেক বেশি ঘটেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে পুরুষরা তখন কিছু নারীকে সম্মানের আসনে বসাতো। উদাহরণ হিসেবে যীশুর জন্মদাত্রী মেরীর কথা বলা যায়।

ক্রিশ্চিয়ানিটি কখনো যীশুর চেয়ে মেরীকে বেশি গুরত্ব দেয় নি। যেহেতু তিনি ছিলেন নারী। তারা পুরুষ যীশুকে প্রাধান্য দিয়েছে। এরপরও কিছু দেশে মেরীর পূঁজা হতো এবং তার মূর্তি নিয়ে মিছিল বের হতো, এখনো হয়। সে মূর্তির গা স্পর্শ করে আশীর্বাদ নেয় ভক্তরা। তবে এগুলি ছিল ব্যতিক্রম, পাপী মনে উথলে উঠা শাস্তির ভয় থেকে করা কাজ।

নারীকে ফাঁদে ফেলে রাখার আনন্দ পেতে পুরুষতন্ত্র সব যুগে সবকিছু করেছে। গ্রীক দেবী ডায়না দেবী হিসেবে যৌন সঙ্গমে সম্মত ছিলেন না। কিন্তু পুরুষরা তাকেও দেবীর চেয়ে নারী হিসেবে বেশি কল্পনা করেছে। তাই তারা ষাঁড়ের অন্ডকোষ এনে তার গায়ে জুড়ে দেয় যাতে ঐ অন্ডকোষের শুক্রানু দেবীর দেহে প্রবেশ করে তাকে গর্ভবতী করতে পারে।

ধর্ম ব্যবসায়ীরা ধর্মকে নারীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। এখন যে উইমব্লেডন টেনিসে মেয়েরা নিম্নাঙ্গে শুধু আন্ডারওয়ার পরে খেলছে মাত্র কয়েক বছর আগেও সেখানে খেলতে হলে ইউরোপীয় মেয়েদেরকে লম্বা জোব্বা পরে খেলতে হতো। খ্রিস্টান চার্চ ও মিশনারীগুলিতে নারী যাজিকাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত জোব্বা দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। চার্চের ধর্মপুরুষরা শপথ ভেঙ্গে আবার এ যাজিকাদের সাথে যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হয় গোপনে, ধরাও খায়। চার্চরক্ষকরা হাজার হাজার প্রতিবাদী নারীকে ডাইনি আখ্যা দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে।

হিন্দু ধর্মের প্রবর্তকরা নারীকে জড় পদার্থের চেয়ে বেশি মুল্য দেয় নি। মৃত স্বামীর সাথে জীবিত স্ত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলার যে পাশবিক নৃশংস উদাহরণ তারা তৈরী করেছে তা ইতিহাসে বিরল। হাজার বছর ধরে চলা এ প্রথা অবশেষে সমাজ সংস্কারকদের চেষ্টায় বন্ধ হয়েছে। বিবাহিত হিন্দু নারীদেরকে সিঁদুর পরে পশুদের মতো চিহ্নিত হতে হয়। পিতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে তাদের কোনো অধিকার থাকে না। তারা স্বামীকে তালাক দিতে পারে না (ধর্মমতে)। আর স্বামীকে দেবতা বলে মান্য করা হিন্দু নারীদের অপরিহার্য কর্তব্য।

সে তুলনায় ইসলাম অনেক এগিয়ে। কিছু বিভ্রান্ত অনুসারী একে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। পর্দা প্রথা নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে কিন্তু ইসলাম বলে নি কাউকে পর্দা করতে বাধ্য করার জন্য। ইসলাম পিতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করেছে, স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার সমান বলে ঘোষনা করেছে। মুসলিম নারী স্বামীকে তালাক দিতে পারে। এমনকি ইসলাম বহুবিবাহেরও অনুমতি দেয় নি, সুযোগসন্ধানীরা ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ইসলামের নামে তা সিদ্ধ করতে চেয়েছে।

বস্তুতঃ পুরুষতন্ত্রের ধারকরা নারীদের অধীনস্ত করে রাখতে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন কৌশল আবিস্কার করেছে। এগুলি দেশ, ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির ব্যবধানকে অতিক্রম করেছে। তথাকথিত নারীবাদীরাও আসলে পুরুষতন্ত্রের সহযোগী। নারীবাদী আন্দোলনের পথপ্রদর্শকদের প্রচেষ্টায় সততা ছিল। কিন্তু বর্তমান নারীবাদীদের নারী স্বাধীনতার দাবী নিশ্চিতভাবে তাদের কাছেই পরিষ্কার নয়।

নারীদের ‘যৌনবস্তু’ হিসেবে গন্য করা যেখানে নারী-পুরুষ বৈষম্যের প্রধান উপাদান বলে বিবেচিত সেখানে শুধু সাধারণ কিছু নারী নয়, অনেক নারীবাদীও পুরুষের বিনোদনের জন্য তৈরী বিভিন্ন বানিজ্যিক প্রকল্পে নারীদেহের বানিজ্যিক উপস্থাপনার অবাধ অধিকার দাবী করেন। এ দ্বিচারিতা নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজকে কঠিনতর করে তুলেছে। নারীদেরকে তাই সমানাধিকারের বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে হবে।

যারা নারীকে শুধু নারী হিসেবে দেখতে চায় তাদের বড় সমর্থক পুঁজিবাদ। পুঁজি সবসময়ই তার বিনিয়োগকৃত অর্থ হতে সর্বোচ্চ মুনাফা লাভের সুযোগ খোঁজে। এক্ষেত্রে যৌনতা অন্যতম অস্ত্র। নারীকে ভুল-ভালিয়ে ও পুরুষকে অবদমিত কামনা পূরণের লোভ দেখিয়ে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে পুঁজিবাদ সর্বাধিক মুনাফার মালিক হয়। তাই সে ঐ নারীবাদীদেরকেও সেবক হিসেবে কাজে লাগায়।

বিবিধ লৈঙ্গিক অপবিন্যাসের ম্যাধ্যমে পুঁজিবাদ প্রতিনিয়ত কামাই করে নিচ্ছে আশাতীত মুনাফা আর পুরুষতন্ত্র পাচ্ছে নারীকে ‘যৌনবস্তু’ ভাবার সুখ। এ কৌশল এতই কার্যকর যে, স্বয়ং নারীদের একটি অংশ মুনাফালোভী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আয়োজিত প্রতিযোগিতায় দর্শনীয় ‘বস্তু’ হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার জন্য সর্বস্ব বাজি ধরে, নিজের মানবীয় পরিচয়কে ছোট করে।

নারী ও পুরুষকে ভিন্ন দৈহিক আকৃতি দেয়া হয়েছে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে। প্রকৃতি নিজে সুচারুরূপে দেখিয়ে দিয়েছে পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় নারী ও পুরুষ কীভাবে নিজ নিজ ভুমিকা পালন করবে। এর সাথে কৃত্রিম কিছু যোগ করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু পুঁজিবাদের সহায়ক পুরুষতন্ত্র তাই করেছে। সৌন্দর্য্যবর্ধক ব্যবহার করে কমনীয় হয়ে উঠা বা হাইহিল পরে ক্যাটওয়াক করা মেয়েদের জন্য কেন আবশ্যক?

যৌনক্রিয়ায় পুরুষ নারীদেহকে যতটা উপভোগ করে নারীও পুরুষদেহকে ততটা উপভোগ করে। প্রকৃতি যৌনক্রিয়াকে প্রধানতঃ প্রজনন প্রক্রিয়া হিসেবে নির্বাচন করেছে, যেমন করেছে আর সব প্রাণীদের জন্যও। অন্যান্য জৈবিক কর্ম সম্পাদনে যেমন বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রভাবক রয়েছে তেমনি মানুষ যাতে বংশবৃদ্ধির কাজকে ভুলে না যায় সেজন্য প্রকৃতি যৌনক্রিয়ায় সুখ লাভকে বাড়তি হিসেবে যোগ করেছে মাত্র।

নারীর উপর প্রাধান্য লাভের জন্য যৌনতাকে ইস্যু বানানো তাই পুরোপুরি জাঙ্গলিক ও পাশবিক। নারী ও পুরুষের ভুমিকা নির্ধারিত হবে মানুষ হিসেবে তাদের কর্ম দিয়ে, লৈঙ্গিক পরিচয় দিয়ে নয়। প্রাচীনকালে সৃষ্ট পশুসুলভ শিকারি মানসিকতা ছেড়ে যারা সভ্য হতে পারে নি তারাই নারীকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়। পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত জীবনে মানবিক গুনাবলী অর্জন করা এদের ভাগ্যে জোটে না।

লিঙ্গ, বর্ণ, ধর্ম, আকৃতি ও অবস্থান নির্বিশেষে মানুষের প্রথম পরিচয় – সে মানুষ। তাই পুরুষ যতটা অধিকার ও সুবিধা লাভের দাবিদার নারীও ততটা অধিকার ও সুবিধা লাভ করবে। পুরুষ যতটা মানুষ নারীও ততটা মানুষ। প্রতিটি মানুষ স্বাধীনভাবে তার অধিকার চর্চা করার সুযোগ পাবে – এটাই কাম্য।