ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

চলমান বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবিস্মরনীয় সাফল্য বাংলাদেশের ভালো দেখতে চায় না এমন মহলকে চরম কষ্ট দিয়েছে, বিশেষ করে জঙ্গি পাকিস্তানিদের।

শেষ ওভারে রুবেলের ম্যাজিকাল বোলিং ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে জিতিয়ে দেয়ার পর লারা-গাভাস্কার থেকে শুরু করে বিশ্বের সব ক্রিকেট গ্রেটরা, এমনকি ইংল্যান্ড গ্রেট বোথামও যখন রুবেল ও বাংলাদেশের অসাধারণ পারফরমেন্সের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তখন পাকিস্তানিদের কণ্ঠে ভিন্ন সুর।

বাংলাদেশের জয়ে পাকিস্তানের নক আউট পর্বে যাওয়া প্রভাবিত হয় নি। যা হারানোর তা হারিয়েছে ইংল্যান্ড। যদি বাংলাদেশ বিশ্বকাপ থেকে পাকিস্তানকেই বিদায় করতো তবুও তাদের প্রতিক্রিয়া এমন হওয়ার কথা নয়। কারণ বাংলাদেশ নিজেদের যোগ্যতা দিয়েই জয় পেয়েছে, যার শুধু প্রশংসা করা যায়, যেমন করেছে ইংলিশরা হেরে গিয়েও।

রুবেলকে নিয়ে কলঙ্কিত এক পাকিস্তানি ক্রিকেটার টুইট করেছে, “মনে রাখবেন, তার নামে একটি ধর্ষণ মামলা আছে।” সে আরো বলেছে, “বাংলাদেশ ৭১’ এর পর এ প্রথম ভারতের সাহায্য ছাড়া জিতেছে।” রুবেলের দারুণ কৃতিত্ব নয়, খেলার কোনো বিশ্লেষণ নয়, বাংলাদেশের মুগ্ধতা ছড়ানো দলীয় পারফরমেন্স নয়, ঐ সঙ্কীর্ণমনা পাকিস্তানির মনে পড়েছে, রুবেলের বিপক্ষে দায়ের করা মামলার কথা, ৭১ এর যুদ্ধের কথা।

রুবেল কোন্ মামলার আসামি বা সে দোষী না নির্দোষ তা কি বাংলাদেশের বিজয় বা রুবেলের তাক লাগানো বোলিং সাফল্যের সাথে কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট? তাছাড়া কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলেই সে দোষী হয়ে যায় না। মামলাটি বাংলাদেশের আদালতের ব্যাপার। পাকিরা এ মামলার কোনো পক্ষ নয়। এটা খেলাকে বাংলাদেশের অনুকূলে কোনোভাবে প্রভাবিতও করে নি। তাহলে?

বাংলাদেশের আদালত ও বিশ্বকাপের আয়োজক আইসিসির অনুমোদন নিয়েই রুবেল খেলতে গিয়েছে। আইসিসি রুবেলের খেলার পথে কোনো বাঁধা খোঁজে পায় নি। পাকিস্তানিরা পেল কই? কোনো বাংলাদেশিকে টর্নেডোর গতিতে স্টাম্প উড়িয়ে ফেলতে দেখার যে চাপ তা নিশ্চয় ঐ পাকি নিতে পারে নি।

রুবেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, সে নাকি বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভিযোগকারিণীর সাথে যৌন মিলনে লিপ্ত হয়েছে কিন্তু পরে বিয়ে করতে রাজি হয় নি। ফ্যাক্টস অনুযায়ী, শারীরিক সম্পর্কটা দুজনের সম্মিলিত ইচ্ছায় সংঘটিত হয়েছে। যেহেতু দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ স্বেচ্ছায় যৌনক্রিয়া সম্পন্ন করেছে তাই এটা মোটেই ধর্ষণ নয়। অথচ মামলা করা হয়েছে ধর্ষণের অভিযোগে।

যে পাকি টুইট করেছে তার নিজের অতীত বলছে, স্কুল জীবনে সে পরীক্ষায় নকল করে স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। অপকর্ম করে সে নিজ দেশে জেল খেটেছে। আমাদের দেশে বিপিএল এ খেলতে এসে সে ম্যাচ ফিক্সিং এ জড়িয়ে ধরা পড়েছে। আমাদের পুলিশ তাকে জেরা করে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার পর বিসিবি তাকে শাস্তি দিতে গিয়েছিল কিন্তু পাকি ক্রিকেট বোর্ড নিজেরা শাস্তি দেয়ার কথা বলে তাকে নিয়ে যায়।

বাংলাদেশ নাকি এ প্রথম ভারতের সাহায্য ছাড়া জিতেছে! বাংলাদেশ যে ১৯৯৯ এ নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই পাকিস্তানকে হারিয়েছিল তাতে কি ভারতের সাহায্য ছিল? গত ১৪ বছরে বাংলাদেশ যে সব বড় দলকে হারালো, একাধিকবার, তা কি ভারতের সাহায্যে? বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডকে দুই দু’বার বাংলা ওয়াশ করেছে, ২০০৭ এর বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ভারত ও সাউথ আফ্রিকাকে হারিয়েছে। তখন কি ভারত বাংলাদেশের হয়ে খেলেছিল?

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের মূলেও ছিল বাংলাদেশিদের নিজেদের অতুলনীয় বীরত্ব, দেশপ্রেম ও যুদ্ধকৌশলের সাফল্য। বাংলাদেশ কখনো ভারতকে যুদ্ধে যোগ দিতে বলে নি।

২৬শে মার্চ রাতে পাকিস্তানিদের কাপুরুষোচিত হামলার পরপরই বাঙ্গালিরা প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। দীর্ঘ সাড়ে ৮ মাস ব্যাপী বাঙ্গালিদের নিজেদের একা করা এ যুদ্ধে পাকি হানাদাররা পরাজয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছেছিল। তখন ভীত পাকিস্তানিরাই ভারতে বোমা মেরে ভারতকে যুদ্ধে ডেকে আনে, যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক রূপ দিয়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে অবশ্যম্ভাবী পরাজয় ঠেকাতে।

পাকিস্তান ভারতে বোমা ফেলে ৩রা ডিসেম্বর। আর ভারত পাকিস্তানিদের উপর আক্রমণ শুরু করে ৪ঠা ডিসেম্বর। কিন্তু তার আগেই পাকিস্তানিদের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়। ২৬শে মার্চ থেকে ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত বাঙ্গালিরা একা যুদ্ধ করে জয় নিশ্চিত করে ফেলে। বাঙ্গালিদের হাতে মার খেয়ে পরাজয়ের মুখে থাকা পাকিস্তানি জানোয়াররা তাদের প্রভু আমেরিকার কাছে সাহায্য চায়।

৭১’ এ ভারত মানবিক সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল। তারা আমাদের কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য জায়গা দিয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের পক্ষে কুটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে। যুদ্ধে এমন সহযোগিতা কোন্ যুগে কোন্ দেশ নেয় নি?

পৃথিবীর একমাত্র পরাশক্তি আমেরিকাই তো ইরাক আক্রমণ করতে সৌদি আরব ও কুয়েতের মাটি ব্যবহার করেছে আর ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ার সামরিক সাহায্য নিয়েছে। ফিলিস্তিনীরা লেবানন, জর্দান, মিশর ও সিরিয়ার সাহায্য নিয়ে বছরের পর বছর ধরে ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। পাকিস্তান নিজে আমেরিকা ও চীনের সাহায্য নিয়েছে বাংলাদেশ বিরুদ্ধে যুদ্ধে। গেরিলা যোদ্ধারা সব যুগে অন্য দেশে আশ্রয় নিয়ে যুদ্ধ করেছে।

সাবেক ক্রিকেটার আরেক পাকি রুবেলকে ফাস্ট বোলার হিসেবে স্বীকার করতে চায় নি। যেখানে রুবেল ম্যাচের সর্বোচ্চ গতিসম্পন্ন বল করেছে, ১৪৫.৬ কি.মি/ঘ. গতিতে সেখানে তার চোখে রুবেল মিডিয়াম পেস বোলার। আর যে ৪ ইংরেজ বোলার ১৩০ কি.মি/ঘ. থেকে ১৪২ কি.মি/ঘ. গতিতে বল করেছে তারা তার কাছে ফাস্ট বোলার।

যারা অপকর্ম, অনিয়ম, মাদক সেবন, জুয়া খেলা ও নিজেদের মাঝে মারামারির জন্য যুগ যুগ ধরে দুনিয়ার কাছে হাসির পাত্র হয়ে আছে, যারা প্রথম ম্যাচ ফিক্সিং করে ক্রিকেটকে কলংকিত করেছে, যারা খেলার মাঠে অন্য দলের খেলোয়াড়ের ধর্ম পরিবর্তনের জন্য উঠে-পড়ে লাগে, নিজ দলের অধিনায়কের বিপক্ষে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করার একমাত্র রেকর্ড যাদের দখলে সেই পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা তো এমন মিথ্যুক ও হিংসুটেই হবে।

এরা সেই পাকিস্তানি যারা অন্য দেশের খেলোয়াড়দের দাওয়াত করে নিয়ে গিয়ে গুলি করে খুন করার জন্য। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, রুবেলের যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে সেই একই অভিযোগ উঠেছে ম্যাচ ফিক্সিং এর দায়ে জেল খাটা পাকিস্তানি ক্রিকেটার আসিফের বিরুদ্ধেও। এ পাকি তা নিয়ে কথা বলা দরকার মনে করলো না কেন?

ভিনা মালিক নামের এক পাকিস্তানি অভিনেত্রী অভিযোগ করেছিল, আসিফ বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ভিনার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, পরে তাকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে। শুধু তাই নয়, ভিনার অভিযোগ, আসিফ তার অনেক টাকাও মেরেছে।

বাংলাদেশের ব্যাপারে পাকিস্তানিদের এমন হীনমন্যতায় ভোগার বড় কারণ অবশ্যই ৭১’ এ বাংলাদেশের কাছে তাদের পরাজিত হওয়া। পাকিদের মনঃপীড়ার আরেক কারণ, ৭১’এ তাদেরকে পানিতে চুবানো ছোট বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তাদেরকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। পাকিরা তাদের এজেন্ট জিয়া ও খালেদার ম্যাধ্যমে সবরকমের অপচেষ্টা চালিয়েও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আটকাতে পারে নি।

বাংলাদেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬.২%, পাকিস্তানের ৩.৬%। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমান ২৭ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তানের ২৪.৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের রেমিটেন্স আয় ১৪ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তানের ৯ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের বৈদেশিক ব্যাণিজ্যে ঘাটতি মাত্র ৭ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তানের ঘাটতি ২০ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৬৯ বছর, পাকিস্তানিদের ৬৫ বছর। বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর হার হাজারে ৩৭, পাকিস্তানে হাজারে ৫৯। বাংলাদেশে সন্তান জন্মের হার ২.২%, পাকিস্তানে ৩.৪%। (২০১২-১৩ সালের চিত্র).

নারী উন্নয়ন ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ যে পাকিস্তানের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে তা তো বলা বাহুল্য। সামাজিক উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে। ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল তাই বলেছে, “বাংলাদেশের এ অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারা থেকে পাকিস্তানের শেখা উচিত।” দি গার্ডিয়ান গবেষণা প্রতিবেদন ছাপিয়ে লিখেছে, “২০৫০ সালে প্রবৃদ্ধির বিচারে বাংলাদেশ পশ্চিমা দেশগুলিকে ছাড়িয়ে যাবে।” বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদরা প্রবন্ধ লিখছেন “Bangladesh: Next China?” শিরোনামে। পাকিস্তানের গা জ্বলবে না?

এদেশের কিছু কুলাঙ্গার সেই পাকিস্তানের পতাকা বহন করে। পাকিস্তানিরা যে রাতের আধারে আক্রমণ করে আমাদের লাখো নিরীহ মানুষকে খুন করেছে, বছরের পর বছর ধরে আমাদের শোষণ করেছে, আমাদের নির্বাচনী বিজয় মেনে নেয় নি সেসব যেন কিছু নয়। তাদের যুক্তি, পাকিস্তান মুসলিম দেশ, তাই তারা পাকিপ্রেমী। আবার বলে, খেলায় নাকি রাজনীতি আনা যায় না। তাহলে খেলায় ধর্ম আসে কীভাবে? রুবেলের মামলাই বা এল কেন?

ইমাম হোসেনের খুনি ইয়াযিদ শুধু মুসলিমই ছিল না, ছিল প্রখ্যাত সাহাবী মুয়াবিয়ার ছেলে। মুসলিম বলে কি ইয়াযিদ ও মুয়াবিয়ার জঘন্য পাপকে মুসলমানরা ভুলে গিয়েছে বা তাদেরকে আপন করে নিয়েছে? কিংবা খেলায় রাজনীতি আনতে না চেয়ে ফিলিস্তিনীরা কি কখনো কোনো খেলায় ইসরাইলকে সমর্থন করবে? আফগানরা আমেরিকার বন্ধু সৌদি আরবকে? বা আর্জেন্টাইনরা ইংল্যান্ডকে?

মানুষ তার মা-বাবার খুনিকে, পূর্বপুরুষের হত্যাকারীকে কখনো কোনো কিছুতে সমর্থন করতে পারে না। বাংলাদেশে বাস করা পাকিস্তান সমর্থকদের সুতাও তাই ধর্ম বা খেলাতে নয়, পাকিস্তানিদের হাতে বাঁধা। এ পরজীবিরা বাংলাদেশেরটা খেয়ে এদেশের শত্রুর ঢোল্‌ পিটায়।

কবি বলেছেন,
“যেসব বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবানী
সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”

আরো বলা যায়,
“যেসব বঙ্গেতে জন্মে পাকি প্রেমে মজে
সেসব কাউকে মানুষ বলা কভু নাহি সাজে।”